odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 15th June 2026, ১৫th June ২০২৬
শাসক বদলেছে, কিন্তু কি বদলেছে রাষ্ট্রের আত্মা? মব সংস্কৃতি, রাজনৈতিক লেবেলিং, ইতিহাস-বিকৃতি ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ—হুমায়ুন আজাদের সতর্কবাণী কি আজ নতুন করে সত্য হয়ে উঠছে?

“সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে”: আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রূপক-পাঠ

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৫ June ২০২৬ ১৩:১৮

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৫ June ২০২৬ ১৩:১৮

অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় কলামদেশ চিন্তা

আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে হুমায়ুন আজাদের বিখ্যাত কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ করেছে এই বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার। মব কালচার, প্রতিশোধের রাজনীতি, ইতিহাসকে কালো-সাদা দেখার প্রবণতা, রাজনৈতিক লেবেলিং, গণতান্ত্রিক সহনশীলতার সংকট, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং মানুষের দীর্ঘ আশাভঙ্গের ইতিহাসকে রূপক, তথ্য ও বিশ্লেষণের সমন্বয়ে তুলে ধরা হয়েছে। প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশ কি বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের পথে এগোবে, নাকি ধীরে ধীরে “নষ্ট মানসিকতার” দখলে চলে যাবে রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি ও স্মৃতি?

সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে”—হুমায়ুন আজাদের সতর্কবার্তা কেন আজও প্রাসঙ্গিক?

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহসী চিন্তক হুমায়ুন আজাদ যখন লিখেছিলেন—“সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে”, তখন তিনি কেবল একটি কবিতা লিখছিলেন না; তিনি ভবিষ্যতের জন্য একটি সামাজিক সতর্কসংকেত রেখে যাচ্ছিলেন। তাঁর “নষ্ট” কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা ব্যক্তির নাম নয়। “নষ্ট” হলো সেই মানসিকতা, যা ক্ষমতাকে সেবা নয়, দখল হিসেবে দেখে; ভিন্নমতকে সম্পদ নয়, শত্রু মনে করে; সত্যকে অনুসন্ধান নয়, অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে সমাজকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়—রাষ্ট্র কি নাগরিকদের হবে, নাকি ক্ষমতার খেলোয়াড়দের? বিচার কি আইনের হাতে থাকবে, নাকি জনতার আবেগের হাতে? শিক্ষা কি মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্র হবে, নাকি মতাদর্শের যুদ্ধক্ষেত্র? আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতা সেই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

এই ফিচারটি কোনো দলীয় বিবৃতি নয়, কোনো রাজনৈতিক প্রচারপত্রও নয়। এটি একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা দেখব আমাদের আশা, হতাশা, বিভাজন, প্রতিশোধ, সহনশীলতা, ভয়, সাহস এবং ভবিষ্যৎ। আমরা দেখব কেন ইতিহাসকে কালো-সাদা দেখার প্রবণতা বিপজ্জনক, কেন রাজনৈতিক লেবেলিং সমাজকে বিভক্ত করে, কেন গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয় বরং ভিন্নমতকে নিরাপদ রাখার সংস্কৃতি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—হুমায়ুন আজাদের  ভবিষ্যদ্বাণী কি অবধারিত? নাকি এখনও সময় আছে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর? এই ফিচার সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজারই একটি চেষ্টা।

নতুন রং, পুরোনো ফাটল: আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশেনষ্ট মানসিকতা প্রত্যাবর্তন

বাংলাদেশের আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়টিকে যদি একটি বাড়ির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে দেখা যায়—বাড়িটির পুরোনো মালিকানা বদলেছে, দেয়ালে নতুন রং লেগেছে, দরজার সামনে নতুন সাইনবোর্ড ঝুলেছে; কিন্তু ভিতরের ফাটল, সিঁড়ির ভাঙা ধাপ, ছাদের চুইয়ে পড়া পানি, আর অন্ধকার ঘরে জমে থাকা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ থেকে গেছে। বরং কোথাও কোথাও সেই ফাটল আরও প্রশস্ত হয়েছে। যে পরিবর্তনের ভোরকে মানুষ ভেবেছিল মুক্তির আলো, তার কিছু অংশ দ্রুতই পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তার কুয়াশায়।

হুমায়ুন আজাদ তাঁর কবিতায় যে “নষ্টদের” কথা বলেছিলেন, তারা কোনো নির্দিষ্ট দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম নয়; তারা এক ধরনের মানসিকতা—যে মানসিকতা ক্ষমতাকে নীতি নয়, দখল মনে করে; বিচারকে আইন নয়, প্রতিশোধ মনে করে; জনতাকে নাগরিক নয়, অস্ত্র মনে করে; আর ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নয়, শত্রুর চিহ্ন মনে করে। আগস্ট ২০২৪-এর পর বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই “নষ্ট মানসিকতা” বারবার মাথা তুলেছে—কখনো মব সংস্কৃতিতে, কখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়, কখনো মতপ্রকাশের সংকোচনে, কখনো সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের নিরাপত্তাহীনতায়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এই সংকটের ইঙ্গিত দিয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, সাংবাদিক হয়রানি এবং অধিকার-সংকট গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও মতপ্রকাশ, সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এই সময়টিকে আরেকটি রূপকে বলা যায়—এটি যেন ধানক্ষেতে আগাছার ঋতু। ধান গজানোর কথা ছিল ন্যায়বিচার, সংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও নাগরিক মর্যাদার নামে; কিন্তু তার পাশে পাশে বেড়ে উঠেছে সন্দেহ, প্রতিশোধ, গুজব, দখলদারি, দলীয় লেবেলিং এবং জনতার বিচার। Human Rights Support Society-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১০৭ জন নিহত এবং মব বিটিংয়ে ১৩০ জন নিহত হয়েছে বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।

রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, তখন জনতা শক্তিশালী হয় না; বরং জনতার নামে কিছু উগ্র, সংগঠিত ও সুযোগসন্ধানী শক্তি শক্তিশালী হয়। সেটিই মব কালচারের বিপদ। মব হলো নদীর স্রোত নয়, বাঁধভাঙা প্লাবন; সেখানে ন্যায়ের দাবি থাকতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের পদ্ধতি থাকে না। সেখানে অভিযোগ থাকে, কিন্তু প্রমাণের অপেক্ষা থাকে না। সেখানে রাগ থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র থাকে অনুপস্থিত। BTI-এর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ রিপোর্টে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করলেও মাজার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নারী ফুটবল ম্যাচ এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতে হামলার মতো মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে; প্রশাসন ও পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট সক্রিয় ছিল না।

হুমায়ুন আজাদের কবিতার “রাষ্ট্রযন্ত্র” যখন নষ্টদের অধিকারে যাওয়ার কথা বলে, সেটি আসলে এমন এক সময়ের কথা বলে যখন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নৈতিক মেরুদণ্ড হারায়। আদালত থাকলেও বিচার বিলম্বিত হয়, পুলিশ থাকলেও নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়, প্রশাসন থাকলেও নাগরিক আস্থা ভেঙে পড়ে, আর রাজনীতি থাকলেও গণতন্ত্র অনুপস্থিত থাকে। তখন মানুষ আইনের কাছে নয়, প্রভাবশালীর কাছে যায়; আদালতের দিকে নয়, জনতার দিকে তাকায়; সত্যের দিকে নয়, নিরাপদ পক্ষের দিকে আশ্রয় খোঁজে।

আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা গেছে—মানুষকে তার কর্ম, যুক্তি বা নাগরিক পরিচয়ে নয়; বরং রাজনৈতিক লেবেলে বিচার করা। কেউ একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শে বিশ্বাস করে, কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতিকে ধারণ করে, বা কোনো রাজনৈতিক ধারার প্রতি সহানুভূতিশীল—এই কারণে সে সামাজিকভাবে অপমানিত, কর্মক্ষেত্রে চাপে পড়া, কিংবা শারীরিক নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে—এমন বাস্তবতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গভীর অশনিসংকেত। EUAA-এর ২০২৫ সালের বাংলাদেশ Country Focus-এ আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে “widespread hostility” এবং প্রতিশোধমূলক সহিংসতার রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু এই বিশ্লেষণ কোনো একক দলীয় বিলাপ নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রশ্ন। কারণ আজ যদি এক পক্ষের মানুষ লেবেলের কারণে আক্রান্ত হয়, কাল অন্য পক্ষও একই চক্রের শিকার হবে। প্রতিহিংসার চাকা কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না; এটি ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই পিষে ফেলে।

বাংলাদেশ আজ যেন একটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আয়নাটি ভাঙা, তাই মুখও ভাঙা দেখাচ্ছে। কেউ বলছে, মুখ বদলাও; কেউ বলছে, আয়না বদলাও। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—আমরা কি নিজেদের ভেতরের ক্ষত দেখতে প্রস্তুত? আমরা কি বুঝতে প্রস্তুত যে নষ্টতা কেবল ক্ষমতাসীনদের মধ্যে নয়, বিরোধীদের মধ্যেও থাকতে পারে; কেবল রাষ্ট্রে নয়, জনতার মধ্যেও থাকতে পারে; কেবল দলে নয়, মানসিকতায়ও থাকতে পারে?

আগস্ট ২০২৪-এর পর বাংলাদেশের বড় শিক্ষা হলো—শাসক বদলালেই রাষ্ট্র মেরামত হয় না। রাষ্ট্র মেরামত হয় যখন আইন প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে ওঠে, প্রতিষ্ঠান দলীয় লেবেলের বাইরে দাঁড়ায়, নাগরিককে রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষ হিসেবে দেখা হয়, এবং জনতার আবেগকে ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে দেওয়া হয় না।

হুমায়ুন আজাদের কবিতার অন্ধকার ভবিষ্যদ্বাণী তাই আজও কেবল কবিতার পঙ্‌ক্তি নয়; এটি একটি সামাজিক সতর্কবার্তা। সবকিছু সত্যিই নষ্টদের অধিকারে যাবে কি না, তা নির্ভর করছে আমরা এখন কী করি তার উপর। আমরা যদি নীরব থাকি, তবে নষ্টরা শুধু রাজনীতি দখল করবে না—দখল করবে ভাষা, বিচার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি, প্রতিবাদ, এমনকি মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসও।

বাংলাদেশকে তাই এখন নতুন করে বলতে হবে—রাষ্ট্র কারও একার নয়, জনতাও কারও ব্যক্তিগত বাহিনী নয়, বিচার কারও প্রতিশোধের যন্ত্র নয়, আর ভিন্নমত কোনো অপরাধ নয়। রাষ্ট্র যদি সবার হয়, তবে নিরাপত্তাও সবার হতে হবে। নইলে একদিন দেখা যাবে, আমাদের নদী আছে কিন্তু স্রোত নেই, মাঠ আছে কিন্তু ফসল নেই, বিশ্ববিদ্যালয় আছে কিন্তু প্রশ্ন নেই, আদালত আছে কিন্তু ন্যায় নেই, আর দেশ আছে কিন্তু নাগরিক আস্থা নেই। সেই দিনই হবে কবিতার সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যে রূপান্তরিত হওয়ার দিন—যেদিন আমরা বুঝব, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যায়নি; আমরা নিজেরাই সবকিছু নষ্টদের হাতে তুলে দিয়েছি।

আরো পড়ুন: অশান্তির দেবতারাও বাগিয়ে নেন শান্তি পুরস্কার: অশান্তির বরপুত্রের দখলে আজ শান্তির লীলাভূমি │শান্তির পদক গলায় ঝুলিয়ে অশান্তির সাম্রাজ্য নির্মাণের রূপকথা; শিক্ষা, সংস্কৃতি, মব-রাজনীতি ও ক্ষমতার ব্যঙ্গচিত্রে উন্মোচিত হলো সেইসব ‘শান্তির পূজারি’দের মুখোশ, যাঁরা শান্তির ভাষায় অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে ইতিহাসের বুকে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চান

ইতিহাসকে কালো-সাদায় দেখার বিপদ: আত্মপ্রতারণা, মিথ্যা ন্যারেটিভ এবং স্বীকৃতি-বঞ্চনার সংস্কৃতি

একটি জাতির পরিপক্বতা বোঝা যায় সে তার ইতিহাসকে কতটা সততার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে পারে তার উপর। পরিণত সমাজ কখনো ইতিহাসকে দেবদূতের গল্প বা শয়তানের গল্পে পরিণত করে না; বরং সাফল্য ও ব্যর্থতা, অর্জন ও সীমাবদ্ধতা—দুটোকেই একই সঙ্গে দেখার সাহস রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জনপরিসরে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে—ইতিহাস, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি দীর্ঘ সময়কালকে সম্পূর্ণ ভালো অথবা সম্পূর্ণ খারাপ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা।

রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রায়ই দেখা যায়, নতুন বাস্তবতা নিজের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য অতীতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে চায়। তখন এমন একটি ন্যারেটিভ তৈরি হয় যেন পূর্ববর্তী সময়ে কোনো ইতিবাচক কাজই হয়নি, কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো অবদান রাখেনি, কোনো ব্যক্তি কোনো ভালো উদ্যোগ নেননি। এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিকভাবে অস্বাস্থ্যকর নয়; এটি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও অসৎ।

কারণ বাস্তবতা কখনো এত সরল নয়। একটি রাষ্ট্রের ইতিহাস একটি দীর্ঘ নদীর মতো। সেই নদীতে যেমন স্বচ্ছ জল থাকে, তেমনি পলি থাকে; যেমন জীবনদায়ী প্রবাহ থাকে, তেমনি ভাঙনও থাকে। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের ইতিহাসও তেমন। কোনো সময়েই সবকিছু ভালো ছিল না, আবার কোনো সময়েই সবকিছু খারাপও ছিল না। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল সেবা, স্বাস্থ্য সূচকের উন্নতি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি কিংবা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্জন—এসব বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যেমন সত্যের প্রতি অবিচার, তেমনি গণতান্ত্রিক ঘাটতি, মানবাধিকার উদ্বেগ, দুর্নীতি, বৈষম্য কিংবা রাজনৈতিক সংকটের বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করাও সমানভাবে অসৎ।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, যখন কোনো সমাজ প্রাপ্য স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠাবোধ করে। কারণ স্বীকৃতি শুধু একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য সম্মান নয়; এটি সত্যের প্রতিও সম্মান। যে শিক্ষক ভালো পড়িয়েছেন, তাকে রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়, তার অবদানের জন্য সম্মান জানানো উচিত। যে কর্মকর্তা সততার সঙ্গে কাজ করেছেন, তাকে সময়ের পরিবর্তনের কারণে অস্বীকার করা উচিত নয়। যে প্রতিষ্ঠান ইতিবাচক অবদান রেখেছে, তার সাফল্যকে স্বীকার করা ইতিহাসের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ব।

একটি ফলবান গাছের কথা ভাবুন। যদি কোনো কারণে আমরা গাছটির মালিককে অপছন্দ করি, তাই বলে কি আমরা গাছের ফলকেও অস্বীকার করব? আবার ফল ভালো বলেই কি গাছের শুকিয়ে যাওয়া ডালপালা দেখতে অস্বীকার করব? পরিণত সমাজের কাজ হলো—ফলকে ফল বলা, রোগকে রোগ বলা। সেখানে প্রশংসা এবং সমালোচনা দুটিই সত্যের ভিত্তিতে দাঁড়ায়, আনুগত্য বা বিদ্বেষের ভিত্তিতে নয়।

যখন একটি সমাজ ঢালাওভাবে ঘোষণা করে—“সবকিছুই খারাপ ছিল”, তখন সে আসলে নিজের স্মৃতিকেই অবিশ্বাস করতে শুরু করে। এটি অনেকটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের অর্ধেক অংশ ঢেকে রেখে পুরো মুখের বর্ণনা দেওয়ার মতো। আংশিক সত্য শেষ পর্যন্ত মিথ্যারই আরেক রূপ হয়ে ওঠে।

তাই বাংলাদেশের এই সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি সৎ জাতীয় আত্মসমালোচনা। আমাদের বলতে হবে—যা ভালো ছিল, তা ভালো ছিল; যা ভুল ছিল, তা ভুল ছিল। কোনো অর্জনকে কেবল রাজনৈতিক কারণে অস্বীকার করা যেমন অনৈতিক, তেমনি কোনো ব্যর্থতাকে আনুগত্যের কারণে আড়াল করাও অনৈতিক। কারণ সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু কখনো কখনো সরাসরি মিথ্যা নয়; বরং নির্বাচিত সত্য।

একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন সে তার ইতিহাসকে প্রতিশোধের চোখে নয়, শিক্ষার চোখে দেখে। অতীতকে সম্পূর্ণ অন্ধকার বা সম্পূর্ণ আলোর গল্পে পরিণত করলে ভবিষ্যৎও বিভ্রান্তির উপর দাঁড়ায়। কিন্তু অতীতের অর্জন ও ব্যর্থতা—উভয়কেই স্বীকার করার নৈতিক সাহস থাকলে তবেই একটি জাতি আত্মপ্রতারণার পথ থেকে বেরিয়ে এসে আত্মসংশোধনের পথে হাঁটতে পারে। কারণ ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার ছাড়া ভবিষ্যতের প্রতি ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।

মানুষ কি শুধু তার রাজনৈতিক পরিচয়? লেবেলিং, ঘৃণা এবং গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংকট

একটি সমাজের নৈতিক পরিপক্বতা বোঝা যায় সে তার ভিন্নমতের মানুষদের কীভাবে বিবেচনা করে তার মাধ্যমে। যদি কোনো মানুষকে তার চরিত্র, কাজ, সততা, মানবিকতা বা অবদানের পরিবর্তে কেবল তার রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করা হয়, তাহলে সেই সমাজ ধীরে ধীরে যুক্তিনির্ভর নাগরিক সমাজ থেকে পরিচয়নির্ভর সংঘাতের সমাজে পরিণত হতে শুরু করে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়েছে—মানুষকে ব্যক্তি হিসেবে না দেখে একটি রাজনৈতিক লেবেলের মাধ্যমে চিহ্নিত করা। কেউ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন, কোনো রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রতি সহানুভূতিশীল, কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক মত প্রকাশ করেছেন—এমন কারণেই তাকে কখনো কখনো “ফ্যাসিস্ট”, “দালাল”, “শত্রু” বা অন্য কোনো অবমাননাকর পরিচয়ে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ফলে আলোচনা ও যুক্তির জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, আর মানুষের পরিচয় তার চিন্তা, কাজ ও অবদানের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক ট্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কোনো রাজনৈতিক দলই ফেরেশতাদের সংগঠন নয়, আবার কোনো রাজনৈতিক দলই সম্পূর্ণ শয়তানদের সমাবেশও নয়। একটি রাজনৈতিক দল মূলত সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। সেখানে ভালো মানুষ যেমন থাকে, তেমনি ভুলকারী মানুষও থাকে; সেখানে আদর্শবাদী কর্মী যেমন থাকেন, তেমনি সুযোগসন্ধানী লোকও থাকতে পারেন। এটি কেবল একটি দলের ক্ষেত্রে নয়, প্রায় সব রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্রেই সত্য।

একটি বড় বটগাছের কথা ভাবুন। সেই গাছে হয়তো কিছু শুকনো ডাল আছে, কিছু রোগাক্রান্ত পাতা আছে; কিন্তু সেই কারণেই কি পুরো গাছটিকে মৃত ঘোষণা করা যায়? আবার কিছু সবুজ পাতার কারণে কি গাছের রোগ অস্বীকার করা যায়? পরিণত বিচারবোধের কাজ হলো—যা ভালো, তাকে ভালো বলা; যা খারাপ, তাকে খারাপ বলা। কিন্তু আমাদের সময়ের একটি বড় সংকট হলো, আমরা প্রায়ই মানুষকে তার কাজ দিয়ে নয়, তার রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করতে শুরু করেছি।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, একজন মানুষ একটি রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করতে পারেন, কিন্তু সেই কারণে তার নাগরিক মর্যাদা হারিয়ে ফেলেন না। কেউ একটি দলের সমর্থক হলেই তিনি অপরাধী হয়ে যান না; আবার কেউ অন্য একটি দলের সমর্থক হলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নৈতিকতার প্রতীক হয়ে ওঠেন না। নৈতিকতা ও অনৈতিকতা, সততা ও অসততা, মানবিকতা ও অমানবিকতা—এসব গুণ রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ দেখে জন্মায় না; এগুলো মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণে প্রকাশ পায়।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা ব্যক্তি ও মতাদর্শের পার্থক্য ভুলে যাই। কোনো মতাদর্শের সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার; কিন্তু সেই মতাদর্শে বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষকে একই রঙে রাঙিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের কোটি সমর্থকের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা, চিন্তা, প্রেরণা এবং অবস্থান এক নয়। তাদের সবাইকে একক কোনো নৈতিক রায়ের মধ্যে আবদ্ধ করা মূলত বাস্তবতাকে অস্বীকার করা।

আরও বিপজ্জনক বিষয় হলো, যখন “ফ্যাসিস্ট” বা অনুরূপ গুরুতর শব্দগুলো রাজনৈতিক বিতর্কের সাধারণ গালিতে পরিণত হয়। তখন প্রকৃত ফ্যাসিবাদ, প্রকৃত নিপীড়ন এবং প্রকৃত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারণাগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ একটি গুরুতর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ধারণাকে যদি আমরা ভিন্নমতের মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিদিনের অপবাদ হিসেবে ব্যবহার করি, তাহলে শব্দটির প্রকৃত অর্থই একসময় হারিয়ে যায়।

বাংলাদেশের মতো একটি বহুত্ববাদী সমাজে তাই আমাদের নতুন করে শেখা দরকার—মানুষকে রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষ হিসেবে দেখা। একজন নাগরিকের রাজনৈতিক মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়, তার যুক্তির সমালোচনা করা যায়, তার দলের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করা যায়; কিন্তু তার মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা যায় না।

কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের শক্তি বিরোধী মতকে নিশ্চিহ্ন করার ক্ষমতায় নয়; বরং বিরোধী মতের নিরাপদ অস্তিত্ব নিশ্চিত করার সক্ষমতায় নিহিত। আর একটি পরিণত জাতির লক্ষণ হলো—সে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং ভিন্নমতের সহনাগরিক হিসেবে দেখতে শেখে।

ভালো ও মন্দ, সাফল্য ও ব্যর্থতা, আদর্শ ও সীমাবদ্ধতা—এসব মিলিয়েই মানুষ; আর মানুষদের সমন্বয়েই রাজনৈতিক দল। তাই কোনো দলকে সম্পূর্ণ ফেরেশতা কিংবা সম্পূর্ণ দানব হিসেবে দেখার প্রবণতা বাস্তবতার নয়, বরং মেরুকরণের ভাষা। একটি সভ্য সমাজের কাজ হলো সেই মেরুকরণকে অতিক্রম করে সত্য, ন্যায় এবং মানবিকতার ভিত্তিতে মানুষকে মূল্যায়ন করা।

অবৈধ অস্ত্রের ছায়ায় রাষ্ট্র: যখন নষ্টতার হাতে বন্দী হয় জননিরাপত্তা

হুমায়ুন আজাদ যখন লিখেছিলেন, “সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে”, তখন তিনি সম্ভবত কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার দখলদারিত্বের কথা বলেননি; তিনি এমন এক সামাজিক বাস্তবতার কথাও বলেছেন, যেখানে আইনের পরিবর্তে ভয়, ন্যায়বিচারের পরিবর্তে শক্তি, এবং নাগরিক নিরাপত্তার পরিবর্তে সন্ত্রাসের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য যাচাই করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর একটি হলো নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ। মানুষ যদি দিনের আলোয় চলাফেরা করতে ভয় পায়, বাজারে যেতে আতঙ্ক বোধ করে, কিংবা নিজের ঘরেও নিরাপদ অনুভব না করে, তবে বুঝতে হবে রাষ্ট্রের কোথাও গভীর অসুখ বাসা বেঁধেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্য গুলিবর্ষণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং সন্ত্রাসী তৎপরতার ঘটনাগুলো সেই অসুখেরই লক্ষণ বহন করছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের অংশ হিসেবে সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, মাদকের সহজলভ্যতা, সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অভিঘাত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থার দুর্বলতা মিলেই এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে অস্ত্রের মালিক হওয়ার অধিকার সীমিত হতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তার অধিকার সীমাহীন। অথচ যখন অবৈধ অস্ত্র সাধারণ মানুষের চেয়ে অপরাধীদের হাতে বেশি শক্তি দেয়, তখন রাষ্ট্রের মৌলিক সামাজিক চুক্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। নাগরিক তখন পুলিশের চেয়ে সন্ত্রাসীর ক্ষমতাকে বেশি বাস্তব মনে করতে শুরু করে। এর ফলে শুধু অপরাধ বাড়ে না; রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষয় হতে থাকে। মানুষ আইনকে নয়, শক্তিশালী গোষ্ঠীকে ভয় করতে শেখে। এটি গণতন্ত্রের জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও অশনিসংকেত।

এই বাস্তবতাকে কেবল অপরাধের পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি। আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ এবং স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের লড়াই—এসবই অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা তৈরি করে। যখন সমাজে নৈতিক কর্তৃত্ব দুর্বল হয় এবং আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন অস্ত্রই হয়ে ওঠে বিরোধ নিষ্পত্তির ভাষা। যুক্তি ও সংলাপের জায়গা দখল করে ভয় এবং সহিংসতা।

আরো পড়ুন : বিশ্বাসের সেতু না অবিশ্বাসের দেয়াল? মব কালচার, মতাদর্শের সংঘাত ও বহুত্ববাদী বাংলাদেশের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ|বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে বিভ্রান্ত মানুষ: বহুত্ববাদী সমাজ নির্মাণের পথে হঠাৎ ঝড়ে থমকে যাওয়ার অন্তর্গত গল্প

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অনেক সময় নির্বাচন কেবল ভোটের প্রতিযোগিতা নয়; এটি স্থানীয় ক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায়ও পরিণত হয়। যদি অবৈধ অস্ত্রধারী গোষ্ঠীগুলোকে এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে নির্বাচনী সময়ে সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তখন গণতন্ত্রের উৎসব পরিণত হতে পারে ভয়ের মিছিলে।

হুমায়ুন আজাদের ভাষায় “নষ্টতা”র সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ হলো তখন, যখন সমাজ অন্যায়কে ব্যতিক্রম হিসেবে নয়, স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করে। প্রতিদিন খুনের খবর শুনেও যদি আমরা বিস্মিত না হই, প্রকাশ্যে গুলি চালানোকে যদি নিয়মিত সংবাদ হিসেবে গ্রহণ করি, কিংবা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের উপস্থিতিকে যদি জীবনের অংশ বলে মেনে নিই—তবে বুঝতে হবে নষ্টতা কেবল অপরাধীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আমাদের সামাজিক সংবেদনশীলতাকেও গ্রাস করতে শুরু করেছে।

রাষ্ট্রের সামনে তাই আজ বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অস্ত্র উদ্ধার নয়; নাগরিক আস্থা পুনর্গঠনও। আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, যুবসমাজের জন্য ইতিবাচক সুযোগ সৃষ্টি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সম্প্রীতি পুনর্গঠন—এসব ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অবৈধ অস্ত্র কেবল একটি ধাতব বস্তু নয়; এটি রাষ্ট্রের দুর্বলতা, সামাজিক বিভাজন এবং নৈতিক সংকটের দৃশ্যমান প্রতীক।

বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্নটি কেবল নিরাপত্তার নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্রের প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ব যেখানে নাগরিকের নিরাপত্তা আইন নিশ্চিত করবে, নাকি এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোব যেখানে ভয়, অস্ত্র এবং সন্ত্রাস ধীরে ধীরে জনজীবনের নিয়মে পরিণত হবে? যদি দ্বিতীয় পথটিই শক্তিশালী হতে থাকে, তবে একদিন হয়তো আমরা উপলব্ধি করব—নষ্টরা শুধু রাজনীতি নয়, জননিরাপত্তাকেও নিজেদের অধিকারে নিয়ে নিয়েছে।

নষ্ট মানসিকতায় রাষ্ট্রের নৈতিক স্বাস্থ্য: যখন প্রতিষ্ঠান বেঁচে থাকে, কিন্তু আস্থা মারা যায়

একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সেনাবাহিনী, পুলিশ, আদালত বা প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার নৈতিক স্বাস্থ্যের মধ্যে। নাগরিকরা যখন বিশ্বাস করেন যে আইন সবার জন্য সমান, বিচার নিরপেক্ষ, প্রতিষ্ঠানগুলো দল বা গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে, এবং রাষ্ট্র তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে—তখনই একটি রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে সুস্থ বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু যখন এই বিশ্বাস ক্ষয় হতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের দৃশ্যমান কাঠামো অক্ষত থাকলেও তার নৈতিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে শুরু হয় আস্থার অবক্ষয়।

হুমায়ুন আজাদের “নষ্টদের” ধারণাটি এই নৈতিক অবক্ষয়কে বোঝার একটি শক্তিশালী রূপক। এখানে “নষ্ট” কোনো ব্যক্তি, দল বা মতাদর্শের নাম নয়; এটি এমন একটি মানসিকতা, যা ক্ষমতাকে দায়িত্ব নয়, আধিপত্য হিসেবে দেখে; আইনকে ন্যায়বিচারের পথ নয়, প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার অস্ত্র মনে করে; এবং নাগরিককে অধিকারসম্পন্ন মানুষ নয়, বরং ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। এই মানসিকতা যখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে প্রবেশ করে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নৈতিক চরিত্র হারাতে শুরু করে।

রাষ্ট্রের নৈতিক অসুস্থতার প্রথম লক্ষণ হলো দ্বৈত মানদণ্ডের বিস্তার। একই কাজ একজনের ক্ষেত্রে অপরাধ, অন্যজনের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। একই বক্তব্য একজনের ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যজনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে বিবেচিত হয়। একই আইনের ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োগ নাগরিকদের মনে এই ধারণা জন্ম দেয় যে বিচার ও অধিকার আর নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং ক্ষমতার অবস্থান দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। তখন মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারায় এবং ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রভাবশালী আশ্রয়ের সন্ধান করে।

রাষ্ট্রের নৈতিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আরেকটি লক্ষণ হলো ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে মতের ভিন্নতা শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু নষ্ট মানসিকতা ভিন্নমতকে প্রতিদ্বন্দ্বী মত হিসেবে নয়, বরং শত্রু হিসেবে দেখতে শেখায়। ফলে সংলাপের জায়গা দখল করে অপবাদ, যুক্তির জায়গা দখল করে লেবেলিং, এবং সহাবস্থানের জায়গা দখল করে ঘৃণার রাজনীতি। তখন নাগরিকরা নিজের মত প্রকাশের আগে নিরাপত্তার হিসাব করতে শুরু করে। ভয়ের এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রের দৃশ্যমান কাঠামোকে হয়তো সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করে না, কিন্তু তার আত্মাকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়।

আরও গভীর সংকট তৈরি হয় যখন জনতার আবেগকে আইনের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইতিহাস বলে, জনতার ক্ষোভ কখনো কখনো ন্যায্য হতে পারে; কিন্তু ন্যায়বিচার কখনো জনতার ক্ষোভের উপর দাঁড়াতে পারে না। রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি এখানেই যে, সে প্রতিশোধ নয়, প্রক্রিয়ার উপর বিশ্বাস করে; আবেগ নয়, প্রমাণের উপর নির্ভর করে। কিন্তু যখন মব সংস্কৃতি, সামাজিক অপমান, অনলাইন নিপীড়ন কিংবা দলীয় প্রতিহিংসা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন বোঝা যায় রাষ্ট্র তার নৈতিক কর্তৃত্বের একটি অংশ হারাতে শুরু করেছে।

একটি অসুস্থ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, সেখানে মানুষ ধীরে ধীরে সত্যের পরিবর্তে নিরাপদ অবস্থান বেছে নিতে শেখে। তারা কী সত্য, তা নয়; বরং কোন কথা বললে কম ঝুঁকি থাকবে, সেটি বিবেচনা করে। ফলে সমাজে আত্মপ্রতারণার সংস্কৃতি জন্ম নেয়। মানুষ মুখে যা বলে, মনে তা বিশ্বাস করে না; আর যা বিশ্বাস করে, তা প্রকাশ করতে সাহস পায় না। এই পরিস্থিতি কোনো রাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক সংকটের চেয়েও বিপজ্জনক, কারণ এটি জাতির নৈতিক মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দেয়।

রাষ্ট্রের নৈতিক স্বাস্থ্য পুনর্গঠনের জন্য তাই শুধু আইন প্রণয়ন বা প্রশাসনিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা, ভিন্নমতের নিরাপত্তা, ইতিহাসের প্রতি সততা এবং নাগরিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা। রাষ্ট্রকে এমন একটি নৈতিক অবস্থানে ফিরে যেতে হবে, যেখানে মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে নাগরিক হিসেবে মূল্যায়িত হবে, এবং ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়বিচার বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে নষ্টদের অধিকারে চলে যায়, যখন তার আদালত, প্রশাসন বা সংসদ দখল হয় না; বরং যখন নাগরিকরা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের সবার জন্য সমানভাবে কাজ করবে। রাষ্ট্রের নৈতিক স্বাস্থ্য তাই কেবল একটি দার্শনিক প্রশ্ন নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব এবং সামাজিক আস্থার অস্তিত্বের প্রশ্ন।

আইনের শাসনের সংকটে নষ্টদের দাপট: যখন আইন দুর্বল হয়, শক্তিশালী হয় ভয়

একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্রভাণ্ডার নয়, তার আইনের শাসন। কারণ আইনই সেই অদৃশ্য সামাজিক চুক্তি, যা নাগরিককে নিরাপত্তা দেয়, ক্ষমতাবানকে সীমার মধ্যে রাখে এবং দুর্বল মানুষকেও ন্যায়বিচারের আশা করার সাহস দেয়। কিন্তু যখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সেই শূন্যস্থান কখনো খালি থাকে না। সেখানে দ্রুত স্থান দখল করে নেয় প্রভাব, ভয়, গোষ্ঠীশক্তি, মব সংস্কৃতি এবং সুযোগসন্ধানী শক্তি। হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, তখনই “নষ্টরা” আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

নষ্টতার সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র হলো দুর্বল আইনব্যবস্থা। কারণ নষ্ট মানসিকতা জানে—যেখানে অপরাধের নিশ্চিত বিচার নেই, সেখানে অপরাধের ঝুঁকিও কম। ফলে আইন যদি ধীর হয়, বিচার যদি বিলম্বিত হয়, তদন্ত যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব যদি বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, তবে নষ্টরা এটিকে দুর্বলতা হিসেবে নয়, সুযোগ হিসেবে দেখে। তখন রাষ্ট্রের নীরবতা তাদের কাছে এক ধরনের অনুমতিপত্রে পরিণত হয়।

আইনের শাসনের সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর অসম প্রয়োগ। যখন মানুষ দেখতে পায় যে একই অপরাধের জন্য একজন শাস্তি পাচ্ছে, আরেকজন পার পেয়ে যাচ্ছে; একজনের বিরুদ্ধে আইন দ্রুত সক্রিয় হচ্ছে, আরেকজনের ক্ষেত্রে নীরব থাকছে—তখন আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ক্ষয় হতে শুরু করে। নাগরিকদের মনে প্রশ্ন জাগে: আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি এটি কেবল ক্ষমতার অবস্থান অনুযায়ী প্রয়োগ করা হয়? এই প্রশ্নই রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে।

হুমায়ুন আজাদের “নষ্টরা” কেবল অপরাধী নয়; তারা সেই সব ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও মানসিকতার প্রতীক, যারা বিশ্বাস করে যে ক্ষমতা থাকলে আইনকে পাশ কাটানো যায়, প্রভাব থাকলে জবাবদিহি এড়ানো যায়, আর ভয় সৃষ্টি করতে পারলে সত্যকে নীরব করা যায়। আইনের শাসন দুর্বল হলে এই মানসিকতা সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তখন সন্ত্রাসী অস্ত্র হাতে সাহসী হয়, দুর্নীতিবাজ আরও বেপরোয়া হয়, মব আরও আক্রমণাত্মক হয়, আর সাধারণ মানুষ আরও ভীত হয়ে পড়ে।

একটি সুস্থ রাষ্ট্রে নাগরিকের প্রথম আশ্রয় হওয়ার কথা আদালত, আইন ও প্রশাসন। কিন্তু যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে বিচার পাওয়ার জন্য আইনের চেয়ে প্রভাব বেশি কার্যকর, তখন সমাজে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা কাঠামো তৈরি হয়। কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ের আশ্রয় খোঁজে, কেউ অর্থনৈতিক শক্তির, কেউ গোষ্ঠীগত ক্ষমতার। ফলাফল হলো—রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্রগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এটি আইনের শাসনের সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক রূপ।

মব সংস্কৃতির উত্থানও এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। যখন মানুষ বিশ্বাস হারায় যে আইন দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করবে, তখন কেউ কেউ জনতার বিচারের পক্ষে অবস্থান নিতে শুরু করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মব কখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে না; মব কেবল বিচার প্রক্রিয়াকে প্রতিস্থাপন করে। সেখানে অভিযোগ থাকে, কিন্তু প্রমাণ থাকে না; আবেগ থাকে, কিন্তু ন্যায়বোধ থাকে না; শাস্তি থাকে, কিন্তু বিচার থাকে না। এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের বৈধতাকেই দুর্বল করে দেয়।

আইনের শাসনের সংকট শুধু অপরাধ বৃদ্ধির কারণ নয়; এটি গণতন্ত্রের ভিত্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ গণতন্ত্র কেবল ভোটের অধিকার নয়, সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারও। যদি একজন নাগরিক রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, ধর্ম, অর্থনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক প্রভাবের কারণে ভিন্ন ধরনের আইনি আচরণের শিকার হন, তবে গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন নির্বাচন থাকতে পারে, প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে, সংবিধানও থাকতে পারে; কিন্তু আইনের শাসনের আত্মা অনুপস্থিত থাকে।

বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয়ের জন্যই তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আইনকে ব্যক্তি, দল ও গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠা করা। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধকে গুরুত্ব দেওয়া; রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, প্রমাণকে গুরুত্ব দেওয়া; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ আইন যখন নিরপেক্ষভাবে কাজ করে, তখন নষ্টরা ভয় পায়; আর আইন যখন দুর্বল হয়, তখন নষ্টরা সাহসী হয়ে ওঠে।

হুমায়ুন আজাদের সতর্কবার্তার গভীর তাৎপর্য এখানেই। “সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে” কেবল তখনই সত্য হয়ে ওঠে না যখন নষ্টরা ক্ষমতায় আসে; বরং তখনই সত্য হয়ে ওঠে, যখন আইন দুর্বল হয়ে যায় এবং সমাজ নষ্টতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নৈতিক সাহস হারিয়ে ফেলে। তাই আইনের শাসন রক্ষা করা কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতির সভ্যতা, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই।

আমরা কি গণতন্ত্রকে ভালোবাসি, নাকি নিজের মতের বিজয়কে?

বাংলাদেশের জনপরিসরে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো “গণতন্ত্র”। রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজ, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী—প্রায় সবাই গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেন। কিন্তু একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আমাদের সামনে বারবার ফিরে আসে: আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্রকে ভালোবাসি, নাকি আমরা এমন একটি ব্যবস্থাকে ভালোবাসি যেখানে শেষ পর্যন্ত আমার মতই জয়ী হবে?

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নির্বাচন নয়; গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতা। আমি যে মতের সঙ্গে একমত নই, সেই মতের মানুষেরও সমান অধিকার আছে—এই বিশ্বাসই গণতন্ত্রের প্রাণ। কিন্তু আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক আচরণে প্রায়ই দেখা যায়, আমরা গণতন্ত্রকে সমর্থন করি যতক্ষণ পর্যন্ত ফলাফল আমাদের পক্ষে যায়। ফলাফল বা মতামত ভিন্ন হলে আমরা অনেক সময় প্রতিপক্ষের বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করি।

এটি অনেকটা ফুটবল খেলার মতো। আমরা বলি আমরা খেলার নিয়ম মানি, কিন্তু খেলা শেষে যদি আমাদের দল হেরে যায়, তখন আমরা মাঠ, রেফারি, দর্শক—সবকিছুকেই দোষ দিতে শুরু করি। ফলে আমরা খেলার চেয়ে জয়কে বেশি ভালোবাসি। গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও অনেক সময় একই প্রবণতা দেখা যায়। আমরা গণতন্ত্র চাই, কিন্তু এমন গণতন্ত্র চাই যেখানে শেষ কথা আমারই হবে। অথচ গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো—শেষ কথা সবসময় আমার নাও হতে পারে, তবু আমি নিয়ম ও প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকব।

আবার আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে তাকালেও আমরা একই ধরনের বৈপরীত্য দেখতে পাই। যে দেশগুলো বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের কথা বলে, তাদের ইতিহাসও সবসময় সেই আদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে যেখানে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, সামরিক হস্তক্ষেপ, সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা, অভ্যুত্থান-সমর্থন কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই তাদের ঘোষিত আদর্শ এবং বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে দ্বৈততার মধ্যে বসবাস করে।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। কোনো রাষ্ট্র, সমাজ বা রাজনৈতিক শক্তি আদর্শের পরীক্ষায় পুরোপুরি উত্তীর্ণ না হওয়ার অর্থ এই নয় যে আদর্শটিই ভুল। বরং এর অর্থ হলো মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই নিজেদের ঘোষিত মূল্যবোধের প্রতি সম্পূর্ণ সৎ থাকতে ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশের জন্য তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে—অন্যরা কী করেছে, তা নয়; আমরা নিজেরা কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে চাই। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ব যেখানে বিরোধী মতের মানুষও নিরাপদ থাকবে? আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে আইন ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে থাকবে? আমরা কি এমন একটি নাগরিক সংস্কৃতি গড়তে পারব যেখানে ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়?

গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়; এটি একটি মানসিকতা। এই মানসিকতা বলে—আমি ভুলও হতে পারি, অন্যের কাছেও সত্যের একটি অংশ থাকতে পারে, এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সত্যের একচেটিয়া মালিক নয়।

যেদিন আমরা “আমার কথাই শেষ কথা” মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে “চলুন আমরা একসঙ্গে সত্য খুঁজি” মানসিকতার দিকে এগোতে পারব, সেদিনই গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক স্লোগান থাকবে না; এটি আমাদের সামাজিক চরিত্রে পরিণত হবে।

কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু সবসময় স্বৈরতন্ত্র নয়; অনেক সময় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো আমাদের নিজেদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই ছোট্ট স্বৈরাচারী মন, যে মনে করে—আমি যা বলি, সেটাই শেষ সত্য।

আশা থেকে হতাশা: বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার ইতিহাস

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি পুনরাবৃত্ত থিম হলো আশার উত্থান এবং আশাভঙ্গের বেদনা। প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় মানুষ বিশ্বাস করেছে—এবার হয়তো একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে, এবার হয়তো রাষ্ট্র আরও ন্যায়ভিত্তিক হবে, এবার হয়তো দুর্নীতি কমবে, প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে, এবং সাধারণ মানুষের জীবন আরও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হবে। কিন্তু ইতিহাসের অনেক বাঁকে সেই আশা পূর্ণতা পায়নি; বরং নতুন প্রত্যাশার সঙ্গে নতুন হতাশাও জন্ম নিয়েছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অনেক নাগরিকের মধ্যে একই ধরনের আশাবাদ দেখা গিয়েছিল। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত, নোবেল বিজয়ী এবং বিশ্বপরিসরে সম্মানিত একজন ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় অনেকে মনে করেছিলেন, বাংলাদেশ হয়তো দ্রুত রাজনৈতিক উত্তেজনা কাটিয়ে স্থিতিশীলতার পথে এগোবে। মানুষের প্রত্যাশা ছিল—নৈতিক নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, সামাজিক সম্প্রীতি এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি নতুন যাত্রা শুরু হবে।

কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি সবসময় একই বিষয় নয়। একজন ব্যক্তি বিশ্বমঞ্চে যতই সম্মানিত হোন না কেন, একটি জটিল রাষ্ট্রের বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন অংশে প্রশ্ন, সমালোচনা এবং হতাশার অনুভূতি তৈরি হতে পারে—এটি গণতান্ত্রিক সমাজের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।

বিশেষত যখন মানুষ আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা কিংবা জনসেবার ক্ষেত্রে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন প্রত্যাশা করে, তখন প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান যত বড় হয়, হতাশাও তত গভীর হয়। কারণ মানুষ কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তন চায় না; তারা জীবনের বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: কোনো জাতির ভবিষ্যৎ কেবল একজন ব্যক্তি, একটি দল বা একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে না। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক শাসন, আইনের শাসন, সামাজিক আস্থা এবং নাগরিক অংশগ্রহণের উপর। ব্যক্তিনির্ভর আশা যত দ্রুত জন্ম নেয়, তত দ্রুত ভেঙেও যেতে পারে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে। বাংলাদেশের জনগণ তাই আজ হয়তো আবার সেই পুরোনো প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—আমরা কি কোনো ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় থাকব, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ব যেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই হবে জনগণের সবচেয়ে বড় ভরসা?

সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যেতে দিতে না চাইলে করণীয়

হুমায়ুন আজাদের সতর্কবার্তাকে সত্য হতে না দিতে হলে প্রথম কাজ হলো—নষ্টতাকে কেবল অন্যের মধ্যে নয়, নিজের মধ্যেও খুঁজে দেখা। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু সবসময় কোনো স্বৈরশাসক নয়; অনেক সময় তা আমাদের নিজেদের অসহিষ্ণুতা, অন্ধ আনুগত্য এবং ঘৃণার সংস্কৃতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

নষ্টতার বিরুদ্ধে নীরবতা নয়, নাগরিক জাগরণ

কোনো সমাজে নষ্টতা, অন্যায়, দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার একদিনে জন্ম নেয় না। এগুলো ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয় তখনই, যখন সমাজের সৎ, সচেতন ও মানবিক মানুষগুলো নীরব হয়ে যায়। ইতিহাস আমাদের শেখায়, অন্যায়ের সবচেয়ে বড় সহযোগী সবসময় অন্যায়কারী নয়; অনেক সময় সেই নীরব দর্শক, যে অন্যায় দেখে কিন্তু প্রতিবাদ করে না, সত্য জানে কিন্তু উচ্চারণ করে না, এবং সংকট বুঝেও দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। তাই নষ্টতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো নাগরিক জাগরণ—একটি সচেতন, দায়িত্বশীল ও নৈতিক নাগরিক সমাজের উত্থান।

নাগরিক জাগরণ বলতে কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন বা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করাকেই বোঝায় না। এটি মূলত একটি মানসিক ও নৈতিক অবস্থান। একজন নাগরিক যখন গুজবের পরিবর্তে তথ্য খোঁজেন, ঘৃণার পরিবর্তে সংলাপকে গুরুত্ব দেন, দলীয় পরিচয়ের আগে মানবিকতাকে মূল্য দেন এবং আইনের শাসনের পক্ষে অবস্থান নেন—তখনই তিনি নাগরিক জাগরণের অংশ হয়ে ওঠেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি সরকারে নয়; বরং সেই নাগরিকদের মধ্যে, যারা অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেন না।

নষ্টতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে সমাজের স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হতে চায়। যখন মানুষ মব-হিংসাকে ন্যায়বিচার মনে করতে শুরু করে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করে, কিংবা ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকে গুরুত্বহীন মনে করে, তখন নষ্টতা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; এটি সামাজিক চরিত্রের অংশ হয়ে যায়। তাই নাগরিক জাগরণ মানে হলো সেই স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে আইন, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সহাবস্থান কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো সভ্য সমাজের মৌলিক ভিত্তি।

বাংলাদেশের মতো একটি বহুত্ববাদী সমাজে নাগরিক জাগরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভিন্নমতের প্রতি সম্মান। গণতন্ত্রের শক্তি একমত মানুষের সংখ্যায় নয়; বরং ভিন্নমতের মানুষের নিরাপদ অস্তিত্বে। যখন একজন নাগরিক নিজের মতের বিরোধী মানুষেরও মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করেন, তখনই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু যখন আমরা কেবল নিজের পক্ষের স্বাধীনতাকে সমর্থন করি, তখন গণতন্ত্র নয়, পক্ষপাতই শক্তিশালী হয়।

নাগরিক জাগরণ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি সমাজে যত বেশি মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, তথ্য যাচাই করতে শেখে, ইতিহাসকে সমালোচনামূলকভাবে পড়তে শেখে এবং যুক্তিকে আবেগের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, সেই সমাজে নষ্টতার বিস্তার তত কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ অজ্ঞতা, গুজব ও অন্ধ আনুগত্য নষ্টতার খাদ্য; আর সচেতনতা, যুক্তিবোধ ও মানবিকতা তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।

সুতরাং, “নষ্টতার বিরুদ্ধে নীরবতা নয়, নাগরিক জাগরণ” কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি একটি সামাজিক আহ্বান। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রকে সৎ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাখার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, প্রতিটি নাগরিকের। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় ক্ষমতাবানদের দ্বারা নয়; বরং সেই সাধারণ মানুষের দ্বারা, যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস রাখে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে এবং মানবিকতার পক্ষে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে।

  • ১. প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে: রাষ্ট্র টিকে থাকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দিয়ে, ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্ব দিয়ে নয়। আদালত, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক আনুগত্যের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
  • ২. রাজনৈতিক লেবেলিং বন্ধ করতে হবে: মানুষকে আগে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে। কেউ ভিন্ন রাজনৈতিক মত পোষণ করলেই সে শত্রু হয়ে যায় না। মতাদর্শের সমালোচনা করা যায়, কিন্তু মানুষের মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা যায় না।
  • ৩. মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা: ন্যায়বিচারের একমাত্র বৈধ পথ হলো আইন। জনতার আবেগ কখনো আদালতের বিকল্প হতে পারে না। যে সমাজ মবকে প্রশ্রয় দেয়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজেই মবের শিকার হয়।
  • ৪. ইতিহাসকে সততার সঙ্গে দেখতে হবে: যা ভালো ছিল তা স্বীকার করতে হবে, যা ভুল ছিল তা সমালোচনা করতে হবে। ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার বানালে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সত্যের পরিবর্তে বিভ্রান্তি উত্তরাধিকার হিসেবে পায়।
  • ৫. শিক্ষা ব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে: মুক্তবুদ্ধি, বিতর্ক, গবেষণা ও যুক্তিবাদী সংস্কৃতি ছাড়া কোনো সমাজ দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক থাকতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মতের বৈচিত্র্যের নিরাপদ স্থান হতে হবে।
  • ৬. ভিন্নমতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে: একটি সমাজ কতটা সভ্য তা বোঝা যায় সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তা দিয়ে। গণতন্ত্রের শক্তি বিরোধী মতকে নিশ্চিহ্ন করার ক্ষমতায় নয়; বরং তার নিরাপদ অস্তিত্ব নিশ্চিত করার সক্ষমতায়।
  • ৭. নাগরিকদের নৈতিক চুক্তি পুনর্গঠন করতে হবে: রাষ্ট্র কেবল সরকারের নয়, নাগরিকদেরও। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, কৃষক, শ্রমিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব হলো সত্য, ন্যায়, মানবিকতা এবং সহাবস্থানের পক্ষে দাঁড়ানো। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো দেশ নষ্টদের কারণে ধ্বংস হয় না; ধ্বংস হয় যখন ভালো মানুষরা নীরব হয়ে যায়।

শেষ কথা: এখনও সবকিছু নষ্টদের হাতে যায়নি

হুমায়ুন আজাদের কবিতার সেই বিখ্যাত সতর্কবাণী আমাদের বারবার শঙ্কিত করে—“সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।” কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা আরেকটি সত্যও দেখতে পাই: কোনো সমাজ, কোনো জাতি, কোনো সভ্যতা কখনো কেবল অন্ধকারের মধ্যেই স্থায়ীভাবে বন্দী থাকেনি। মানুষের ভেতরে যেমন ধ্বংসের প্রবণতা আছে, তেমনি আছে পুনর্গঠনের শক্তিও; যেমন আছে বিভাজনের রাজনীতি, তেমনি আছে মিলনের আকাঙ্ক্ষা; যেমন আছে ঘৃণার ভাষা, তেমনি আছে সহমর্মিতার সংস্কৃতি।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। সামাজিক আস্থার ক্ষয়, মব সংস্কৃতির উত্থান, মতাদর্শগত অসহিষ্ণুতা, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা এবং পারস্পরিক সন্দেহের বিস্তার আমাদের সতর্ক করে দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে এই দেশেই আমরা অসংখ্য মানুষকে দেখি, যারা এখনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, ভিন্নমতের মানুষের পাশে দাঁড়ান, আইনের শাসনের পক্ষে অবস্থান নেন এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে আপস করেন না। সেই মানুষগুলোই আমাদের আশা।

আমরা বিশ্বাস করি, এখনও সবকিছু নষ্টদের হাতে যায়নি। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি, সমাজের নৈতিক ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, মানুষের বিবেক নিঃশেষ হয়ে যায়নি। আর যা কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা কিছু হারিয়ে গেছে, যা কিছু দখল হয়ে গেছে—সেগুলোও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কারণ ইতিহাসে কোনো জাতি একক কোনো নেতা, দল বা গোষ্ঠীর শক্তিতে পুনর্জাগরণ ঘটায়নি; পুনর্জাগরণ ঘটেছে যখন নাগরিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, সাংবাদিক, শিল্পী এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে একটি নৈতিক চুক্তিতে উপনীত হয়েছে।

রাষ্ট্র মেরামতের কাজ তাই কেবল সরকারের কাজ নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। আমাদের নতুন করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, সংলাপ ফিরিয়ে আনতে হবে, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনতে হবে, এবং সবচেয়ে বড় কথা—মানুষকে রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার ঘৃণার পরিমাণ দিয়ে নয়, বরং তার পুনর্মিলনের সক্ষমতা দিয়ে।

বাংলাদেশ বহু ঝড় পার হয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ, দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট—সবকিছুর মধ্য দিয়েই এই জাতি বারবার উঠে দাঁড়িয়েছে। তাই আজও আশার কারণ আছে। এখনও নদীতে স্রোত আছে, এখনও মাঠে বীজ আছে, এখনও মানুষের হৃদয়ে স্বপ্ন আছে। সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন সাহস, আত্মসমালোচনা, সহনশীলতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ।

আমরা তাই হতাশার নয়, সতর্ক আশাবাদের পক্ষে দাঁড়াই। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশকে এখনও পুনর্গঠন করা সম্ভব; ভেঙে যাওয়া সামাজিক আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব; হারিয়ে যাওয়া সহনশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব; এবং নষ্টতার অন্ধকার থেকে একটি আরও মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও বহুত্ববাদী সমাজের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে নষ্টরা নয়—নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ সেই মানুষগুলো, যারা সব প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য, ন্যায়, মানবিকতা এবং সহাবস্থানের পক্ষে দাঁড়াতে সাহস করে।

অধ্যাপক . মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#সবকিছু_নষ্টদের_অধিকারে_যাবে #হুমায়ুন_আজাদ #বাংলাদেশ_২০২৪ #দেশচিন্তা #অধিকারপত্র #গণতন্ত্র #মব_কালচার #বহুত্ববাদ #সহাবস্থান #মানবাধিকার #রাজনীতি_ও_সমাজ #ইতিহাস_ও_স্মৃতি #রাষ্ট্র_ও_নাগরিক #RuleOfLaw #Democracy #Pluralism #Bangladesh #PoliticalCulture #SocialTrust #Odhikarpatra

Keywords: হুমায়ুন আজাদ, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, ,, গণতন্ত্র ও সহাবস্থান, রাজনৈতিক লেবেলিং



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: