odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 18th May 2026, ১৮th May ২০২৬
নেহরুর আইআইটি, পাকিস্তানের উর্দুর দম্ভ নাকি বঙ্গবন্ধুর 'শিক্ষাই হবে অস্ত্র'—স্বাধীনতার প্রথম ১০ বছরেই কি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল আজ কার অবস্থান কোথায়?

দেশভাগের লড়াই থেকে শিক্ষার রণক্ষেত্র: ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রথম দশকের অজানা ইতিহাস -শিক্ষার তিন অধ্যায়—তিন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তনের গল্প, যার ছায়া আজও লম্বা?

odhikarpatra | প্রকাশিত: ১৮ May ২০২৬ ১৫:১৩

odhikarpatra
প্রকাশিত: ১৮ May ২০২৬ ১৫:১৩

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক  তুলনামূলক শিক্ষা

১৯৪৭ ও ১৯৭১-এর বিভাজনরেখা শুধু মানচিত্র বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল তিন দেশের অনাগত প্রজন্মের ভাগ্য। স্বাধীনতার প্রথম দশকে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ভারত কীভাবে গড়ল প্রযুক্তির বনিয়াদ, পাকিস্তান কেন হারাল দিক আর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ কীভাবে সবার জন্য শিক্ষার স্বপ্ন বুনেছিল? তিন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সেই রোমাঞ্চকর উত্থান-পতন, বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এক অনন্য তুলনামূলক বিশ্লেষণ। জানুন কীভাবে গত শতকের কিছু সরকারি সিদ্ধান্ত আজকের উপমহাদেশকে নক্ষত্রের ব্যবধানে পৃথক করে দিয়েছে। 

উনিশ শো সাতচল্লিশের গ্রীষ্ম ও একাত্তরের কঠিন শীত—উপমহাদেশের ইতিহাসে এই দুটি অধ্যায় রক্তাক্ত, অশ্রুসজল ও স্বপ্নময়। ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম রাতারাতি ঘটায় লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুতি, পাকিস্তানের সামরিক শাসনের দীর্ঘ শৃঙ্খল ছিন্ন করে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিনিময়ে। স্বাধীনতার প্রথম দশক প্রতিটি জাতির জন্য শৈশবের মতো—উন্মত্ত সম্ভাবনা আর ক্ষতবিক্ষত বাস্তবতার এক জটিল মিশ্রণ। সেই উত্তাল সময়ে স্বাধীন দেশগুলো যখন নিজেদের পা-দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখন সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি ছিল: কীভাবে গড়ে তোলা হবে আগামী প্রজন্মের মনন ও দক্ষতা? শিক্ষাব্যবস্থা সে-প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একমাত্র হাতিয়ার।

এই ফিচার প্রতিবেদনে আমরা ফিরে দেখতে চেয়েছি স্বাধীনতার পরবর্তী প্রথম পাঁচ থেকে দশ বছরের শিক্ষা সংস্থাপনের প্রক্রিয়া—ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। তিন দেশের এই নয়ানব্বইয়ের পথচলা যেন ভিন্ন সুরের তিনটি গান, যেখানে মিল আছে সুরের উৎসে (ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার), কিন্তু ভিন্নতা আছে বিন্যাস ও সুরের মিঠাস্বরে। প্রথম দশকের শিক্ষানীতি কীভাবে নির্ধারণ করেছে পরবর্তী অর্ধশতাব্দীর গতিপথ? স্বাধীনতার আদর্শ শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে কতটা প্রতিফলিত হয়েছিল? বর্তমান প্রজন্ম যেসব সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তার বীজ কি সেই প্রথম দশকেই রোপিত হয়েছিল? এই প্রতিবেদন কেবল ইতিহাসের ধুলো ঝাড়াই নয়, বরং একটি অস্বস্তিকর ও অনুপ্রেরণামূলক তুলনামূলক আলোচনা—যেখানে আমরা শুধু অতীতের পাঠ্যসূচিই পর্যালোচনা করিনি, বরং শিক্ষার সেই নিহিত দর্শনকে খুঁজে দেখেছি যা আজকের ক্লাসরুম, পরীক্ষার হল ও চাকরির বাজারে মূর্ত হয়ে আছে।

ভারতের নেহরু স্বপ্ন দেখেছিলেন বিজ্ঞান ও গণতন্ত্রের মন্দির, পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল ও শাসকশ্রেণী চেয়েছিল উর্দু ও ইসলামের ঘনীভূত পরিচয়, আর বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীন পরবর্তী স্থপতিরা চেয়েছিলেন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সবার জন্য উন্মুক্ত শিক্ষার কাঠামো। এই তিন পরিকল্পনার ছেদ ও বিচ্ছেদের কাহিনি পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা দেখব কীভাবে একটি উপমহাদেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয় শাসকের স্বাক্ষরিত সরকারি কাগজপত্রের কল্যাণে বা অকল্যাণে। এখন দৃষ্টি ফেরানো যাক সেই মূল আলোচনার দিকে।

তিনদেশের বেসলাইন: স্বাধীনতার বছরগুলোতে বাংলাদেশ (1971), ভারত (1947) ও পাকিস্তানের (1947) শিক্ষা, মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সূচকগুলোর তুলনামূলক চিত্র

স্বাধীনতার বছরগুলোতে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের শিক্ষা, মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সূচকগুলোর তুলনামূলক চিত্র ছিল বেশ বৈষম্যমূলক এবং প্রতিটি দেশের জন্য শুরুর অবস্থা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

  • প্রথমত, বিদ্যালয় ভর্তির হার সম্পর্কিত নির্দিষ্ট তথ্য তেমনভাবে পাওয়া না গেলেও, সাক্ষরতার হার (Literacy Rate) একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত থেকে বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করার সময় ভারতের সাক্ষরতার হার ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের—মাত্র ১০% থেকে ১৮% এর মধ্যে, যেখানে পুরুষ সাক্ষরতা ছিল ১৮% এবং নারী সাক্ষরতা ছিল মাত্র ৮% । অপরদিকে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সাক্ষরতার হার ছিল ১৬% । বাংলাদেশের জন্য ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় সাক্ষরতার হার সংক্রান্ত তথ্যে কিছুটা তারতম্য দেখা যায়; কোনো তথ্যমতে তা ছিল ১৬.৮%, আবার কোনো তথ্যমতে তা ছিল ১৭.৬% বা ১৫-২০%  এবং কোনো মতে ৩০% । তবে সাধারণভাবে ধরা হয় এটি প্রায় ১৭% এর কাছাকাছি ছিল।
  • দ্বিতীয়ত, শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা (Gender Parity in Education) বিচারে স্বাধীনতার শুরুতে সব দেশেই নারীদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত পিছিয়ে। ভারতে নারী সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৮%, যা পুরুষদের তুলনায় অনেক কম । পাকিস্তানেও একই চিত্র বিরাজমান ছিল, যেখানে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধার কারণে নারী শিক্ষা উপেক্ষিত ছিল এবং পরে ১৯৫০-৬০-এর দশকেও নারী সাক্ষরতার হার ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের । বাংলাদেশও স্বাধীনতার সময় ব্যাপক লিঙ্গ বৈষম্যের সম্মুখীন হয়েছিল, যেখানে বিদ্যালয়ে মেয়েদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য ।
  • তৃতীয়ত, মানব উন্নয়ন সূচকে (Human Development Index-HDI) স্বাধীনতা লাভের সঠিক বছরগুলোর তৎকালীন মান পাওয়া না গেলেও, পরবর্তী সময়ের তথ্য থেকে ধারণা করা যায় যে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই নিম্নমানের মানব উন্নয়ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ১৯৯০ সালের পরবর্তী প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানব উন্নয়ন গোষ্ঠীতেই অবস্থান করছে, যা স্বাধীনতার সময়েও খুব একটা উন্নত ছিল না বলে ধারণা করা যায় ।
  • চতুর্থত, জ্ঞান ও উদ্ভাবন সূচক (Knowledge and Innovation Index) স্বাধীনতার প্রাথমিক পর্যায়ে বর্তমান ধারণার মতো করে না থাকলেও, সেই সময়ে তিনটি দেশের জ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও অপ্রতুল।
  • পঞ্চমত, বেকারত্বের হার (Unemployment Rate) নিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী নির্দিষ্ট তৎকালীন তথ্য পাওয়া না গেলেও, দারিদ্র্যের হার (Poverty Rate) সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রায় ৩৩.৩% জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত । ভারতেও স্বাধীনতার সময় দারিদ্র্যের হার ছিল ব্যাপক, যেখানে বিশাল জনগোষ্ঠী চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করত । বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে দারিদ্র্যের হার ছিল অত্যন্ত উচ্চমাত্রার, যদিও সেসময়ের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া দুষ্কর। পরিশেষে বলা যায়, স্বাধীনতার প্রারম্ভিক লগ্নে তিনটি দেশই শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দারিদ্র্যমোচনের ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল, যেখানে ভারত ও পাকিস্তান ১৯৪৭ সাল থেকে এবং বাংলাদেশ ১৯৭১ সাল থেকে অত্যন্ত নিম্ন ভিত্তিমঞ্চ থেকে তাদের যাত্রা শুরু করে।

শিকড়ের সন্ধানে

ইতিহাসের পথপ্রান্তে দাঁড়ালে মনে হয়, প্রতিটি স্বাধীন জাতির শৈশবকাল যেন এক একটি রোমান্টিক ও করুণ একইসঙ্গে কাব্য। উপনিবেশের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ যখন নতুন প্রভাতের সূর্যকে বরণ করে নেয়, তখন তাদের হাতে ছিল অন্ধকারের পাহাড়সম অশিক্ষা। স্বাধীনতার প্রথম পাঁচ থেকে দশ বছর—এই সময়টুকুই যেন এক সংগ্রামী প্রতিজ্ঞার স্বর্ণক্ষর। ভারতের জন্য তা ১৯৪৭-৫৭, পাকিস্তানের জন্য একই বর্ষপঞ্জি। বাংলাদেশের জন্য এই সময়কাল আরও দুরূহ, ১৯৭১-এর ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যবর্তী নির্মাণযাত্রা। তিন দেশ, তিন পথচলা। আজ, এই ফিচারটিতে আমরা সে-পথের ধুলোয় হাতড়ে দেখব কীভাবে স্বাধীনতার পরম্পরার প্রথম দশকের ভিত গড়ার স্বপ্নগুলি একে অপরকে ছাপিয়ে যায়, আবার কোথাও মিলে যায় অভিন্ন বাস্তবতার কাদায়।

  • ভারতের স্বাধীনতার প্রথম দশকে নেহরুর নেতৃত্বে এক ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী ও আধুনিক জাতির স্বপ্ন দেখা হচ্ছিল। ১৯৫০-এর দশকের গোড়ায় বাংলার গ্রাম, মাদ্রাজের প্রান্তিক জনপদ কিংবা পাঞ্জাবের খোলা মাঠ—সরকারি চেষ্টায় স্কুলের দরজা যেন খুলতে শুরু করেছিল। নেহরু বলেছিলেন, "একটি জাতি তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেয়।" সেই ভবিষ্যৎ বেছে নিতে ভারত তাদের 'মৌলিক শিক্ষা' পদ্ধতিকে সংশোধন করে তিনটি ভাষার সূত্র চালু করে: আঞ্চলিক ভাষা, হিন্দি ও ইংরেজি। আঞ্চলিক ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার এই জোর উদ্যোগ অভূতপূর্ব। গ্রামের আঙিনায় আঙিনায় তৈরি হতে থাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়। অন্যদিকে, একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠান (আইআইটি) খড়গপুর—যা আজ বিশ্ববিখ্যাত। প্রকৌশল ও প্রযুক্তির প্রতি এই ঝোঁকই ভারতের প্রথম দশকের সবচেয়ে বড় লাভ। কিন্তু এই ছবির উল্টো দিকটাও কম নয়। তখনও ভারতের সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৮ শতাংশের কাছাকাছি। সমাজের শোষিত নারী ও নিম্নবর্ণের মানুষের কাছে বিদ্যালয় ছিল দূরবীন দিয়ে দেখা তারকাখচিত স্বপ্ন। কলকাতার কোনো সংবাদপত্র কর্মীর কলম থমকে দাঁড়াত গ্রামীণ অন্ধকারে—পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে যাওয়ার দৃশ্য যেমন পরশ্রীকাতর ছিল, তেমনি দীপ্তিময়ও।
  • নেহরু কর্তৃক নিযুক্ত 'বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কমিশন' (১৯৪৮-৪৯) এবং 'মাধ্যমিক শিক্ষা কমিশন' (১৯৫২-৫৩) তাঁদের প্রতিবেদনে শিক্ষাকে গণতান্ত্রিক ও অভিজাত দুই ধারায় বিভক্ত করার বিপদ দেখিয়েছিল। তথাপি, স্বাধীনতার দশ বছরের মাথায় এসে ভারত একটি কেন্দ্রীয় শিক্ষা পরামর্শ দাতা বোর্ড গঠন করে, যা সামগ্রিক নীতি নির্ধারণ করলেও জনসংখ্যার চাপে নিম্নমানের শিক্ষার বীজও বপন করে। তবু, ভারত এগিয়েছিল। কেন? কারণ তাদের ব্রিটিশ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতি ও প্রশাসনিক কাঠামো মোটামুটি অক্ষত ছিল। দিল্লি, বোম্বে, কলকাতা, মাদ্রাজ—এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের প্রদীপ জ্বলছিল।
  • অন্যদিকে একই বছরগুলোতে পাকিস্তানের গন্তব্য ছিল অনেক বেশি নৈরাশ্যজনক। পাকিস্তানের জন্মের সময় তাদের ছিল না কোনো প্রাণকেন্দ্রিক রাজধানী, ছিল না কোনো পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় ও সিন্ধু মাদ্রাসার বাইরে পশ্চিম পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষার জায়গা ছিল অপ্রতুল। আর পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অবস্থা আরও নাজুক। স্বাধীনতার পাঁচ বছর পর ১৯৫২ সালেই বাংলা ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে দিয়েছিল, শুধুমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দম্ভ পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার ভিতই নষ্ট করে দেবে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল থেকে শুরু করে সামরিক শাসকদের মধ্যে শিক্ষার স্থায়ী নীতি তৈরি হয়নি। মোট ছয়টি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছিল, কিন্তু প্রতিটি বাতিল হয়েছে। মাওলানা মওদুদীর ইসলামীকরণের তত্ত্ব এবং আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার দ্বন্দ্ব সেখানে চরম আকার নেয়। পাকিস্তানের শিক্ষায় পড়লাম অভিজাত ও জনগণের মধ্যে ফাটল। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল গড়ে উঠল কেবল সেনা ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের জন্য, আর প্রান্তিক মানুষ পড়ে রইল মক্তব ও মাদ্রাসার গণ্ডিতে।
  • এই প্রথম দশকে পাকিস্তানের শিক্ষার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের বৈষম্য। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) শিক্ষার হার কিছুটা বেশি ছিল—বিশেষ করে কলকাতা-বিভক্ত অঞ্চলের প্রভাবে। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় বাজেটে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য শিক্ষা বরাদ্দ ছিল নিতান্তই উপেক্ষিত। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে তৎকালীন শিক্ষাবিদদের অভিযোগ, "পাঞ্জাবের প্রতি পক্ষপাত শিক্ষাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় শত্রু বানিয়েছে।" ১৯৫৯ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন, যা 'শিক্ষার শিল্পায়ন'-এর কথা বললেও তার সিংহভাগ সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলশ্রুতিতে, স্বাধীনতার দশক পার হবার পরেও পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল খণ্ডবিখণ্ড, ছেঁড়া ক্যানভাসের মতো।
  • এবার আসি সবচেয়ে রক্তাক্ত ও নবীন জাতি—বাংলাদেশের কথায়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর, সেই বিজয়ের মাত্র পাঁচ বছর পর থেকে শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষার ভিত গড়ার লড়াই। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রায় সবকিছু পুড়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতার প্রথম দশক বাংলাদেশের জন্য মানে ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সময়কাল। শুধু কল্পনা করুন: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে স্বদেশে ফিরে আসেন, তখন চারদিকে ধ্বংসের স্তূপ। স্কুল ভবন পুড়ে গেছে, হিন্দু শিক্ষকদের নির্বাচিত করে নেওয়া হয়েছে, লাখ লাখ পরিবার উদ্বাস্তু। আর সেই ক্ষণেই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, "শিক্ষাই হবে জাতির অস্ত্র।" ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হয় বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন—ডঃ কুদরত-ই-খুদা কমিশন। এই কমিশনের রিপোর্ট ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। এতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে রাষ্ট্রায়ত্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
  • বাংলাদেশের এই প্রথম দশকের শিক্ষারূপটি অনন্য: তারা পূর্ব পাকিস্তানে প্রচলিত উপনিবেশিক কাঠামোকে ভেঙে একটি নতুন মডেল দিতে চেয়েছিল। যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র শিক্ষার মূল পাঠ্য। স্বাধীনতার পাঁচ বছর পর ১৯৭৬-এ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সম্পদের অভাব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক শাসনের নিচে শিক্ষা আবার ঘুরপথে যায়। জিয়াউর রহমানের সময় কিছু ইসলামীকরণের সুর আসে, যা প্রথম দশকের আদি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতিতে ছেদ ফেলে। তথাপি, এই সময়েই বাংলাদেশ গ্রামে গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা আকাশচুম্বী করে। ১৯৮১ সালের মধ্যে ৩৫ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। সাক্ষরতার হার ২০.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ২৮ শতাংশে ওঠে—সংগ্রামের দামামা।

তিন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম দশকের তুলনা টানতে গেলে চোখে পড়ে তিনটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ভারতে নেহরু যুগের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল একটি "বিপরীত সেতু"—একদিকে গ্রাম-ওরিয়েন্টেড মৌলিক শিক্ষা ও অন্যদিকে শহরকেন্দ্রিক অভিজাত ইংরেজি মাধ্যম। পাকিস্তানে এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র। সেখানে একদিকে ইসলামি ও উর্দু শিক্ষার মাধ্যমে একীভূতকরণের প্রবল চাপ, অন্যদিকে পশ্চিমা আদলের মডেল বিদ্যালয়ের প্রসার। এই দ্বন্দ্বের বীজ থেকে রাষ্ট্রীয় শিক্ষার নির্মাণ সম্ভব হয়নি। অথচ বাংলাদেশ, যেটি সবচেয়ে দুর্বল অবস্থা থেকে শুরু করেছিল, তাদের প্রথম দশকের শিক্ষার ভিতটি আকর্ষণীয়ভাবে 'জনমুখী' ছিল। কম বাজেটের মধ্যেও বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ (১৯৭৯ সাল থেকে), মেয়েদের শিক্ষায় ভর্তি ভাতা ও গ্রামীণ মহিলা শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। ভারত ও পাকিস্তানে স্বাধীনতার প্রথম দশকে মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ ছিল অনেকটাই আলসেমি। বাংলাদেশ এগিয়ে ছিল—কারণ তাদের যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতনের স্মৃতি শিক্ষার মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়নকে অপরিহার্য করে তুলেছিল।

একটি স্মরণীয় ঘটনা না উল্লেখ করে পারি না: ১৯৫০ সালে ভারতে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় শিক্ষা বরাদ্দ ছিল ১৫০ কোটি টাকা (সে সময়ের মূল্য)। কিন্তু ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় শিক্ষা বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ—যা সে সময়ের উন্নয়নশীল বিশ্বের গড়কেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেদিক থেকে বাংলাদেশের প্রথম দশক ছিল "ক্ষতবীজের আত্মবিশ্বাসের দলিল"। ভারত ধীরে ধীরে, পরিকল্পিতভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার ব্রত নিয়েছিল। পাকিস্তান কেবল অভিজাত বর্গের দুর্গ নির্মাণে সন্তুষ্ট ছিল। আর বাংলাদেশ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্কুল পৌঁছে দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল—যদিও গুণগত মানে তখনও অনটন।

কিন্তু বাস্তবতার পঙ্কিল চোখে দেখলে যে সমান্তরাল পথ চোখে পড়ে: সব তিন দেশই স্বাধীনতার প্রথম দশকের শেষে চূড়ান্তভাবে একটি সুষম শিক্ষানীতি পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছিল—তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কাঠামোগত ঋণের কারণে পরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ভারত ও পাকিস্তানের প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার ছিল ৬০ শতাংশের মতো, বাংলাদেশেও অনেকটা।

শেষ কথা—স্বাধীনতার আকাশে প্রথম দশকের সূর্য যেমন আলো ছড়ায়, তেমনি অমাবস্যার ঘন ছায়াও ফেলে। ভারতের পথে সায়েন্স ও টেকনোলজির জয়যাত্রা, পাকিস্তানের পথে দ্বিচারিতার জঞ্জাল, আর বাংলাদেশের পথে সৃষ্টির মর্মবেদনা ও ফিনিক্স পাখির পুড়ে ওঠার কাহিনি। আজ যখন ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির পথে দৌড়াচ্ছে, পাকিস্তান শিক্ষার গভীর সংকটে জর্জরিত, এবং বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়ে পাকিস্তানকে টপকে গেছে—ঠিক সেই চিত্রের বীজ রোপিত হয়েছিল এই প্রথম দশকগুলোতে। উপমহাদেশের ইতিহাসে এই সময়ের শিক্ষা কেবল ক্লাসরুমের গল্প নয়; এটি ছিল একটি জাতির নিজের অস্তিত্বকে আবিষ্কারের দুরূহ অধ্যায়। আর সেই অধ্যায় পড়তে পড়তে যতই পথ চলি, ততই বুঝি—শিক্ষা মানে শুধু অক্ষর নয়, এটি স্বপ্নের ফসল, যা বহু আগে বপন করতে হয়—এখনই যেন কেবল ফসল তোলার পালা।

তুলনামূলক পর্ব: শিক্ষার লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারে ভিন্ন পথ, অভিন্ন দ্বিধা

স্বাধীনতার প্রথম দশকের গাঢ় স্মৃতিকে আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য এখন আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে তিন দেশের শিক্ষানীতির মূল প্রতিপাদ্য ও অগ্রাধিকারের দিকে। কারণ শুধু স্কুল সংখ্যা বা বাজেটের হিসাব দিয়ে জাতির শিক্ষাদর্শ নির্ণয় করা যায় না—প্রয়োজন সেই অদৃশ্য আদর্শের ম্যাপ, যার ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিটি দেশ তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়তে চেয়েছিল।

  • ভারতনেহরুর স্বপ্নজাতীয় ঐক্য ও বিজ্ঞানমনস্কতা: ভারতের জন্য স্বাধীনতা মানে ছিল এক বিশাল বৈচিত্র্যের মেলবন্ধন। লক্ষ্য ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ প্রতিষ্ঠা। তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল দ্বিগুণ: একদিকে প্রাচীন কুসংস্কার ও সামাজিক বৈষম্য দূর করা, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিতে পা রাখা। ১৯৪৮ সালের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কমিশন (রাধাকৃষ্ণণ কমিশন) স্পষ্ট ঘোষণা করে—শিক্ষা হবে চরিত্র গঠনের হাতিয়ার, চাকরির সার্টিফিকেট নয়। কিন্তু বাস্তবে অগ্রাধিকার পায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠান। নেহরু চেয়েছিলেন ‘আধুনিক মন্দির’ হিসেবে আইআইটি ও জাতীয় পরমাণু শক্তি কমিশন। প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ছিল দরকারি, কিন্তু বাজেটের সিংহভাগ চলে যায় উচ্চশিক্ষায়। এই সিদ্ধান্তের যুক্তি ছিল—দেশের মেরুদণ্ড গড়তে হলে দক্ষ জনশক্তি দরকার। তবে পরিণতিতে গ্রামীণ ভারতের অধিকাংশ শিশুই পিছিয়ে পড়ে। অগ্রাধিকারের এই টানাপড়েন ভারতের প্রথম দশকের মূল বৈশিষ্ট্য।
  • পাকিস্তানইসলাম ও উর্দুর রাজনীতি: পাকিস্তানের শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন আখ্যান। দেশের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহ শিক্ষাকে ধর্মনিরপেক্ষ রাখতে চাইলেও তাঁর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে ইসলামি পরিচয়কে কেন্দ্রে তোলা হয়। ‘পাকিস্তান’ নামটির অর্থই ‘পবিত্রদের দেশ’—সেখানে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে একটি ইসলামিক সংস্কৃতি ও নৈতিকতার প্রজন্ম তৈরি করা। ১৯৫৯ সালের আইয়ুব খানের শিক্ষা কমিশন ‘তিন ধাপের শিক্ষা’-র কথা বললেও মূল অগ্রাধিকার দেয় মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয়ঘটিত ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি’ মডেলে। কিন্তু বাস্তবে এই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। কারণ পাকিস্তানের শিক্ষানীতি তৈরি করতেন অভিজাত পশ্চিমাপন্থী আমলারা, আর পালন করতে হতো প্রান্তিক সাধারণ মানুষকে। অগ্রাধিকার পায় সেনা ও প্রশাসনিক পরিবারের সন্তানদের জন্য ইংরেজি মাধ্যমের নেটওয়ার্ক, আপামর জনতার জন্য নেই খানিক পাঠ্যপুস্তকের বন্দোবস্ত। উর্দুকে জাতীয় ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার যে অগ্রাধিকার, তা পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষী জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এই সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদী মনোভাবই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দেয়।
  • বাংলাদেশধ্বংস থেকে নির্মাণ, অস্তিত্বের প্রমাণ: বাংলাদেশের উদ্দেশ্য ছিল সবচেয়ে বাস্তববাদী ও সংকটময়। ভাষা শহীদদের রক্তে লেখা স্বাধীনতা—এই দেশের শিক্ষার প্রথম অগ্রাধিকার ছিল 'বাংলা ভাষায় শিক্ষা' ও 'ধর্মনিরপেক্ততা'। কুদরত-ই-খুদা কমিশন ১৯৭৪ সালে ঘোষণা করে: শিক্ষার লক্ষ্য হবে একটি শোষণমুক্ত, মানবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন। আর তাই অগ্রাধিকারক্রমে ছিল—প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, নারী শিক্ষার প্রসার, কৃষি ও কারিগরি শিক্ষার প্রচলন। ভারত যেখানে উচ্চশিক্ষায় ফোকাস করেছিল, বাংলাদেশের প্রথম দশকের অগ্রাধিকার ছিল 'সবার জন্য শিক্ষা'র ভিত্তি তৈরি। পাকিস্তানের বিপরীতে এখানে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ছিল না। তবে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ছিল অনন্য: যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন ও বিশাল শিক্ষক স্বল্পতা। তাই অগ্রাধিকার তালিকায় পরবর্তী স্থানে চলে যায় উচ্চশিক্ষার গুণগত মান। এই ‘ভিত্তিকে আগে বড়াই’ করার সিদ্ধান্তই পরবর্তীকালে বাংলাদেশকে প্রাথমিক শিক্ষায় এগিয়ে দিতে সাহায্য করে, যদিও সমালোচকরা বলেন যে এর ফলে উচ্চশিক্ষায় গুণগত মান কমে যায়।

তুলনা ও প্রতিফলনমূলক মন্তব্য

তিন দেশের এই লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের পার্থক্যটি যেন এক অমৃতকুম্ভের তিনটি পৃথক স্বাদ। ভারত জাতীয় ঐক্য ও প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি অভিজাত-গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা করে। পাকিস্তান ইসলামী আদর্শ ও উর্দুকে কেন্দ্র করে একটি অসম্পূর্ণ ও দ্বিচারিত নীতি গ্রহণ করে। আর বাংলাদেশ ভাষা ও মৌলিক অধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে একটি সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার পথ বেছে নেয়। এখন ইতিহাসের রায়ে দেখা যায়, ভারত ও বাংলাদেশ যদিও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে গেছে, পাকিস্তান বারবার তার অসংলগ্ন অগ্রাধিকারের দাম দিচ্ছে। কিন্তু অভিন্ন সত্য হলো—স্বাধীনতার প্রথম দশকে তিন দেশের শিক্ষা নীতি নির্ধারকরা সবাই স্বপ্ন দেখেছিলেন একটা ‘সোনার বাংলা’ বা ‘রাম রাজ্য’ বা ‘ইসলামি আদর্শ’–এর; সেই স্বপ্নপূরণের পথে প্রত্যেককেই হোঁচট খেতে হয়েছে ইতিহাসের আর্থ-রাজনৈতিক জটিলতায়, বিদেশি ঋণচাপে, আর যুদ্ধের দগ্ধতায়।

তথাপি আজ যখন এই তিন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে, সেই প্রতিভার উৎস খুঁজলে দেখা যায়—ভারতের আইআইটি, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার হার আর পাকিস্তানের কিছু ইংরেজি স্কুল—এ সবই স্বাধীনতার প্রথম দশকের গোড়াপত্তনের ফসল। ফসল যেমন মাটির অজান্তেই বেড়ে ওঠে, তেমনি শিক্ষার ইতিহাসের এই শিকড়গুলো আজও অনালোকিত থেকেই জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে চলেছে।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের শিক্ষা, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সূচকের বর্তমান অবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ও শিক্ষার হার (School Enrollment & Literacy Rate)-এ বাংলাদেশ সাম্প্রতিক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের ভর্তির হার বাংলাদেশ ও ভারতে পাকিস্তানের তুলনায় বেশি। অপরদিকে পাকিস্তানে এখনও বিপুল সংখ্যক শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে। সাক্ষরতার হারে ভারত (৭৭%) ও বাংলাদেশ (৭৫%) প্রায় সমান, যেখানে পাকিস্তান (৬০% এর নিচে) পিছিয়ে। লিঙ্গ সমতা (Gender Parity in Education)-র ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মেয়েরা ছেলেদের সমান বা তার চেয়েও বেশি অংশগ্রহণ করছে। ভারতেও লিঙ্গ ব্যবধান কমেছে, তবে গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে বৈষম্য রয়ে গেছে। পাকিস্তানে শিক্ষাক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায়।

মানব উন্নয়ন সূচকে (Human Development Index, HDI) ভারত (০.৬৪৪) ও বাংলাদেশ (০.৬৬১) একই কাতারে অবস্থান করলেও বাংলাদেশ হালকা এগিয়ে, আর পাকিস্তান (০.৫৪৪) নিম্নমানব উন্নয়ন গোষ্ঠীতে পড়েছে। জ্ঞান ও উদ্ভাবন সূচকে (Knowledge and Innovation Index) ভারত উন্নত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি খাতের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে, পাকিস্তান মাঝামাঝি, আর বাংলাদেশ এখানে পিছিয়ে। বেকারত্বের হারে (Unemployment Rate) ভারত ও পাকিস্তানে বাংলাদেশের তুলনায় বেকারত্ব বেশি, তবে বাংলাদেশে স্বল্পপ্রকাশ্য (disguised) ও খণ্ডকালীন বেকারত্ব ব্যাপক। দারিদ্র্যের হারে (Poverty Rate) বাংলাদেশ চরম দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে (প্রায় ১৯% নিম্নদারিদ্র্য সীমার নিচে), ভারতের পরিস্থিতি জাতীয় গড়ে উন্নত (প্রায় ২২% বহুমাত্রিক দারিদ্র্য), আর পাকিস্তানে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলক বেশি (প্রায় ৪০% নিম্ন আয়ের সংজ্ঞার ওপর নির্ভরশীল)। সর্বোপরি, মানব উন্নয়ন ও শিক্ষায় বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে গেলেও উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানে ভারত এগিয়ে, আর পাকিস্তানে সব সূচকেই জরুরি সংস্কার প্রয়োজন।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও স্বাধীনতা উত্তর অগ্রগতি: তিন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সংকট ও চ্যালেঞ্জের প্রতিচ্ছবি

স্বাধীনতার পথচলার প্রথম দশকের সেই কাব্য ও করুণা আজ ইতিহাসের পাতায় স্থির ছবি হলেও, সেই ছবির সূতারেখা বরাবর এগিয়ে এসেছে বর্তমান—এক জটিল, ক্লান্ত ও বিস্ময়কর সময়। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—তিন দেশই আজ শিক্ষার চত্বর দাঁড় করিয়েছে বিশাল জনগণের ভিড়ে। স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে, সাক্ষরতার হার আকাশচুম্বী (ভারতে প্রায় ৭৮%, বাংলাদেশে ৭৫%, পাকিস্তানে ৬০%-এর ঘরে), বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়েছে বৃক্ষরাজির মতো। কিন্তু তারই গভীর শিকড়ে কী লুকিয়ে আছে? এক একটি দেশের শিক্ষা আজ নানা দুর্বিষহ সংকটের সম্মুখীন। চলো, তুলনামূলক আলোকপাত করি।

  • ভারতগুণগত মানের অভাব ও অসমতার প্রশ্ন: ভারতের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিম্নমানের শিক্ষা ও আঞ্চলিক বৈষম্য। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘সর্বশিক্ষা অভিযান’ ও ‘রাষ্ট্রীয় মধ্যমিক শিক্ষা অভিযান’ নামে প্রকল্প থাকলেও, বেশিরভাগ সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকের উপস্থিতি, অবকাঠামো ও পাঠদানের মান নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ‘আসর’ নামক একটি বেসরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রদের অর্ধেকের কম দ্বিতীয় শ্রেণির গণিত করতে পারে। এ যেন এক ‘শিক্ষিত অশিক্ষা’। দ্বিতীয় সংকটটি হলো ব্যক্তিগত খাতের আগ্রাসী সম্প্রসারণ। শহর ও ছোট শহরে ইংরেজি মাধ্যমের বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে, যা গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অনাগম্য। ফলে শিক্ষা ব্যয় বাড়ছে, সামাজিক বিভাজন ঘনীভূত হচ্ছে। তৃতীয়ত, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চাপে পাঠ্যপুস্তকে সংশোধনবাদ ও ইতিহাস বিকৃতির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ক্রমশ ক্ষয় পাচ্ছে। এই তিন সংকটের ত্রিশূল ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্নের বক্ষ ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে।
  • পাকিস্তানপ্রাতিষ্ঠানিক পতন ও চরম বৈষম্য: পাকিস্তানের বর্তমান চিত্রটি আরও ভয়াবহ। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা ‘দুই দ্বীপ'-এর মতো—একদিকে কিছু অভিজাত ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল, অন্যদিকে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসার অবর্ণনীয় দুরবস্থা। পাকিস্তানের শিক্ষা বাজেট জিডিপির মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি—যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। শিশু ঝরে পড়ার হার ভয়াবহ, বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের। আরেকটি সংকট হলো মাদ্রাসা শিক্ষার সমান্তরাল ব্যবস্থা, যেখানে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সন্ত্রাসবাদী চরমপন্থা লালিত হয়। এসব মাদ্রাসায় আধুনিক বিজ্ঞান ও গণিতের চর্চা নেই বললেই চলে। ফলে পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ হয়ে উঠছে শিক্ষার দিক থেকে বিচ্ছিন্ন, অর্থনৈতিক দিক থেকে অদক্ষ। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে ২ কোটি ৮০ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে—যা বিশ্বের মধ্যে চীন ও নাইজেরিয়ার পর তৃতীয় সর্বোচ্চ। সংকটের মূল শিকড় হলো অস্থির রাজনীতি, বার বার সামরিক হস্তক্ষেপ, এবং শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রীয় অনীহা। যদি স্বাধীনতার প্রথম দশকের পাকিস্তান লক্ষ্যের অমিলে ভুগছিল, তাহলে বর্তমানে সে ভুগছে শিক্ষাকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার অস্ত্র’ হিসেবে না দেখে ‘জনকল্যাণের মৌলিক অধিকার’ হিসেবে গণ্য করতে ব্যর্থ হওয়ায়।
  • বাংলাদেশসাফল্যের পাশে বঞ্চনার কালো ছায়া: বাংলাদেশের গল্পটি আপাতদৃষ্টিতে আশাব্যঞ্জক। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে তারা প্রাথমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা আনতে সক্ষম হয়েছে, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ চালু রেখেছে, পিইডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ স্কুলের উন্নতি করেছে। কিন্তু বর্তমান সংকট ও চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রথমত, শিক্ষার গুণগত মান এখনও পতনের মুখে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্রই বাংলা ও গণিতে প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারে না—একটি কঠিন সত্য। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত কোচিং সেন্টার ও মাদ্রাসার ভিড়। অভিভাবকরা ‘বোর্ড পরীক্ষায় ভালো ফল’ পেতে কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন, যা ক্লাসরুমের শিক্ষাকে বানচাল করছে। তৃতীয়ত, উঁচু স্তরে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার দুর্বল অবস্থা। বাংলাদেশের যুব সমাজের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষা শেষে বেকার থাকে, কারণ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার সংযোগ সুসংহত নয়। চতুর্থত, জলবায়ু উদ্বাস্তু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সন্তানদের জন্য শিক্ষা এখনও প্রান্তিক রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিদেশি দাতা সংস্থার ঋণ ও নীতির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ফলে ‘শিক্ষার বাজারিকরণ’ যেন এক মৃদু বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ ও উপসংহারমূলক মন্তব্য

তিন দেশের সংকটের মাঝে একটি রেখা অভিন্ন: শিক্ষার প্রতি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ঘাটতি এবং বৈষম্যের প্রসার। ভারতের সংকট মূলত গুণগত মান ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিপর্যয়ে। পাকিস্তানের সংকট একেবারে গঠনগত: রাষ্ট্র নিজেই শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয় না। বাংলাদেশের সংকট সাফল্যের আতিশয্যে অবহেলিত গুণগত মান ও কর্মমুখী শিক্ষার অভাব। আরেকটি মিল—তিন দেশেই বেসরকারি খাত শিক্ষা দখল করে নিচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যম বা আন্তর্জাতিক স্কুল যেন এক নতুন বর্ণপ্রথা সৃষ্টি করছে। আর শেষ কথা—প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে উপমহাদেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও মুখস্থবিদ্যা ও পুরনো পাঠ্যসূচিতে আবদ্ধ। এই ব্যবধান ঘোচাতে না পারলে শিক্ষা কেবলমাত্র ডিপ্লোমার পসরা নিয়ে দাঁড়াবে, জ্ঞানের দীপ্তি ছড়াতে পারবে না।

আজও রাতে কোনো গ্রামের কেরোসিন বাতির নিচে বসে ভারতের কোনো দলিত ছেলে অঙ্ক কষছে, পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের কোনো মেয়ে প্রাইভেট টিউটরের অভাবে মক্তবে বসে কোরআন মুখস্থ করছে, আর বাংলাদেশের চরের কোনো কৃষকের ছেলে জাল জালিয়ে মাছ ধরার ফাঁকে পাঠ্যবইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে। এই অমলিন দৃশ্যগুলিই প্রমাণ করে, স্বাধীনতার প্রথম দশকের যে প্রতিজ্ঞার শুরু, তা এখনও অর্ধপথে আটকে আছে। শেষ কথা—তিন দেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের বাস্তব সংকটের মোকাবিলায় তারা কতটা সাহসী, সৎ ও গণতান্ত্রিক হতে পারে তার ওপর। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড; সেটি না বাঁচালে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যায়।

স্বাধীনতার কাল থেকে বর্তমান: শিক্ষা, উন্নয়ন ও অর্থনীতির ফিতায় তিন দেশের অগ্রগতির গল্প

১৯৭১ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ, ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত ভারত ও পাকিস্তান—তিন দেশেরই যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় একই রকম নিম্ন ভিত্তিমঞ্চ থেকে। স্বাধীনতার সময় সাক্ষরতার হার ছিল ভারত ও পাকিস্তানে মাত্র ১০-১৮ শতাংশের ঘরে, আর বাংলাদেশে (১৯৭১) প্রায় ১৭ শতাংশ। নারী শিক্ষা ছিল প্রায় অবহেলিত; ভারতে নারী সাক্ষরতা ছিল মাত্র ৮ শতাংশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও ছিল একই চিত্র। মানব উন্নয়ন সূচকের কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব তখন না থাকলেও দারিদ্র্যের হার ছিল ভয়াবহ—পাকিস্তানে প্রায় ৩৩ শতাংশ, ভারতে আরও বেশি, আর বাংলাদেশে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিতে তা ছিল চরম পর্যায়ে। জ্ঞান ও উদ্ভাবনের অবকাঠামো বলতে তেমন কিছুই ছিল না তিন দেশেই।

এখন প্রায় অর্ধশতক বা তারও বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে, চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে নাটকীয় অগ্রগতি ঘটিয়েছে। স্বাধীনতার ১৭ শতাংশ সাক্ষরতা থেকে আজ তা ৭৫ শতাংশে উন্নীত—যা ভারতের ৭৭ শতাংশের প্রায় সমান, অথচ পাকিস্তান এখনও ৬০ শতাংশের নিচে আটকে আছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে লিঙ্গ সমতায় বাংলাদেশ তো স্বয়ং ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে; এখানে মেয়েরা এখন ছেলেদের চেয়েও এগিয়ে। ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও লিঙ্গ বৈষম্য থাকলেও বাংলাদেশ তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। অথচ পাকিস্তানে এখনও লাখ লাখ শিশু, বিশেষ করে মেয়েরা, বিদ্যালয়ের বাইরে।

মানব উন্নয়ন সূচকে (HDI) বাংলাদেশ বর্তমানে (০.৬৬১) ভারতের (০.৬৪৪) চেয়েও সামান্য এগিয়ে—একটি বিস্ময়কর কৃতিত্ব, কারণ স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশ ছিল সবচেয়ে পিছিয়ে। পাকিস্তান অবশ্য (০.৫৪৪) এখনও নিম্নমানব উন্নয়ন গোষ্ঠীতেই আটকে আছে। তবে জ্ঞান ও উদ্ভাবন সূচকে ভারত বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে—তাদের প্রযুক্তি খাত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ এশিয়ায় অনন্য। পাকিস্তান আছে মাঝামাঝি জায়গায়, আর বাংলাদেশ এখানে পিছিয়ে। অর্থনৈতিক সূচকে দারিদ্র্যের হার বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি কমাতে সক্ষম হয়েছে—প্রায় ১৯ শতাংশ নিম্নদারিদ্র্যসীমার নিচে, যেখানে ভারত ২২ শতাংশ (বহুমাত্রিক) আর পাকিস্তান প্রায় ৪০ শতাংশ। বেকারত্বের হিসাবে ভারত ও পাকিস্তানে বেকারত্ব বাংলাদেশের তুলনায় বেশি দেখালেও, বাংলাদেশে গোপন বেকারত্ব ও খণ্ডকালীন কাজ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে, গল্পটা প্রায় রূপকথার মতো: একসময়ের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ আজ শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভারতের কাছাকাছি বা কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে, অথচ পাকিস্তান শুরুতে যেখানে ছিল অনেকটা সেখানেই ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু উদ্ভাবন ও উচ্চশিক্ষিত কর্মসংস্থানে ভারত এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিন দেশের যাত্রা প্রমাণ করে, সঠিক নীতি ও সামাজিক বিনিয়োগই পারে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে—বাংলাদেশ তার উজ্জ্বল উদাহরণ।

ভবিষ্যৎ অভিমুখ: যেখানে মোড় ঘুরাতে হবে তিন দেশকেই

ইতিহাসের টানাপড়েন আর বর্তমানের জটিলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে এখন শিক্ষার নতুন এক দর্শন দিতে হবে। স্বাধীনতার প্রথম দশকের স্বপ্ন যেমন ছিল মুক্তির গান, তেমনি আগামীর প্রথম দশক (২০২৫-এর পরবর্তী সময়) হতে পারে বাস্তবায়নের কঠিন প্রহর। তিন দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, তাই পথও ভিন্ন। তবে একটি সত্য অভিন্ন—শিক্ষা যদি সবার জন্য সত্যিকার ‘অধিকার’ ও ‘গুণ’ উভয়ই না হয়, তাহলে উন্নয়নের গাড়ি শুধু কলেবরেই বড় হবে, মজবুতিতে নয়।

  • ভারতগুণগত মান ও অন্তর্ভুক্তির মিলন সেতু: ভারতের ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে তার ‘নীচের স্তরের ধস’। ‘ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি (এনইপি) ২০২০’ এই পথের মানচিত্র দিয়েছে। এতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ১০+২ কাঠামো ভেঙে ৫+৩+৩+৪ মডেল আনা, এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারায় আনার কথা বলা হয়েছে। ভারতের এগিয়ে যেতে হবে দুটি দিকে: এক, সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট ও প্রশিক্ষণের অভাব দূর করা; দুই, প্রান্তিক জাতি, উপজাতি ও সংখ্যালঘুদের জন্য বিনামূল্যে ও মানসম্মত শিক্ষার নিশ্চয়তা। ডিজিটাল বিভাজন মেটানোও জরুরি। ইতিমধ্যে ‘দীক্ষা’ প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন শিক্ষার প্রসার ভারতকে টেকসই পথ দেখাতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় কাজ হলো—শিক্ষার বাজারিকরণ রোধ করা এবং শিক্ষাকে চাকরির উৎপাদন কেন্দ্র না বানিয়ে মানবিক মূল্যবোধের আলোকবর্তিকা রূপে গড়ে তোলা। যদি এনইপি-র বাস্তবায়ন সৎ ও অংশীদারিত্বমূলক হয়, তাহলে ভারত বৈশ্বিক দক্ষতা ও সামাজিক সাম্য উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বনেতা হতে পারে।
  • পাকিস্তানরাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও সংস্কারের কঠিন পথ: পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার নয়, কিন্তু তাকে বেরোতে হবে আমূল সংস্কারের ভেতর দিয়ে। প্রথম শর্ত হলো শিক্ষা বাজেট জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশে উন্নীত করা। দ্বিতীয়ত, মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে হবে—ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান ও গণিত বাধ্যতামূলক করা। তৃতীয়ত, ‘পাকিস্তান সিঙ্গেল ন্যাশনাল কারিকুলাম’ প্রকল্পটি বিতর্কিত হলেও, এতে যদি আঞ্চলিক ভাষার প্রতি সম্মান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জুড়ে দেওয়া যায়, তাহলে জাতীয় ঐক্য গঠনে সহায়ক হতে পারে। চার নম্বরে, মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ—যেমন বিনামূল্যে পরিবহন, স্কুলের নিরাপত্তা, ও ভাতা কর্মসূচি—অপরিহার্য। পাকিস্তানের শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত শিক্ষানীতির ওপর। ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব দূর করে একটি ‘ন্যাশনাল এডুকেশন ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করা সময়ের দাবি। যদি তা না হয়, তাহলে শিক্ষিত ও অশিক্ষিতের মধ্যকার ব্যবধান পাকিস্তানকে আরও অস্থির করে তুলবে।
  • বাংলাদেশদক্ষতা ও অন্তর্ভুক্তির টেকসই মডেল: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথপ্রকাশে একটি শক্ত ভিত্তি আছে—প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা ও উপবৃত্তির সাফল্য। কিন্তু এখন লক্ষ্য হতে হবে ‘গুণগত মান’ ও ‘কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা’। প্রথমেই, শিক্ষকদের বেতন ও প্রশিক্ষণ দ্বিগুণ জোরদার করতে হবে, যাতে ক্লাসরুমে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি (যেমন ‘শিশু বান্ধব শিক্ষণ’) প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দিয়ে মাধ্যমিক পরবর্তী স্তরে ‘একটি শ্রেণি, একটি দক্ষতা’ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার (ডিজিটাল কন্টেন্ট, শিক্ষাপ্ল্যাটফর্ম ‘মুক্তপাঠ’) বাড়াতে হবে। চতুর্থত, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভাসমান স্কুল ও সাইক্লোন সেন্টারভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। বাংলাদেশকে আরও একটি বিপদ থেকে সাবধান হতে হবে—পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের দাসত্ব। সমাপনী ও পাবলিক পরীক্ষার চাপ কমিয়ে ‘শিখন ফলাফল’ ভিত্তিক চলমান মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা আবশ্যক। যদি বাংলাদেশ তার যুব সমাজের ৫০ শতাংশকে কারিগরি দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দিতে পারে, তাহলে আগামী দুই দশকে শিক্ষাই হবে তাদের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার মূল চালিকাশক্তি।

সকলের জন্য একটি অবশ্য পাঠ্য

পৃথক পথ হলেও তিন দেশকেই এক অস্বস্তিকর সত্য মেনে নিতে হবে—স্বাধীনতার প্রথম দশকের সেই ক্ষুধা ও প্রতিজ্ঞার আগুন এখন নিভে আসছে। শিক্ষার প্রতি উদাসীন রাষ্ট্র, অসহায় শিক্ষক, ন্যূনতম বাজেট আর বৈষম্যের পাহাড়—এসব যেন উপমহাদেশের বংশগত রোগ। ভবিষ্যৎ অভিমুখ সহজ নয়: ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষতার কঠিন পথে হাঁটতে হবে, পাকিস্তানকে রাষ্ট্রীয় পতন ঠেকাতে শিক্ষায় লাখ কোটি টাকা ঢালতে হবে, বাংলাদেশকে জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে সেতু বাঁধতে হবে। তারপরও আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে—এই তিন দেশের তরুণ প্রজন্ম আগের চেয়ে বেশি সচেতন, বেশি সংযুক্ত, এবং পরিবর্তনের জন্য উদগ্রীব। ইতিহাসের চাকা ধীরে ধীরে ঘোরে, কিন্তু ঘোরে। সম্ভবত আগামী দশকের শেষে আমরা দেখতে পাব—ভারতের কোনও গ্রামের মেয়ে টেকনোক্র্যাট হচ্ছে, পাকিস্তানের কোনও পশ্চাৎপদ অঞ্চলের বালক নোবেল পুরস্কার জিতছে, বাংলাদেশের চরের কোনও কিশোর আবিষ্কার করছে জলবায়ু-প্রতিরোধী ফসলের পদ্ধতি। সে দিন পর্যন্ত শিক্ষার এই যাত্রা অসমাপ্ত রূপকথার গল্পের মতো বয়ে চলুক—যেখানে প্রতিটি অশ্রুবিন্দু বীজ হয়, আর প্রতিটি বীজ একদিন সবুজ উদ্দাম বৃক্ষ।

সেতুবন্ধনের স্বপ্ন: একই মূল থেকে তিন শাখার মিলনমেলা

ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—তিনটি দেশ, তিনটি রাষ্ট্রের সীমানা। কিন্তু সীমানা কেবাল ভৌগোলিক। মাটির গভীরে, নদীর জলে, ফসলের গন্ধে, কবিতার ছন্দে আর মায়ের গালগল্পে তারা আজও অভিন্ন। একই উপমহাদেশের সন্তান বলে কথা। স্বাধীনতার প্রথম দশকে যে বিদ্বেষ ও দ্বিধা শিক্ষার ভিত কাঁপিয়েছিল, কালের বিবর্তনে আজ কি সেই ঘৃণার দেয়াল ভাঙার সময় আসেনি? আন্তর্জাতিক রাজনীতি যতই কঠোর হোক, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সহযোগিতার দরজা সবসময় খোলা রাখা যায়। শুধু প্রয়োজন ইচ্ছা আর দূরদর্শিতার।

কেন সহযোগিতা জরুরি?

তিন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মুখে অনেক অভিন্ন চ্যালেঞ্জ: প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া, নিম্নমানের শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষায় প্রযুক্তির অসম বণ্টন, কারিগরি শিক্ষার দুর্বলতা, এবং পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে অন্ধ মুখস্থবিদ্যা। আর আছে ভাষার প্রশ্ন—বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ইংরেজির জটির মোড়কে আটকে আছে লক্ষ লক্ষ শিশু। যদি একে অপরের সফল উদ্যোগ থেকে শেখা যায়, তাহলে তিন দেশই লাভবান হতে পারে। তাছাড়া বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে জ্ঞানবিনিময় কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অপরিহার্য।

সম্ভাবনার ক্ষেত্র

  • প্রথমত, ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষা বিনিময়। বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে থাকতে পারে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সঙ্গে পাকিস্তানের ফয়েজ আহমদ ফয়েজ ও ভারতের মীরজা গালিব। ভারত ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থীরা শিখতে পারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কাব্য ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। আবার বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা পড়তে পারে পাকিস্তানের সিন্ধি ও পাঞ্জাবি লোককাহিনি, ভারতের তামিল ও মারাঠি সাহিত্য। বিপরীতে, আঞ্চলিক ভাষায় তৈরি ডিজিটাল কন্টেন্ট শেয়ার করা যেতে পারে ‘ওপেন এডুকেশন্যাল রিসোর্স’ (ওইআর) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
  • দ্বিতীয়ত, যৌথ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও কারিকুলাম গবেষণা। তিন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র মিলে ‘সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট ফর এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট’ গঠন করতে পারে। সেখানে বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষকরা এক দেশের সফলতা (যেমন ভারতের ‘দীক্ষা’ অ্যাপ অথবা বাংলাদেশের ‘কুমন’ পাঠ্যপুস্তক বিতরণ মডেল) অন্য দেশে মানিয়ে নিতে পারতেন।
  • তৃতীয়ত, কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষায় যৌথ উদ্যোগ। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ‘টেকনিক্যাল ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট’ স্থাপনের চুক্তি হয়েছে। এরকম আরও কেন্দ্র খোলা যেতে পারে– যেখানে পাকিস্তানের ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীরা অংশ নেবে। তিন দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণ ডিজিটাল হ্যাকাথন, কোডিং অলিম্পিয়াড আর স্টার্টআপ ক্যাম্প বসানো সম্ভব।
  • চতুর্থত, ঐতিহ্য ও সংরক্ষণ শিক্ষা। একই সভ্যতার ধারক এই তিন রাষ্ট্রের জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলে ‘সিন্ধু-গাঙ্গেয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ কোর্স’ চালু করতে পারে। এতে মুসলিম স্থাপত্য, হিন্দু মন্দির নির্মাণশৈলী, বৌদ্ধ বিহার, বাউল গান, সুফি দর্শন—সবই পড়ানো যেতে পারে একই সিলেবাসে।
  • পঞ্চমত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু শিক্ষা। তিন দেশই ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের কবলে। বাংলাদেশ ও ভারতের তৈরি ‘নিরাপদ স্কুল’ নির্মাণ কৌশল, ত্রাণ বিতরণ শিক্ষায় পাকিস্তান অংশ নিতে পারে। আবার পাকিস্তানের পর্বত অঞ্চলের ভূমিকম্প মোকাবিলার পাঠ বাংলাদেশের জন্য উপকারী।

বাধা ও উত্তরণের পথ

স্বাভাবিকভাবেই ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব ও বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের জটিলতা এই সহযোগিতায় বড় অন্তরায়। উভয়ের মধ্যে কাশ্মীর, সন্ত্রাসবাদ ও কূটনৈতিক টানাপড়েন শিক্ষা বিনিময়কে প্রথমে কঠিন করে তুলবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, কঠিন সময়েও সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। ১৯৭৪ সালের কলকাতা চুক্তি, ২০১০-এর দশকে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত স্কুল বিনিময়, এমনকি পাকিস্তানের সিন্ধু থেকে বাংলাদেশের গীতালী শিল্পীদের অনানুষ্ঠানিক যাতায়াত—এসব প্রমাণ করে যে ‘জনগণের কূটনীতি’ সবসময় সম্ভব।

‘ট্রাম্প কার্ড’ হতে পারে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। ভিসা জটিলতা এড়িয়ে বর্তমানে সপ্তাহে একদিন জুম বা গুগল মিটের মাধ্যমে যৌথ সেমিনার, ওয়েবিনার, স্কুল-কলেজের বন্ধনী চালু করা সহজ। বিশ্বজনীন শিক্ষার হাত ধরে একদিন হয়তো খুলবে নতুন দ্বার। ততদিন পর্যন্ত অন্তত শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিষয়গুলোকে ‘অরাজনৈতিক’ ঘোষণা করে একটি ‘সাউথ এশিয়ান চার্টার ফর এডুকেশনাল কো-অপারেশন’ গঠন করা যেতে পারে। ইউনেস্কো ও সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি এ কাজে মধ্যস্থতা করতে পারে।

শেষ কথা

তখন কি একদিন সত্যি আসবে যখন দিল্লির কোনো শিশু করাচির কোনো সহপাঠীর কাছে ই-মেইল করবে ‘তোমার পাঠ্যবইয়ের গল্পটা অনেক সুন্দর’, আর ঢাকার কোনো তরুণ লাহোরের জাদুঘরের ভার্চুয়াল ট্যুর শেষে চমৎকৃত হবে? স্বাধীনতার প্রথম দশক ছিল বিচ্ছেদের; আগামীর দশক হতে পারে মিলনের। একই নীল আকাশ, একই শালিকের ডানা, একই মেঘের দেশ—শিক্ষা যেন তাদের পুনরায় মুখোমুখি দাঁড় করায়, শুধু পার্থক্য নয় মিলনকে সামনে রেখে। ইতিহাসের ভার বইতে বইতে ক্লান্ত এই উপমহাদেশের তরুণ প্রজন্মের প্রাপ্য হলো শান্তি ও জ্ঞানের সেতুবন্ধন। স্মরণ করা যাক কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমর বাণী—‘ভেদ নাহি, ভেদ নাহি, ভেদ গিয়েছে টুটে’—শিক্ষার আলোয় সেই ভেদ যেদিন টুটবে, তখন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান একসঙ্গে এগোবে বিশ্বকে দেখাতে, সংস্কৃতির বীজে বিভাজন নয়, বিভাজনকে হারিয়ে একতা গড়া যায়।

চূড়ান্ত প্রতিফলন

উপমহাদেশের শিক্ষার ইতিহাসের পাতা ওল্টালে একটি তিক্ত ও মধুর সত্য ফুটে ওঠে—স্বাধীনতার প্রথম দশকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি বাজেট বরাদ্দ, প্রতিটি ভাষা-নীতি আজও আলোড়িত করে আমাদের বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা। ভারতের আইআইটি আজ যেমন বিশ্বে সুনাম কুড়োচ্ছে, তেমনি একই বয়সী গ্রামীণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অর্ধেক শিক্ষার্থী ক্লাস ফাইভেও বাংলা বা হিন্দিতে সাবলীল পড়তে পারে না। পাকিস্তানের অভিজাত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো যেখানে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে চমকপ্রদ ফলাফল করছে, সেখানে দেশের এক তৃতীয়াংশ শিশু এখনও বিদ্যালয়ের ঠিকানাও জানে না। বাংলাদেশ বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক ও নারী শিক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ায় রোল মডেল হলেও, গুণগত মান ও কর্মমুখী শিক্ষার অসঙ্গতি যেন তাদের সোনার বাংলা গড়ার পথে পাথর হয়ে রইল।

এই ফিচার প্রতিবেদনের সূচনায় আমরা স্বাধীনতার প্রথম দশকের রোমান্টিক কাব্যগাথার কথা বলেছিলাম। কিন্তু উপসংহারে এসে বলতে হয়, সেই কাব্য অনেকখানি অসমাপ্ত। তিন দেশের শিক্ষাব্যবস্থাই এখন দুটি জটিল দ্বন্দ্বের মুখে—প্রথমত, ‘সমতাভিত্তিক প্রবেশাধিকার’ বনাম ‘গুণগত মান’; দ্বিতীয়ত, ‘ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও ধর্মীয় মূল্যবোধ’ বনাম ‘আধুনিক বিজ্ঞান ও বিশ্বনাগরিকত্ব’। স্বাধীনতার প্রথম দশকের নীতি-নির্ধারকরা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তারা হয়তো গর্ব করতেন সাক্ষরতা বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে, আবার কাঁদতেন শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ ও মূল্যবোধহানির বর্তমান ছবি দেখে।

তবুও আশার আলো আছে। তরুণ প্রজন্ম আজ সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন কোর্স, খোলা জ্ঞানভাণ্ডারের যুগে বেড়ে উঠছে। তাদের জন্য সরকারি স্কুলের গণ্ডি আর একমাত্র গন্তব্য নয়। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হাজার হাজার বেসরকারি উদ্যোগ, এনজিও চালিত ‘শিক্ষা টেকসই মডেল’ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবার সেই ফাঁক পূরণের চেষ্টা করছে। তবে যথার্থ পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন প্রতিটি দেশের সরকার শিক্ষা বাজেট কেবল সংখ্যার ঘর পূরণের কৌশল না করে বরং একটি ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ হিসেবে গণ্য করবে। উপমহাদেশের ইতিহাস একথা বারবার প্রমাণ করেছে—দারিদ্র্য, সাম্প্রদায়িকতা ও অশিক্ষার চক্র ভাঙতে পারে কেবল মানসম্মত ও মানবিক শিক্ষা।

আমাদের ফিচারের শেষ বাক্যটি তাই এতটা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই—আগামী পঞ্চাশ বছর পরে, যখন অন্য কোনো লেখক স্বাধীনতার শতবর্ষী শিক্ষাব্যবস্থার মূল্যায়ন করতে বসবেন, তখন কি তিনি লিখবেন তিন দেশের মাঝে ‘নক্ষত্রের ব্যবধান’ কমেছে, নাকি আরও বাড়বে? উত্তরটি আজ নয়, আগামীকালের সিদ্ধান্তের মধ্যে লুকিয়ে আছে। যে কটা বীজ এখন রোপণ করছি—শিক্ষকের শ্রদ্ধা, পাঠ্যসূচির বৈচিত্র্য, পরীক্ষার সংস্কার, তথ্যপ্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি—সেই বীজ একদিন এই মহাদেশকে জ্ঞানের অভয়ারণ্যে পরিণত করতে পারে। স্বাধীনতার প্রথম দশকের প্রতিজ্ঞা যেন শেষ দশকেও বেঁচে থাকে, শিক্ষার মশাল যেন কখনও নিভে না যায়।

অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#উপমহাদেশের_ইতিহাস #শিক্ষা_ব্যবস্থা #ভারত_পাকিস্তান_বাংলাদেশ #স্বাধীনতা_উত্তর_শিক্ষা #ইতিহাসের_শিকড় #বঙ্গবন্ধু_ও_শিক্ষা #নেহরুর_ভারত #পাকিস্তান_সংকট #কুদরাত_এ_খুদা_কমিশন #আইআইটি_ইতিহাস #শিক্ষানীতি #দক্ষিণ_এশিয়া #দেশভাগ_১৯৪৭ #মুক্তিযুদ্ধ_১৯৭১ #শিক্ষার_ভবিষ্যৎ #জাতীয়_উন্নয়ন #ViralHistory #EducationalEvolution



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: