অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক│সিরিজ: মাদ্রাসা শিক্ষার সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ
ইতিহাস, বৈষম্য, স্বীকৃতি, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, জবাবদিহি ও সংস্কারের পথে আলিয়া–কওমি শিক্ষার গভীর অনুসন্ধান
বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা দেশের অন্যতম বৃহৎ, প্রভাবশালী এবং সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা-উপব্যবস্থা। লাখো শিক্ষার্থী ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিক শিক্ষা, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষা পেলেও তাদের বড় একটি অংশ এখনো স্তরভিত্তিক স্বীকৃতি, আধুনিক দক্ষতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মাননিশ্চিতকরণ, নিরাপত্তা, গবেষণা, উচ্চশিক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই ধারাবাহিক ফিচার সিরিজে কওমি শিক্ষার ইতিহাস, পরিসংখ্যান, অর্থায়ন, প্রশাসন, শিক্ষক বেতন, সনদ, রাজনৈতিক প্রভাব, শিশুসুরক্ষা, PSEA, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অডিট, রাষ্ট্রীয় আইনের প্রযোজ্যতা, GCC কর্মসংস্থান, আরবি ভাষাভিত্তিক দক্ষতা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল শিক্ষা এবং “Reformation by Us, for Us” নীতিতে আত্মসংস্কারের একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লক্ষ্য কওমি শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে শিক্ষার্থীদের জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির শক্তিশালী অংশীদারে পরিণত করা।
কেন মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার নিয়ে এই ধারাবাহিক আয়োজন
এই ধারাবাহিক লেখার উদ্দেশ্য কোনো মাদ্রাসা, আলেমসমাজ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা ধর্মীয় শিক্ষাকে হেয় করা নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণের স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিন উপেক্ষিত শিক্ষাধারাকে গভীরভাবে বোঝা, মূল্যায়ন করা এবং সংস্কারের সম্ভাব্য পথ অনুসন্ধান করা।
আমি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের একজন নাগরিক এবং শিক্ষা বিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক। সে জায়গা থেকে আমার পেশাগত ও নৈতিক উপলব্ধি হলো—দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার যে কোনো বৃহৎ অংশকে জাতীয় পরিকল্পনা, মাননিশ্চিতকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বাইরে রেখে একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। মাদ্রাসা শিক্ষা, বিশেষত কওমি ধারা, বিপুলসংখ্যক শিশু, কিশোর ও তরুণকে শিক্ষা দিচ্ছে এবং প্রতিবছর একটি বড় জনগোষ্ঠীকে সমাজে প্রবেশ করাচ্ছে। ফলে এই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কেবল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি এবং জাতীয় সংহতির প্রশ্ন।
কওমি মাদ্রাসা ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি অর্থায়ন থেকে দূরত্ব বজায় রেখে নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয়, পাঠক্রম ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। এই স্বাধীনতার ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও কওমি শিক্ষার মধ্যে দূরত্ব যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে শিক্ষার্থীই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা যদি দীর্ঘদিন পড়াশোনা করেও ব্যবহারযোগ্য স্তরভিত্তিক সনদ, আধুনিক দক্ষতা, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পথ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবিকার সুযোগ না পায়, তাহলে শিক্ষা ও বাস্তব জীবনের মধ্যে একটি গভীর ব্যবধান সৃষ্টি হবে।
ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের উপমা: শিক্ষার্থীর প্রতি নয়, অবহেলাকারী ব্যবস্থার প্রতি সতর্কবার্তা
মেরি শেলির Frankenstein গল্পে একজন গবেষক একটি নতুন সত্তা সৃষ্টি করেছিলেন; কিন্তু সৃষ্টির পর তার প্রতি দায়িত্ব, যত্ন, শিক্ষা ও মানবিক সংযোগের কর্তব্য পালন করেননি। পরিত্যাগ, অবজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতার ফলেই সেই সৃষ্টি ক্ষোভ ও প্রতিশোধের পথে গিয়েছিল।
এই উপমাটি কোনোভাবেই কওমি শিক্ষার্থী, আলেম বা মাদ্রাসাকে “দানব” হিসেবে চিত্রিত করার জন্য ব্যবহৃত নয়। বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বহীনতার বিপদ বোঝানোর একটি সাহিত্যিক সতর্কতা। কোনো বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি শিক্ষা দেওয়া হয়, কিন্তু পরে তার সনদ, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব কেউ না নেয়, তবে সেই অবহেলা হতাশা, বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক অস্থিরতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
সমস্যা শিক্ষার্থীর মধ্যে নয়; সমস্যা এমন একটি ব্যবস্থায়, যা তাকে দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পরও যথাযথ সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—কওমি শিক্ষার্থীরা সমাজের জন্য ঝুঁকি কি না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—রাষ্ট্র, সমাজ এবং শিক্ষা নেতৃত্ব কি এই বিপুল শিক্ষার্থীসমাজকে দক্ষ, মর্যাদাপূর্ণ ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করছে?
বোঝা নয়, জাতীয় সম্পদে পরিণত করার সম্ভাবনা
কওমি শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও শিক্ষাগত সক্ষমতা রয়েছে, যেগুলো যথাযথভাবে বিকশিত করা গেলে তারা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে।
হিফজুল কোরআনের একজন শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ কোরআন স্মরণে ধারণ করার জন্য যে মনোযোগ, ধৈর্য, অধ্যবসায়, পুনরাবৃত্তি, আত্মশৃঙ্খলা ও স্মৃতিশক্তির পরিচয় দেয়—তা অসাধারণ মানসিক সক্ষমতার নিদর্শন। দীর্ঘ সময় ধরে আরবি ব্যাকরণ, ফিকহ, হাদিস, তাফসির ও যুক্তিশাস্ত্র অধ্যয়নও মনোনিবেশ ও বৌদ্ধিক সহনশীলতার দাবি রাখে।
অনেক কওমি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের দিন শুরু হয় ফজরের সময়। ভোরের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন, নিয়মিত অধ্যয়ন, আবাসিক পরিবেশ এবং সীমিত উপকরণে মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস তাদের মধ্যে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও অভিযোজনক্ষমতা তৈরি করতে পারে। তবে এসব ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব প্রতিষ্ঠান বা সব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যাবে না; এগুলোকে মানসম্মত শিক্ষণ, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও মানবিক পেডাগজির মাধ্যমে লালন করতে হবে। এই বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে যদি যুক্ত করা যায়—
- বাংলা ও ইংরেজি যোগাযোগ;
- কথ্য ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক আরবি;
- গণিত ও আর্থিক সাক্ষরতা;
- বিজ্ঞানমনস্কতা;
- ডিজিটাল শিক্ষা;
- তথ্য যাচাই ও সমালোচনামূলক চিন্তা;
- কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা;
- ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল সেবা;
- উদ্যোক্তা শিক্ষা;
- গবেষণা পদ্ধতি;
- একবিংশ শতাব্দীর কর্মদক্ষতাG
— তাহলে কওমি শিক্ষার্থীরা শুধু ধর্মীয় পেশায় নয়, দেশি ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বহু ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারবে।
কোরআনিক মূল্যবোধ ও আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞান পরস্পরবিরোধী নয়
এই ধারাবাহিকের মূল বিশ্বাস হলো—আল-কোরআন ও হাদিসের নৈতিক শিক্ষা এবং আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞানকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং কোরআনিক মূল্যবোধের সঙ্গে child-centred pedagogy, brain-based learning, competency-based education, digital literacy এবং skill development-এর সমন্বয় ঘটানো সম্ভব।
ইসলামের জ্ঞানদর্শনে উপকারী জ্ঞান, আমানত, ন্যায়, দক্ষতা, শ্রমের মর্যাদা এবং মানবকল্যাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতএব আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পেশাগত শিক্ষা গ্রহণ ধর্মীয় পরিচয়ের ক্ষয় নয়; বরং মানুষের কল্যাণে জ্ঞানকে প্রয়োগ করার একটি পথ।
কওমি মাদ্রাসার সংস্কার মানে তাই—
- কোরআন–হাদিস বাদ দেওয়া নয়;
- দারসে নিজামি ধ্বংস করা নয়;
- আলেমদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করা নয়;
- ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য মুছে দেওয়া নয়।
বরং এর অর্থ—
- ধর্মীয় শিক্ষাকে আরও কার্যকর করা;
- শিক্ষককে প্রশিক্ষিত করা;
- শিক্ষার্থীকে বোঝার ক্ষমতা দেওয়া;
- সনদের ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানো;
- কর্মজীবনের পথ সম্প্রসারণ করা;
- নিরাপদ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের কর্মবাজারে সম্ভাবনা
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় অংশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে কেন্দ্রীভূত। কওমি শিক্ষার্থীদের আরবি ভাষা ও ইসলামি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় এই শ্রমবাজারে একটি সম্ভাব্য তুলনামূলক সুবিধা তৈরি করে।
কিন্তু কিতাবি আরবি একা কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন—
- কথ্য আরবি;
- পেশাভিত্তিক আরবি;
- কার্যকর ইংরেজি;
- শ্রমচুক্তি বোঝার ক্ষমতা;
- প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ;
- occupational safety;
- বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া;
- ডিজিটাল ও আর্থিক সাক্ষরতা।
একজন আরবিভাষী হাফেজ বা আলেম যদি একই সঙ্গে HVAC technician, electrician, caregiver, hospitality worker, translator, digital content producer অথবা Arabic customer-support professional হন, তবে তিনি অদক্ষ শ্রমিকের তুলনায় উচ্চতর আয় ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারেন। এর মাধ্যমে তারা শুধু নিজেদের পরিবারের জীবনমান উন্নত করবে না; রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রা, স্থানীয় বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারবে।
জীবনমান নিশ্চিত না করলে স্বীকৃতি অসম্পূর্ণ
কোনো সনদকে মাস্টার্স সমমান দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই স্বীকৃতি তখনই বাস্তব মূল্য পায়, যখন সনদধারী—
- চাকরিতে আবেদন করতে পারে;
- উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করতে পারে;
- গবেষণায় অংশ নিতে পারে;
- উদ্যোক্তা হতে পারে;
- ন্যায্য আয় করতে পারে;
- পরিবার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।
কওমি শিক্ষার সংস্কারের চূড়ান্ত মানদণ্ড কেবল কতজন দাওরায়ে হাদিস পাস করলেন তা নয়; বরং তাঁদের STANDARD OF LIVING, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, পেশাগত অগ্রগতি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ কতটা উন্নত হলো।
শিক্ষার্থীর দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের শেষে যদি তার আয় অতি সামান্য হয়, চাকরি অনিশ্চিত থাকে এবং বিকল্প পেশায় যাওয়ার পথ বন্ধ থাকে, তবে সনদের প্রতীকী মর্যাদা জীবনের বাস্তব মর্যাদায় রূপ নেয় না।
এই ধারাবাহিক কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে নয়
এই লেখাগুলো—
- মাদ্রাসাবিরোধী নয়;
- আলেমবিরোধী নয়;
- ধর্মীয় শিক্ষাবিরোধী নয়;
- কওমি স্বায়ত্তশাসনের বিরুদ্ধে নয়;
- রাষ্ট্রীয় দখলের পক্ষে নয়।
এটি শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, শিক্ষার মান, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা এবং জাতীয় উন্নয়নের পক্ষে একটি গবেষণাভিত্তিক আবেদন। কোনো সংবাদ প্রতিবেদন, গবেষণা বা পরিসংখ্যানে কওমি শিক্ষার বিষয়ে সমালোচনামূলক তথ্য থাকলে তা পুরো আলেমসমাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। একইভাবে কওমি প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক অবদানও তাদের সব দুর্বলতাকে অস্বীকার করার যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি।
এই ধারাবাহিকে প্রকাশিত পরিসংখ্যানগুলোর উৎস, সময়কাল ও তথ্যসংগ্রহপদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে কওমি শিক্ষার্থীর মোট সংখ্যা নিয়ে সরকারি জরিপ, গবেষক, সংবাদমাধ্যম ও বোর্ডগুলোর তথ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। তাই যেসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত নয়, সেগুলোকে চূড়ান্ত সরকারি সত্য নয়, বরং আলোচ্য সূত্রের দাবি বা পরিকল্পনামূলক অনুমান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
অধিকারপত্রের এই আয়োজনের উদ্দেশ্য
একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে গভীর চিন্তা, বিদ্যমান গবেষণা, শিক্ষা পরিসংখ্যান, সংবাদ প্রতিবেদন, নীতি বিশ্লেষণ এবং তুলনামূলক অভিজ্ঞতার আলোকে মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে এই বহুপর্বের আয়োজন করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো—
- কওমি শিক্ষার প্রকৃত পরিসর দৃশ্যমান করা;
- ঐতিহাসিক অবদান স্বীকার করা;
- তথ্য ও বাজেটের ঘাটতি চিহ্নিত করা;
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা করা;
- সনদ ও কর্মসংস্থানের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা;
- শিশু সুরক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ খোঁজা;
- ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ভারসাম্য তৈরি করা;
- দক্ষতা, ডিজিটাল শিক্ষা ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তুলে ধরা;
- কওমি আলেমদের নেতৃত্বে আত্মসংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য মডেল প্রস্তাব করা।
আশা করা যায়, এই আলোচনা শিক্ষাবিদ, আলেম, মুহতামিম, মাদ্রাসাশিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, গবেষক, সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে একটি দায়িত্বশীল সংলাপ তৈরিতে সহায়তা করবে।
শেষ ঘোষণা
কওমি শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বাইরের কেউ নয়। তারা এই দেশের সন্তান, নাগরিক এবং ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তির অংশ। তাদের উন্নয়ন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ।
তাদের অবহেলা করলে সমাজ একটি বিশাল সম্ভাবনাকে হারাবে। তাদের শুধু সন্দেহের চোখে দেখলে রাষ্ট্র ও কওমি সমাজের দূরত্ব বাড়বে। কিন্তু ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করে মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিলে তারা বাংলাদেশের নৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের শক্তিশালী সম্পদে পরিণত হতে পারে।
এই ধারাবাহিকের উদ্দেশ্য কওমি শিক্ষাকে ভেঙে দেওয়া নয়; তার শক্তিকে সংরক্ষণ করে দুর্বলতাকে সংশোধন করা। কওমি শিক্ষার্থীকে সমাজের বোঝা হিসেবে নয়, যথাযথ বিনিয়োগের অপেক্ষায় থাকা জাতীয় মানবসম্পদ হিসেবে দেখাই এই আয়োজনের মূল প্রত্যয়।
কেন কওমিকে গুরুত্ব দিচ্ছি: বিশ্ব কওমি শিক্ষার কেন্দ্র এখন বাংলাদেশ: সংখ্যাগত বিস্তার, পরিসংখ্যানগত তাৎপর্য ও নীতিগত সতর্কতা
জাতীয় দৈনিক বণিক বার্তা-এ ১৮ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বাংলাদেশের কওমি শিক্ষা সম্পর্কে একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানগত চিত্র সামনে আনে। প্রতিবেদনে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, শুধু বেফাকের অধীনেই ৩২ হাজার ৭৩০টি মাদ্রাসায় আনুমানিক ৭০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। অন্য কওমি বোর্ডগুলোর অধীনে আরও প্রায় ১০ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সে হিসাবে দেশে কওমি মাদ্রাসার মোট সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দাবি হলো—বিশ্বের মোট দেওবন্দি বা কওমি শিক্ষার্থীর প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে অধ্যয়ন করে। ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে কওমি শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে ভারতের All India Deeni Ta’alimi Board-এর অধীনে ২০২৪ সালে প্রায় ২০ হাজার ৯০০ প্রতিষ্ঠান ও ২৩ লাখ ৭১ হাজার ৪০৪ শিক্ষার্থী, আর পাকিস্তানের Wifaq-ul-Madaris al-Arabia-এর অধীনে ২৭ হাজার ৪৮ প্রতিষ্ঠান ও ২৪ লাখ ২ হাজার ৩২৩ শিক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। এই তথ্যগুলো বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের কওমি শিক্ষার্থীসংখ্যা ভারতের তুলনায় প্রায় তিনগুণ এবং পাকিস্তানের তুলনায়ও প্রায় তিনগুণ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত সতর্কতা প্রয়োজন। বণিক বার্তা-এর প্রতিবেদনে উল্লিখিত বাংলাদেশের ৭০ লাখ শিক্ষার্থী ও ৩২ হাজার ৭৩০ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মূলত বেফাকের দাবি বা প্রশাসনিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তানের সংখ্যাগুলো সংশ্লিষ্ট বোর্ডের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর হিসাব। তিন দেশের তথ্য সংগ্রহপদ্ধতি, সংজ্ঞা, বয়সসীমা, স্তর, দ্বৈত নিবন্ধন এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যাচাই একই নয়। ফলে এগুলোকে কঠোরভাবে সমমানের সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে বোর্ড-প্রদত্ত তুলনামূলক আনুমানিক চিত্র হিসেবে ব্যবহার করা অধিক যুক্তিযুক্ত।
কওমি শিক্ষার দ্রুত বিস্তার: পরীক্ষার্থীসংখ্যার প্রবণতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০২২ সালে ২ লাখ ২৫ হাজার ৬৩১ জন থেকে ২০২৬ সালে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬ জনে উন্নীত হয়েছে। চার বছরে বৃদ্ধি প্রায় ৫৭ শতাংশ। এই প্রবণতা দেখায় যে কওমি শিক্ষার সম্প্রসারণ শুধু প্রতিষ্ঠানসংখ্যায় নয়; পরীক্ষার্থীসংখ্যাতেও দ্রুত ঘটছে।
তবে ৭০ লাখ মোট শিক্ষার্থীর বিপরীতে কেন্দ্রীয় পরীক্ষার্থী প্রায় ৩ লাখ ৫৪ হাজার হওয়ায় কয়েকটি প্রশ্ন উঠে আসে—
- সব স্তরের শিক্ষার্থী কি কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নেয় না?
- নূরানি, মক্তব, হিফজ ও প্রাথমিক স্তরের বড় অংশ কি বোর্ড পরীক্ষার বাইরে?
- একই প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী কি বেফাকের তথ্যভান্ডারে সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত?
- মোট শিক্ষার্থীসংখ্যা কি enrolment stock, নাকি annual attendance?
- দ্বৈতভাবে সাধারণ স্কুল ও কওমি মাদ্রাসায় পড়া শিশু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া মোট enrolment এবং পরীক্ষার্থীসংখ্যার সম্পর্ক পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
দাওরায়ে হাদিসে পৌঁছায় কতজন?
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ সালে দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় অংশ নেয় ২৩ হাজার ৮৮১ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পুরুষ ছিল ১৫ হাজার ২৬৮ জন এবং নারী ৮ হাজার ৬১৩ জন। এই সংখ্যা ৭০ লাখের মোট কওমি শিক্ষার্থীসংখ্যার তুলনায় প্রায়:
অর্থাৎ, ৭০ লাখের মধ্যে ২৩,৮৮১ জন প্রায় ০.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ মোট কওমি enrolment-কে denominator হিসেবে ধরলে বছরে দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষার্থী মোট শিক্ষার্থীর এক শতাংশেরও অনেক নিচে। তবে এই অনুপাতকে dropout rate বলা যাবে না, কারণ মোট ৭০ লাখের মধ্যে শিশু থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত সব শিক্ষার্থী রয়েছে, আর দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট সমাপনী cohort। তারপরও সংখ্যাটি দেখায় যে সর্বোচ্চ স্বীকৃত স্তরে পৌঁছানো শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট enrolment-এর তুলনায় খুবই সীমিত।
এখানে নীতিগত সমস্যা আরও স্পষ্ট। ২০১৮ সালের আইনে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমান দেওয়া হলেও নিচের ও মধ্যবর্তী স্তরগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সমমান পায়নি। ফলে যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, তারা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও চাকরির কাঠামোয় গুরুতর বাধার মুখে পড়ে।
জাতীয় শিক্ষায় কওমির সম্ভাব্য অংশ: নতুন আনুমানিক হিসাব
আগের বিশ্লেষণে আলিয়া মাদ্রাসায় আনুমানিক ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ১৯১ জন শিক্ষার্থী এবং কওমিতে প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থীর তুলনা করা হয়েছিল। নতুন প্রতিবেদনের তথ্য সেই অনুপাতকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে।
কওমি বনাম আলিয়া
৭০,০০,০০০÷২৭,৯৬,১৯১≈২.৫০৩৪≈২.৫০ অর্থাৎ, ৭০ লাখ হলো ২৭,৯৬,১৯১-এর প্রায় ২.৫০ গুণ। অন্যভাবে বললে, ২৭,৯৬,১৯১ হলো ৭০ লাখের প্রায় ৩৯.৯৫%।
প্রতি একজন আলিয়া শিক্ষার্থীর বিপরীতে কওমিতে প্রায় আড়াইজন শিক্ষার্থী রয়েছে।
দুই ধারার মোট শিক্ষার্থী: ৭০,০০,০০০+২৭,৯৬,১৯১=৯৭,৯৬,১৯১ সেই হিসাবে মোট মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মধ্যে—
- কওমির আনুমানিক অংশ: ৭১.৪৬ শতাংশ
- আলিয়ার আনুমানিক অংশ: ২৮.৫৪ শতাংশ
এই হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় সংখ্যাগতভাবে কওমি ধারাই প্রধান। অথচ রাষ্ট্রীয় বাজেট, নিবন্ধন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মাননিশ্চিতকরণ, পরিসংখ্যান এবং সরকারি পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান আলিয়া ধারা। এতে একটি বড় enrolment–policy mismatch তৈরি হয়েছে।
সমগ্র জাতীয় শিক্ষায় সম্ভাব্য অংশ
বাংলাদেশের মোট শিক্ষার্থীসংখ্যার একটি একক, একই বছরের unique headcount না থাকায় কওমির সুনির্দিষ্ট জাতীয় অংশ নির্ধারণ করা এখনো কঠিন। তবে শুধু প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ২ কোটির বেশি শিক্ষার্থী এবং মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কারিগরি, মাদ্রাসা ও উচ্চশিক্ষার অন্যান্য স্তর মিলিয়ে জাতীয় শিক্ষার্থীসংখ্যা কয়েক কোটির বেশি।
যদি ৭০ লাখের কওমি enrolment মোটামুটি নির্ভরযোগ্য হয়, তবে কওমি শিক্ষা বাংলাদেশের মোট শিক্ষার্থীসমাজের একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য দ্বি-অঙ্কের অংশ প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। কিন্তু স্তরভিত্তিক ও বয়সভিত্তিক তথ্য না থাকায় নির্দিষ্ট শতকরা হার ঘোষণা করা গবেষণাগতভাবে নিরাপদ নয়।
বিস্তারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ
প্রতিবেদনটি কওমি শিক্ষার বিস্তারের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছে।
- প্রথমত, দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারের কাছে কওমি মাদ্রাসা প্রায়ই কম খরচে বা বিনা খরচে শিক্ষা, খাদ্য ও আবাসনের সুযোগ দেয়। ফলে পরিবারগুলোর কাছে এটি কেবল ধর্মীয় পছন্দ নয়; একটি বাস্তব সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাও।
- দ্বিতীয়ত, মূলধারার শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, কোচিং, পরিবহন, বই এবং আবাসন ব্যয় অনেক পরিবারকে কওমি শিক্ষার দিকে ঠেলে দেয়।
- তৃতীয়ত, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ বাড়ছে। কওমি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নৈতিক শৃঙ্খলা, ধর্মীয় পরিচয় ও আবাসিক পরিবেশের কারণে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।
- চতুর্থত, সরকারি বিদ্যালয় বা সামাজিক সেবা দুর্বল এমন এলাকায় কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা, আবাসন, খাদ্য ও ধর্মীয় পরিচর্যার সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে।
এই বাস্তবতা থেকে বোঝা যায়, কওমি শিক্ষার বিস্তার শুধু ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ফল নয়; এর সঙ্গে দারিদ্র্য, জনসেবা ঘাটতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মূলধারার শিক্ষার ব্যয়সঙ্কট গভীরভাবে যুক্ত।
কর্মসংস্থানের সংকীর্ণতা: সংখ্যাগত বিস্তার বনাম অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি
প্রতিবেদনে BRAC Institute of Governance and Development-এর একটি গবেষণা উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, কওমি শিক্ষিতদের মধ্যে মাত্র ২.১৭ শতাংশ আনুষ্ঠানিক সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারে। প্রায় ৪৬.৫৫ শতাংশ ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব, মাদ্রাসাশিক্ষক বা অন্যান্য ধর্মীয় পেশায় যুক্ত হয়। বাকিরা ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্বকর্মসংস্থান ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করে।
এই তথ্য যদি বৃহত্তর কওমি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে, তবে তা একটি গুরুতর নীতিগত বৈপরীত্য নির্দেশ করে:
- enrolment দ্রুত বাড়ছে;
- প্রতিষ্ঠানসংখ্যা বাড়ছে;
- রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সীমিত;
- কিন্তু formal employment খুবই কম।
অর্থাৎ কওমি ব্যবস্থা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শিক্ষায় ধরে রাখলেও তাদের একটি বড় অংশকে বহুমাত্রিক শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত করতে পারছে না। এর ফলে শিক্ষার বিস্তার ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার মধ্যে একটি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে। তবে ২.১৭ শতাংশের তথ্যটি কক্সবাজারভিত্তিক cross-sectional study থেকে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। তাই এটিকে সব কওমি স্নাতকের জাতীয় হার হিসেবে সরাসরি প্রয়োগ করা উচিত নয়। বরং এটি কর্মসংস্থানের সংকীর্ণতার একটি শক্তিশালী সতর্কসংকেত।
নিবন্ধনহীন বিস্তার: রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান ও শিশুর অধিকারের ঝুঁকি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৪০ হাজারের বেশি কওমি প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে, কিন্তু এগুলোর বড় অংশ কোনো আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন কাঠামোর মধ্যে নেই। এই অবস্থা কয়েকটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে—
- প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা যায় না;
- শিক্ষার্থীর unique headcount নিশ্চিত করা যায় না;
- শিশুর বয়স, লিঙ্গ, আবাসিক অবস্থা ও প্রতিবন্ধিতা জানা যায় না;
- শিক্ষকযোগ্যতা ও বেতন সম্পর্কে জাতীয় তথ্য নেই;
- আর্থিক নিরীক্ষা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা অস্বচ্ছ থাকতে পারে;
- ভবন, অগ্নিনিরাপত্তা ও ছাত্রাবাসের মান অজানা;
- শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য নেই;
- ঝরে পড়া, স্থানান্তর ও কর্মসংস্থানের পথ অনুসরণ করা যায় না।
বেফাকের মহাপরিচালকও প্রতিবেদনে স্বীকার করেছেন যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা ও শিশুর অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে নিবন্ধন ও মাননিশ্চিতকরণের দাবি কেবল বাইরের সমালোচনা নয়; কওমি নেতৃত্বের অভ্যন্তরেও সমস্যা সম্পর্কে উপলব্ধি রয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম কওমি কেন্দ্র, কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কোথায়?
বাংলাদেশ যদি সত্যিই বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ কওমি শিক্ষার্থীর আবাসস্থল হয়, তবে এটি শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয় নয়; একটি বিশাল জাতীয় শিক্ষা ও মানবসম্পদ প্রশ্ন। এমন একটি শিক্ষাধারায় যদি— আনুমানিক ৭০ লাখ শিক্ষার্থী; ৪০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান; দ্রুত বাড়তে থাকা পরীক্ষার্থী; প্রায় ২৪ হাজার বার্ষিক দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষার্থী—থাকে, তবে একে সরকারি শিক্ষা পরিকল্পনা, বাজেট, পরিসংখ্যান, শিশুসুরক্ষা ও কর্মসংস্থান নীতির বাইরে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু পূর্ববর্তী বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কওমি শিক্ষার জন্য কোনো সুস্পষ্ট পৃথক বরাদ্দ চিহ্নিত হয়নি। ফলে বিশ্বের বৃহত্তম কওমি শিক্ষার্থীসমাজ রাষ্ট্রীয় শিক্ষা অর্থায়নে সবচেয়ে কম দৃশ্যমান ধারাগুলোর একটি।
এটি একটি গভীর বৈপরীত্য: সংখ্যায় সবচেয়ে বড়, কিন্তু বাজেটে প্রায় অদৃশ্য; সামাজিকভাবে প্রভাবশালী, কিন্তু জাতীয় পরিসংখ্যানে অসম্পূর্ণ; সনদে আংশিক স্বীকৃত, কিন্তু মাননিশ্চিতকরণে বিচ্ছিন্ন।
নীতিগত তাৎপর্য: নিবন্ধন মানেই সরকারি দখল নয়
প্রতিবেদনে কওমি নেতাদের একটি অংশের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে যে নিবন্ধন, এমপিও বা সরকারি নিয়ন্ত্রণ ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করতে পারে। এই আশঙ্কা ঐতিহাসিকভাবে বাস্তব। কিন্তু নিবন্ধনের একমাত্র মডেল এমপিও বা পাঠক্রমের সরকারি দখল নয়।
একটি বিকল্প, negotiated registration framework হতে পারে যেখানে—
- ধর্মীয় নেসাব ও কিতাব নির্ধারণ করবেন আলেমরা;
- প্রতিষ্ঠান একটি unique registration number পাবে;
- স্তরভিত্তিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক তথ্য দেবে;
- child safeguarding, PSEA ও অগ্নিনিরাপত্তা মানবে;
- আর্থিক audit শুধু সরকারি অর্থ বা জনদানের ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে;
- সাধারণ শিক্ষার ন্যূনতম learning outcome যৌথভাবে নির্ধারিত হবে;
- বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন বজায় থাকবে;
- স্বীকৃত মধ্যবর্তী সনদ তৈরি হবে;
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি দেওয়া যাবে।
অর্থাৎ নিবন্ধনকে নিয়ন্ত্রণ নয়, পরিসংখ্যান, নিরাপত্তা, অধিকার ও সহায়তার প্রবেশদ্বার হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে।
সংশোধিত পরিসংখ্যানগত সারসংক্ষেপ
|
সূচক |
প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য |
|
বেফাকের অধীন মাদ্রাসা |
৩২,৭৩০ |
|
বেফাকের আনুমানিক শিক্ষার্থী |
৭০ লাখ |
|
অন্যান্য বোর্ডের প্রতিষ্ঠান |
প্রায় ১০,০০০ |
|
সম্ভাব্য মোট কওমি প্রতিষ্ঠান |
৪০,০০০-এর বেশি |
|
বিশ্ব কওমি শিক্ষার্থীতে বাংলাদেশের অংশ |
প্রায় ৬০% |
|
ভারত: প্রতিষ্ঠান |
২০,৯০০ |
|
ভারত: শিক্ষার্থী |
২৩,৭১,৪০৪ |
|
পাকিস্তান: প্রতিষ্ঠান |
২৭,০৪৮ |
|
পাকিস্তান: শিক্ষার্থী |
২৪,০২,৩২৩ |
|
বেফাক পরীক্ষার্থী, ২০২২ |
২,২৫,৬৩১ |
|
বেফাক পরীক্ষার্থী, ২০২৬ |
৩,৫৪,০৩৬ |
|
চার বছরে বৃদ্ধি |
প্রায় ৫৭% |
|
দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষার্থী, ২০২৬ |
২৩,৮৮১ |
|
পুরুষ পরীক্ষার্থী |
১৫,২৬৮ |
|
নারী পরীক্ষার্থী |
৮,৬১৩ |
|
আলিয়া শিক্ষার্থী |
প্রায় ২৭.৯৬ লাখ |
|
কওমি : আলিয়া আনুমানিক অনুপাত |
২.৫০ : ১ |
|
মোট মাদ্রাসা শিক্ষায় কওমির আনুমানিক অংশ |
৭১.৪৬% |
গবেষণাগত প্রতিফলন
সাম্প্রতিকজ এক প্রতিবেদন বাংলাদেশের কওমি শিক্ষার পরিসর সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চিত্র দেয়। এই চিত্র অনুযায়ী, কওমি শিক্ষা আর কোনো প্রান্তিক বা ক্ষুদ্র ধর্মীয় ব্যবস্থা নয়; এটি দেশের বৃহত্তম বেসরকারি শিক্ষানেটওয়ার্কগুলোর একটি এবং সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেওবন্দি শিক্ষার্থীসমাজ।
তবে এই আকার যতটা তাৎপর্যপূর্ণ, তথ্যের দুর্বলতাও ততটাই গুরুতর। বোর্ড-প্রদত্ত মোট enrolment, কেন্দ্রীয় পরীক্ষার্থী, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা জরিপ এবং উচ্চশিক্ষার স্বীকৃতি—এসব এখনো একটি সমন্বিত data architecture-এর অংশ নয়। তাই ৬০ শতাংশ বৈশ্বিক অংশ বা ৭০ লাখ শিক্ষার্থীর দাবি নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোকে একটি স্বাধীন জাতীয় শুমারির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পরবর্তী শিক্ষা শুমারিতে কওমি ধারাকে বাদ রাখা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়া নয়; বরং দেশের কয়েক কোটি পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তির একটি বড় অংশকে অদৃশ্য রাখা।
সংখ্যার বিচারে কওমি শিক্ষা ইতিমধ্যে জাতীয় মূলধারার বাস্তব অংশ; এখন প্রয়োজন তাকে পরিসংখ্যান, মান, অধিকার, বাজেট ও কর্মসংস্থানের মূলধারায় মর্যাদার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা।
এই ধারাবাহিকের চূড়ান্ত আউটপুট কী হবে?
এই ধারাবাহিকের শেষ দুই পর্বে সংস্কার নিয়ে বিশদ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে, যা নীতিনির্ধারক ও পলিসি মেকারদের প্রয়োজন ঘুচাবে।
এর মধ্যে একটি প্রস্তাবনা হিসেবে “Reformation by Us, for Us”—আস্থা, স্বায়ত্তশাসন ও যৌথ দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে কওমি শিক্ষা সংস্কারের নতুন পথ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেখানে মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করে প্রস্তাবনা প্রণীত হয়েছে। আসলে বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা সংস্কারের সবচেয়ে বড় বাধা কেবল পাঠক্রমের পুরোনোত্ব, দক্ষতার ঘাটতি বা প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এর গভীরে রয়েছে রাষ্ট্র ও আলেমসমাজের পারস্পরিক অবিশ্বাস।
কওমি নেতৃত্বের একটি বড় অংশ সরকারি হস্তক্ষেপকে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য, দেওবন্দি ঐতিহ্য এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে রাষ্ট্র কওমি শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার, নিবন্ধনহীনতা, অসম মান, শিশুর অধিকার, কর্মসংস্থান ও জাতীয় পরিকল্পনা থেকে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই দুই অবস্থান মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকলে সংস্কারের প্রতিটি উদ্যোগই নিয়ন্ত্রণ বনাম স্বাধীনতার সংঘাতে আটকে যাবে। তাই কওমি শিক্ষা সংস্কারের ভাষা হওয়া উচিত নয়—“রাষ্ট্র তোমাদের বদলে দেবে”। বরং নীতি হতে হবে: “কওমি সমাজ নিজের সংস্কার নিজেই করবে; রাষ্ট্র সেই সংস্কারের সহযোগী, সহায়ক ও ন্যায়সংগত অংশীদার হবে।”
আর এটিই হতে পারে Reformation by Us, for Us Policy—অর্থাৎ কওমি শিক্ষার সংস্কার কওমি আলেম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বেই হবে; কিন্তু জাতীয় উন্নয়ন, শিশুর অধিকার, মাননিশ্চিতকরণ এবং কর্মসংস্থানের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।
অপরটি একটি পলিসি ব্রিফ হিসেবে একটি নীতি-প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামী নৈতিকতা, জ্ঞান, দক্ষতা ও নাগরিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসায় একুশ শতকের স্নাতক তৈরি করা এবং এই জাতীয় সংস্কার-কাঠামো দেওবন্দের আট মূলনীতি থেকে উৎসরিত হয়েছে। আসলে এই গবেষণাধর্মী সংস্কার প্রস্তাবনা শীর্ষক শেষ নিবন্ধটি দেওবন্দবিষয়ক দলিল, প্রাসঙ্গিক আইন, শিক্ষানীতি, ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্য এবং দেশি-বিদেশি শিক্ষা-সংক্রান্ত উৎস পর্যালোচনা করে জনস্বার্থে প্রস্তুত একটি স্বাধীন একাডেমিক ও নীতিগত বিশ্লেষণ। এতে উপস্থাপিত মতামত, মূল্যায়ন ও সংস্কার-প্রস্তাব লেখকের গবেষণালব্ধ অভিমত; এগুলো বাংলাদেশ সরকার, কোনো কওমি শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা, ধর্মীয় সংগঠন, আলেমসমাজ কিংবা উদ্ধৃত প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচ্য নয়।
নিবন্ধটির উদ্দেশ্য কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা, দেওবন্দি ঐতিহ্য, কোনো মসলক, ধর্মীয় বিশ্বাস বা আলেমসমাজকে অবমূল্যায়ন কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং ইসলামী নৈতিকতা, কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক জ্ঞানচর্চা ও কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে শিক্ষার মান, শিক্ষার্থী-সুরক্ষা, অন্তর্ভুক্তি, সনদের গ্রহণযোগ্যতা, উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি গঠনমূলক জাতীয় সংলাপের ভিত্তি তৈরি করা।
এখানে প্রস্তাবিত “একীকরণ” বলতে আকিদা, মসলক, ধর্মীয় পাঠ্যক্রম বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকে জোরপূর্বক একরূপ করা বোঝানো হয়নি। এর অর্থ হলো—ন্যূনতম জাতীয় শিখনফল, মাননিশ্চয়ন, সনদের বহনযোগ্যতা, শিক্ষকমান, শিক্ষার্থীর অধিকার, নিরাপত্তা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে প্রবেশের সমতাভিত্তিক সুযোগ নিশ্চিত করা।
উদ্ধৃত আইন, নীতি, পরিসংখ্যান ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশের সময় প্রাপ্ত উৎসের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। আইন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে; তাই কোনো আইনগত, প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি গেজেট, সর্বশেষ বিধিবিধান এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা যাচাই করা আবশ্যক।
প্রস্তাবিত জাতীয় কাঠামো কোনো চূড়ান্ত বা আরোপযোগ্য নকশা নয়। বাস্তবায়নের আগে কওমি বোর্ড, আলেমসমাজ, মাদ্রাসা-পরিচালক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নারী প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, শিশুসুরক্ষা ও প্রতিবন্ধিতা বিশেষজ্ঞ, নিয়োগদাতা এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থবহ অংশগ্রহণে বিস্তৃত পরামর্শ, পাইলট কার্যক্রম ও স্বাধীন প্রভাবমূল্যায়ন অপরিহার্য। কেন এই উপায়ে চিন্তা করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে চিন্তা করতে হবে কেন বারবার সংস্কার উদ্যোগ ব্যর্থ।
কওমি শিক্ষা সংস্কার কেন বারবার ব্যর্থ হয়: স্বকীয়তার ভয়, নেতৃত্বের বিভাজন ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণ
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি কেবল পাঠক্রম বা সনদের নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে আস্থা, কর্তৃত্ব, প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্র–সমাজ সম্পর্কের সংকট। ২০১৩ সালের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন ছিল এ সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। খসড়া আইনটি অর্থ, জনপ্রশাসন ও প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির অনুমোদন পেয়েছিল এবং প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষের অধিকাংশ সদস্যই কওমি আলেম হওয়ার কথা ছিল। তারপরও কওমি নেতৃত্বের একটি প্রভাবশালী অংশ একে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে। তীব্র বিরোধিতা ও সংঘাতের হুমকির পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় খসড়াটি মন্ত্রিসভার এজেন্ডা থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এই ঘটনা দেখায়, রাষ্ট্র আইন প্রণয়নের সক্ষমতা রাখলেও কওমি শিক্ষার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধের মুখে প্রায়ই ব্যাকফুটে চলে যায়। কিন্তু কেন?
- ১. ঐতিহাসিক স্বায়ত্তশাসন হারানোর ভয়: কওমি মাদ্রাসার বড় অংশ দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষাদর্শন অনুসরণ করে। এই ধারার ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সরকারি অর্থ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে দূরে থাকা। শাহ আহমদ শফীর পক্ষ থেকে ২০১৬ সালে উপস্থাপিত পাঁচ শর্তের কেন্দ্রেও ছিল—কওমি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা, সিলেবাস ও অর্থায়নে সরকারি নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ না করে শুধু সনদের মর্যাদা অর্জন। সরকারি অনুদান, এমপিও ও নিবন্ধনের মতো পদক্ষেপ থেকেও দূরে থাকার দাবি জানানো হয়েছিল। এই অবস্থানের একটি ঐতিহাসিক যুক্তি আছে। ঔপনিবেশিক ও পরবর্তী রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ সম্পর্কে অবিশ্বাস, ধর্মীয় পাঠক্রম পরিবর্তনের আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে প্রতিষ্ঠান ব্যবহৃত হওয়ার ভয় কওমি নেতৃত্বকে সতর্ক করেছে। কিন্তু স্বায়ত্তশাসন ও দায়মুক্তি এক বিষয় নয়। ধর্মীয় পাঠক্রমের স্বাধীনতা সংরক্ষণ করা যেতে পারে; কিন্তু শিশুসুরক্ষা, শিক্ষকযোগ্যতা, ন্যূনতম ভাষা–গণিত–বিজ্ঞান শিক্ষা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সনদের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বিষয়ে পরিণত হতে পারে না।
- ২. স্বীকৃতি চাওয়া হয়েছে, কিন্তু মাননিশ্চিতকরণের শর্ত প্রত্যাখ্যাত হয়েছে : কওমি নেতৃত্বের একটি বড় অংশ সরকারি সনদের স্বীকৃতি চেয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে নিবন্ধন, পরিদর্শন, অভিন্ন পাঠক্রম বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা করেছে। এই দ্বৈত অবস্থান একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্ন তৈরি করে: রাষ্ট্রের কাছ থেকে জাতীয় মর্যাদা নেওয়া হবে, কিন্তু সেই মর্যাদার ভিত্তিতে রাষ্ট্র কোনো মান যাচাই করতে পারবে না—এটি কতটা টেকসই? শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালের গেজেট এবং ২০১৮ সালের আইন দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমান দেয়, কিন্তু সরকারি প্রতিনিধি বা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ছাড়াই কওমি বোর্ডগুলোর নিজস্ব সমন্বয়ের ভিত্তিতে। অর্থাৎ সরকার একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছায়: সনদের মর্যাদা দেওয়া হলো, কিন্তু পুরো শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও quality assurance প্রশ্নটি স্পর্শ করা হলো না। এটি তাৎক্ষণিক বিরোধ কমালেও দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত সমস্যাগুলো অমীমাংসিত রেখেছে।
-
৩. আলেমদের মধ্যে প্রতিনিধিত্বের দ্বন্দ্ব: কওমি শিক্ষা একক প্রতিষ্ঠান বা একক বোর্ডের অধীনে গড়ে ওঠেনি। অঞ্চল, ব্যক্তিত্ব, প্রতিষ্ঠান ও মতাদর্শকেন্দ্রিক বহু বোর্ড ও নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। ফলে সরকার কার সঙ্গে আলোচনা করবে, কে পুরো কওমি ধারার বৈধ প্রতিনিধি—এই প্রশ্নে বারবার বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৩ সালের আইন নিয়ে কেউ সমর্থন জানিয়েছিলেন, কেউ সংশোধন চেয়েছিলেন, আবার বেফাক তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। এমনকি সমর্থনের দাবিকৃত কোনো কোনো আলেম পরে বলেন, তাঁরা খসড়াটি না দেখে চূড়ান্ত অবস্থান দেবেন না। এখানে মতভেদ নিজে সমস্যা নয়। কোনো বৃহৎ শিক্ষাধারায় মতবৈচিত্র্য স্বাভাবিক। সমস্যা তখনই হয়, যখন—
-
-
-
মতভেদ সমাধানের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নেই;
- বোর্ডগুলোর প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণে স্বচ্ছ পদ্ধতি নেই;
- ব্যক্তিত্বের প্রভাব প্রতিষ্ঠানগত সিদ্ধান্তকে ছাপিয়ে যায়;
- ভিন্নমতকে ধর্মবিরোধিতা বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়;
- শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের স্বার্থ নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার নিচে চাপা পড়ে।
-
-
- ৪. সরকারও শিক্ষানীতিকে রাজনৈতিক সমঝোতায় নামিয়ে এনেছে: শুধু আলেমসমাজকে দায়ী করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থাকবে। সরকারও কওমি শিক্ষাকে অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা সংস্কারের পরিবর্তে রাজনৈতিক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। ২০১৩ সালে তীব্র প্রতিরোধের মুখে আইন প্রত্যাহার করা হয়। পরে সরকার পূর্ণাঙ্গ কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিবর্তে শুধু সর্বোচ্চ সনদের সমমান দেওয়ার পথে যায়। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমে, কিন্তু প্রাথমিক থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত পাঠক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, তথ্যব্যবস্থা ও জবাবদিহির প্রশ্ন বাদ পড়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্র একটি কঠিন সংস্কার এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত নেয়। এটি রাজনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত হতে পারে, কিন্তু শিক্ষানীতির দৃষ্টিতে অসম্পূর্ণ। সরকার যদি কওমি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে সত্যিই জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করত, তবে শুধু শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে দর-কষাকষি নয়, শিক্ষক, নারী মাদ্রাসা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাবিদ, শিশুসুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও শ্রমবাজার প্রতিনিধিদেরও প্রক্রিয়ায় যুক্ত করত।
ব্যক্তিস্বার্থ কি কোরআনিক ন্যায়বোধের ওপরে উঠে গেছে?
এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সতর্কভাবে উত্তর দিতে হবে। নির্দিষ্ট ব্যক্তির অন্তর্গত উদ্দেশ্য বা ব্যক্তিস্বার্থ প্রমাণ ছাড়া নির্ধারণ করা ন্যায়সংগত নয়। তবে কাঠামোগতভাবে কিছু সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত দৃশ্যমান। কওমি বোর্ড বা বড় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি একটি নতুন জাতীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে আসে, তবে তাদের বর্তমান কর্তৃত্ব, সনদ নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং অনুসারী নেটওয়ার্ক পরিবর্তিত হতে পারে। তাই সংস্কারের বিরোধিতার পেছনে শুধু ধর্মীয় নীতি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রক্ষার প্রণোদনাও কাজ করতে পারে—এটি একটি যুক্তিসঙ্গত বিশ্লেষণী অনুমান, নিশ্চিত অভিযোগ নয়। একইভাবে সরকারও কওমি নেতৃত্বকে কখনো রাজনৈতিক সমর্থন, সামাজিক প্রভাব বা বিরোধী শক্তির ভারসাম্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তখন শিক্ষার্থীর অধিকার নয়, রাজনৈতিক সুবিধাই আলোচনার কেন্দ্র হয়ে যায়।
কোরআনিক ন্যায়বোধের আলোকে যে প্রশ্নগুলো করা দরকার, সেগুলো হলো—
- কোনো নেতৃত্ব কি শিক্ষার্থীর কল্যাণের চেয়ে নিজের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে?
- সরকারি নিয়ন্ত্রণের ভয় দেখিয়ে কি ন্যূনতম মান ও জবাবদিহিকেও প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে?
- ধর্মীয় স্বকীয়তার নামে কি শিক্ষককে কম বেতন ও শিশুকে সীমিত শিক্ষা মেনে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে?
- রাজনৈতিক পছন্দের কারণে কি একটি প্রজন্মের স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিলম্বিত হচ্ছে?
ধর্মীয় নেতৃত্বের নৈতিক শক্তি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন তা নিজের ক্ষমতাকেও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখে না। প্রশ্নটি এখানে নয়, আসলে প্রশ্নটি ডিসকোর্সে। ট্রওাস্ট বনাম মিসট্রাস্ট তথা আস্থা বনাম অনাস্থা।
আস্থা বনাম অনাস্থা: রাষ্ট্রের আনুগত্য, ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসন ও ‘ফাঁদে পড়ার’ আশঙ্কা
কওমি মাদ্রাসা সংস্কারের আলোচনা শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়—রাষ্ট্র ও কওমি আলেমসমাজ পরস্পরকে কতটা বিশ্বাস করে? এখানে বিরোধটি কেবল পাঠ্যক্রম, নিবন্ধন বা সনদের নয়; এটি মূলত আস্থা বনাম অনাস্থার সংকট। রাষ্ট্র মনে করে, জাতীয় স্বীকৃতি পেতে হলে শিক্ষার মান, পরীক্ষা, সনদ, শিক্ষার্থী-সুরক্ষা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ন্যূনতম জবাবদিহি থাকতে হবে। অন্যদিকে কওমি নেতৃত্বের একটি অংশ আশঙ্কা করে, আজ যে নিবন্ধন বা মাননিশ্চয়তার কথা বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই হয়তো ধর্মীয় পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, আলেম নিয়োগে হস্তক্ষেপ কিংবা কওমি প্রতিষ্ঠানের স্বকীয়তা সংকুচিত করার প্রশাসনিক হাতিয়ারে পরিণত হবে।
এই অনাস্থাকে শুধু অজ্ঞতা, পশ্চাৎপদতা অথবা রাষ্ট্রবিরোধিতা বলে উড়িয়ে দিলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। এর পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রীয় নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় নেতৃত্বকে ব্যবহার, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষানীতির দিকবদল। ফলে সরকারের প্রতিটি উদ্যোগকে কওমি নেতৃত্বের কেউ কেউ সম্ভাব্য “ফাঁদ” হিসেবে দেখেন। তাঁদের আশঙ্কা—প্রথমে সনদের স্বীকৃতি ও উন্নয়নের কথা বলা হলেও পরে নিবন্ধন, অর্থায়ন ও পরিদর্শনের মাধ্যমে আকিদা, মসলক, দারসে নিজামি, হাদিস-ফিকহ শিক্ষা কিংবা শিক্ষক নিয়োগে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এই ভয় বাস্তব হোক বা অতিরঞ্জিত—নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে একে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ আস্থাহীন জনগোষ্ঠীর ওপর কাগুজে সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু তা কার্যকর করা যায় না। আবার অনাস্থার যুক্তি দেখিয়ে সব ধরনের মাননিশ্চয়তা, শিশুসুরক্ষা ও জবাবদিহি প্রত্যাখ্যান করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অনাস্থা যদি যাচাইযোগ্য প্রমাণের পরিবর্তে স্থায়ী রাজনৈতিক অবস্থানে পরিণত হয়, তবে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় শিক্ষার্থীদের।
কোরআন রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব সম্পর্কে কী নির্দেশ দেয়?
কোরআন মুমিনদের আল্লাহ, রাসুল (সা.) এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যকার দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষেরও।”
—সূরা আন-নিসা, ৪:৫৯
এই আয়াত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্তৃত্বের বৈধতা স্বীকার করে। সমাজে শৃঙ্খলা, আইন, নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য বৈধ কর্তৃপক্ষের আনুগত্য প্রয়োজন। কওমি মাদ্রাসাও রাষ্ট্রের ভৌগোলিক, আইনি ও নাগরিক কাঠামোর বাইরে নয়। এর শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই রাষ্ট্রের নাগরিক; ফলে তাদের শিক্ষা, নিরাপত্তা, অধিকার এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে।
কিন্তু ইসলামে আনুগত্য অন্ধ, শর্তহীন বা সীমাহীন নয়। একই আয়াতের পরবর্তী অংশে মতবিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশনার দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোরআন একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে আমানত যথাযথভাবে রক্ষা এবং মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচারের নির্দেশ দেয়: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দিতে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার করতে।”
—সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮
অতএব কোরআনিক শাসননীতিতে নাগরিকের দায়িত্ব আনুগত্য ও শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা; আর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ন্যায়, আমানতদারি, পরামর্শ, স্বচ্ছতা ও অধিকার সংরক্ষণ। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের আস্থা চায়, তাকে প্রথমে নিজের ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। একইভাবে ধর্মীয় নেতৃত্ব যদি স্বায়ত্তশাসন চায়, তাকেও দেখাতে হবে যে সেই স্বায়ত্তশাসন শিক্ষার্থীর অধিকার, জনস্বার্থ ও জবাবদিহি থেকে অব্যাহতির নাম নয়।
শূরা কোথায়?
কোরআন মুমিনদের এমন সমাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যাদের পারস্পরিক কাজ পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়—“তাদের কার্যাবলি পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়” (সূরা আশ-শূরা, ৪২:৩৮)। কওমি সংস্কার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র যদি আগে সিদ্ধান্ত নেয়, পরে আলেমদের কেবল অনুমোদনের জন্য ডাকে, তবে সেটি প্রকৃত শূরা নয়। আবার কয়েকজন প্রভাবশালী আলেমের মতামতকে হাজার হাজার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নারী মাদ্রাসা, অভিভাবক ও ছোট প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মত বলে ধরে নেওয়াও শূরার আদর্শ পূরণ করে না।
আস্থার জন্য প্রয়োজন প্রতিনিধিত্বমূলক ও দলিলভিত্তিক সংলাপ। কারা কওমি ধারার প্রতিনিধিত্ব করবেন, কীভাবে তাঁদের নির্বাচন করা হবে, নারী কওমি মাদ্রাসার কণ্ঠ কীভাবে যুক্ত হবে, শিক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষকের মতামত কীভাবে নেওয়া হবে—এসব আগেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বৈঠকের কার্যবিবরণী, খসড়া আইন, সংশোধনী প্রস্তাব এবং মতভেদের বিষয় প্রকাশ করা হলে গুজব ও সন্দেহ কমবে।
অনাস্থার দায় একপক্ষের নয়
কওমি নেতৃত্বের সন্দেহের জন্য শুধু তাদেরই দায়ী করা ন্যায়সংগত হবে না। রাষ্ট্র যখন কখনো কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেয়, আবার রাজনৈতিক চাপের মুখে তা প্রত্যাহার করে; কখনো পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের কথা বলে, আবার নির্বাচনী বা রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য শুধু সনদের স্বীকৃতিতে থেমে যায়—তখন রাষ্ট্রের নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এতে কওমি সমাজের ধারণা শক্তিশালী হয় যে শিক্ষা সংস্কারের আড়ালে অন্য রাজনৈতিক হিসাব থাকতে পারে।
অন্যদিকে সরকারি হস্তক্ষেপের অতীত আশঙ্কা দেখিয়ে বর্তমানের প্রতিটি মাননিশ্চয়তা উদ্যোগকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দেওয়াও দায়িত্বশীল অবস্থান নয়। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিশুসুরক্ষা বা কর্মদক্ষতা শিক্ষা ইসলামি শিক্ষার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং মানুষের কল্যাণে উপকারী জ্ঞান অর্জন, আমানত রক্ষা এবং যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন ইসলামী নৈতিকতার অংশ। পাঠ্যক্রমের স্বকীয়তা রক্ষার দাবি বৈধ; কিন্তু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সংকুচিত করার অধিকার কোনো নেতৃত্বের নেই।
আস্থার সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা
শুধু মৌখিক আশ্বাস দিয়ে এই অনাস্থা দূর করা সম্ভব নয়। “সরকার ধর্মীয় পাঠ্যক্রমে হস্তক্ষেপ করবে না”—এমন প্রতিশ্রুতি আইন ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোয় সুনির্দিষ্টভাবে সুরক্ষিত করতে হবে। প্রস্তাবিত জাতীয় কাঠামোয় তাই কয়েকটি নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন—
- কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আকিদা, আরবি ও মসলকভিত্তিক পাঠের একাডেমিক স্বাধীনতা আইনে সুরক্ষিত থাকবে;
- সাধারণ সক্ষমতা, শিক্ষার্থী-সুরক্ষা, সনদ ও আর্থিক স্বচ্ছতার বাইরে সরকার ধর্মীয় ব্যাখ্যা নির্ধারণ করবে না;
- জাতীয় পরিষদে কওমি আলেম ও বোর্ডগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু বহুমাত্রিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে;
- সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বাধীন আপিল ও বিচারিক প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকবে;
- খসড়া পাঠ্যক্রম, পরিদর্শন নির্দেশিকা ও মূল্যায়ন মানদণ্ড প্রকাশ্য হবে;
- সরকারি সহায়তা গ্রহণ না করলেও শিশুসুরক্ষা ও ন্যূনতম শেখার অধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না;
- রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে কাঠামো বদলে না যায়—এ জন্য সিদ্ধান্তের মেয়াদ, অপসারণ-পদ্ধতি ও ক্ষমতার সীমা আইনে নির্ধারিত হবে।
এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্র “নিয়ন্ত্রক প্রভু” নয়, বরং অধিকার ও মানের নিশ্চয়তাকারী অংশীদার হবে। কওমি বোর্ডও “জবাবদিহিহীন দ্বীপ” থাকবে না; ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করেই জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্বাস অর্জন করতে হয়
আস্থা কোনো গেজেট, বক্তৃতা বা বৈঠকের ছবি দিয়ে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় ধারাবাহিক আচরণ, প্রতিশ্রুতি পালন, ক্ষমতার সীমা মানা এবং বিরোধী মতকে সম্মান করার মাধ্যমে। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে সংস্কারের উদ্দেশ্য কওমি মাদ্রাসাকে দখল করা নয়, বরং শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত অধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ করা। কওমি নেতৃত্বকেও প্রমাণ করতে হবে যে স্বকীয়তা রক্ষার দাবি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা, সনদ-বাণিজ্য বা জবাবদিহি এড়ানোর আবরণ নয়।
রাষ্ট্রকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যেমন নীতিসঙ্গত নয়, তেমনি রাষ্ট্রের প্রতিটি উদ্যোগকে ষড়যন্ত্র ভাবাও সুস্থ নীতিবোধ নয়। কোরআনিক পথ হলো—সংবাদ ও দাবি যাচাই করা, ন্যায়বিচার করা, শূরার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া, আমানত রক্ষা করা এবং বিরোধেও সীমালঙ্ঘন না করা। আস্থা ও সতর্কতার এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত না হলে কওমি শিক্ষা সংস্কারের প্রতিটি নতুন উদ্যোগ পুরোনো সন্দেহের দেয়ালে আটকে যাবে। আর এই অচলাবস্থার মূল্য রাষ্ট্র বা শীর্ষ নেতৃত্ব নয়—দেবে কওমি মাদ্রাসার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
আস্থা বনাম অনাস্থার ফাদে যদি সংস্কার না হয়, তাহলে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ। একটি অসম ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির ঝুঁকি
কওমি শিক্ষা সংস্কার দীর্ঘদিন স্থগিত থাকলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে কয়েক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।
- জ্ঞানগত বৈষম্য: একই দেশের একদল শিশু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইংরেজি, ডিজিটাল জ্ঞান ও গবেষণায় এগোবে; অন্যদল প্রধানত ধর্মীয় জ্ঞানে গভীর হলেও আধুনিক পেশাগত দক্ষতায় সীমিত থাকবে। এতে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক অজ্ঞতা ও সামাজিক দূরত্ব বাড়তে পারে।
- কর্মসংস্থানের সংকীর্ণতা: কওমি সনদ মাস্টার্স সমমান পেলেও যদি স্নাতকদের ভাষা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতা না থাকে, তবে স্বীকৃতি বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপ নেবে না। তখন সনদ থাকবে, কিন্তু পেশার ক্ষেত্র মসজিদ, মাদ্রাসা বা সীমিত ধর্মীয় সেবাতেই আটকে থাকবে।
- সামাজিক মেরুকরণ: দুটি সম্পূর্ণ আলাদা শিক্ষাবিশ্বে বড় হওয়া তরুণেরা ইতিহাস, নাগরিকতা, রাষ্ট্র, নারী, বিজ্ঞান ও বহুত্ব সম্পর্কে ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। তাদের মধ্যে সংলাপের ভাষা কমে গেলে অবিশ্বাস, বিভাজন ও রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়তে পারে।
- শিক্ষক-শ্রমের শোষণ: জাতীয় শিক্ষকমান, বেতন কাঠামো ও প্রশিক্ষণ না থাকলে বহু শিক্ষক কম পারিশ্রমিক, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সীমিত পেশাগত উন্নয়নে আটকে থাকবেন। এই শ্রম-অবমূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত শিক্ষার মানকে দুর্বল করবে।
- রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অন্ধ অঞ্চল: কওমি মাদ্রাসার নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনা, শিশু সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং শ্রমবাজার নীতি অসম্পূর্ণ থাকবে।
কওমি শিক্ষা ধারার গুরুত্ব │জাতীয় শিক্ষা পরিসংখ্যানে কওমি শিক্ষার অংশ কত: একটি বড় তথ্যশূন্যতার হিসাব
বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার প্রকৃত আকার নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—দেশে বিপুলসংখ্যক কওমি শিক্ষার্থী থাকলেও জাতীয় শিক্ষা পরিসংখ্যানে তাদের স্তরভিত্তিক, বয়সভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। ফলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর কত শতাংশ কওমি ধারায় পড়ে—এ প্রশ্নের নির্ভুল সরকারি উত্তর বর্তমানে পাওয়া যায় না।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় সংসদে দেশে আনুমানিক ২৫ হাজার কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী থাকার কথা জানান। কিন্তু এই ৭০ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে কতজন নূরানি বা মক্তব, কতজন হিফজ, কতজন ইবতিদাইয়্যাহ, কতজন মাধ্যমিকসদৃশ স্তর এবং কতজন ফযিলত, দাওরায়ে হাদিস বা তাখাসসুস পর্যায়ে রয়েছে—সে বিভাজন প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে সরকারি স্বীকৃত আলিয়া মাদ্রাসায় মোট ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ১৯১ জন শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে। একই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকাশিত বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ব্যানবেইসের কাছে কওমি মাদ্রাসার হালনাগাদ পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই, কারণ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সরকারি শিক্ষা জরিপ ও নিবন্ধন কাঠামোর বাইরে।
প্রাথমিক স্তরে কওমি শিক্ষার্থীর হার কত?
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের Annual Primary School Statistics 2024 অনুযায়ী, প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী ছিল ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৮ জন। এই পরিসংখ্যানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি, উচ্চ মাদ্রাসাসংযুক্ত ইবতেদায়ি, এনজিও বিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কিন্তু কওমি মাদ্রাসার নূরানি, মক্তব, হিফজ ও ইবতিদাইয়্যাহ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আলাদা করে গণনা করা হয়নি। ফলে—বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরের মোট শিক্ষার্থীর কত শতাংশ কওমি মাদ্রাসায় পড়ে—বর্তমান সরকারি তথ্য দিয়ে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
৭০ লাখ কওমি শিক্ষার্থীর পুরো সংখ্যাকে প্রাথমিক শিক্ষার্থী ধরে ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজারের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না, কারণ ওই ৭০ লাখের মধ্যে শিশু থেকে দাওরায়ে হাদিস ও তাখাসসুস পর্যন্ত বিভিন্ন বয়স ও স্তরের শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এমন হিসাব করলে তা গুরুতর পরিসংখ্যানগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে।
মাধ্যমিক স্তরে কওমির অংশ কত?
বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কলেজ, কারিগরি, পেশাগত এবং শিক্ষকশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫১ হাজার ২২২ জন। এর বাইরে সরকারি স্বীকৃত আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ২৭ লাখ ৯৬ হাজার।
কিন্তু কওমি ব্যবস্থার মুতাওয়াসসিতাহ, সানাবিয়্যাহ আম্মাহ ও সানাবিয়্যাহ খাসসাহ পর্যায়ে কত শিক্ষার্থী আছে, তার কোনো জাতীয়ভাবে যাচাইকৃত সংখ্যা নেই। তাই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কওমির শতকরা অংশও নির্ধারণযোগ্য নয়।
এখানে আরেকটি পদ্ধতিগত সমস্যা রয়েছে। কওমি মাদ্রাসার শ্রেণি ও বয়স কাঠামো সব বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানে অভিন্ন নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের একটি স্তর সাধারণ শিক্ষার ষষ্ঠ–অষ্টম শ্রেণির কাছাকাছি হতে পারে, আবার অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠকাল, বয়স ও গ্রন্থভিত্তিক অগ্রগতি ভিন্ন হতে পারে। ফলে শুধু শ্রেণির নাম মিলিয়ে জাতীয় মাধ্যমিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করাও যথেষ্ট নয়।
উচ্চশিক্ষায় কওমি শিক্ষার্থীর অংশ কত?
দাওরায়ে হাদিসের সনদকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবিতে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান দেওয়া হলেও কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সব উচ্চতর শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চশিক্ষা পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্দিষ্ট উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রকাশ করে; কিন্তু কওমি ফযিলত, দাওরায়ে হাদিস, ইফতা ও অন্যান্য তাখাসসুস শিক্ষার্থীর সমন্বিত জাতীয় সংখ্যা পৃথকভাবে প্রকাশিত নয়। ইউজিসির সর্বশেষ প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক প্রতিবেদনও ২০২৩ সালের উচ্চশিক্ষা তথ্যকে কেন্দ্র করে। সুতরাং— বাংলাদেশের মোট উচ্চশিক্ষার্থী জনসংখ্যার মধ্যে কওমি শিক্ষার্থীর শতাংশও বর্তমানে নির্ভরযোগ্যভাবে গণনা করা যায় না।
আইনগত সমমান এবং পরিসংখ্যানগত অন্তর্ভুক্তি এক বিষয় নয়। কোনো সনদ মাস্টার্স সমমান পেলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা যদি জাতীয় উচ্চশিক্ষা তথ্যব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠান, স্তর, বয়স ও লিঙ্গভিত্তিকভাবে অন্তর্ভুক্ত না হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষায় তাদের প্রকৃত অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।
আলিয়া ও কওমি শিক্ষার্থীর আনুমানিক তুলনা
বর্তমানে উপলভ্য দুটি বৃহৎ অঙ্ক হলো—
|
ধারা |
শিক্ষার্থীসংখ্যা |
তথ্যের প্রকৃতি |
|
কওমি মাদ্রাসা |
প্রায় ৭০ লাখ |
২০২৬ সালের সংসদীয় বক্তব্যভিত্তিক আনুমানিক সংখ্যা |
|
আলিয়া মাদ্রাসা |
২৭,৯৬,১৯১ |
ব্যানবেইস ২০২৪-এর নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংখ্যা |
এই অঙ্ক দুটি সরাসরি তুলনা করলে কওমি ও আলিয়ার আনুমানিক শিক্ষার্থী অনুপাত দাঁড়ায়:
কওমি : আলিয়া ≈ ২.৫০ : ১
অর্থাৎ প্রতি একজন আলিয়া শিক্ষার্থীর বিপরীতে আনুমানিক আড়াইজন কওমি শিক্ষার্থী রয়েছে।
দুটি ধারাকে একত্রে মোট মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ধরা হলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় আনুমানিক ৯৭ লাখ ৯৬ হাজার ১৯১ জন। সেই হিসাবে—
- কওমি শিক্ষার্থীর আনুমানিক অংশ: ৭১.৪৬ শতাংশ
- আলিয়া শিক্ষার্থীর আনুমানিক অংশ: ২৮.৫৪ শতাংশ
অর্থাৎ মোট মাদ্রাসা শিক্ষার্থীসমাজের প্রায় সাতজনের মধ্যে পাঁচজন কওমি ধারায় এবং প্রায় দুজন আলিয়া ধারায় রয়েছে—এমন একটি আনুমানিক চিত্র পাওয়া যায়। তবে এই হিসাবকে official comparable ratio বলা যাবে না। কারণ—
- আলিয়ার সংখ্যা ২০২৪ সালের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জরিপ থেকে এসেছে;
- কওমির সংখ্যা ২০২৬ সালের একটি সামগ্রিক অনুমান;
- কওমি সংখ্যায় মক্তব, নূরানি, হিফজ, কিতাব বিভাগ ও উচ্চতর বিশেষায়ন একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে;
- একই শিক্ষার্থী একাধিক বিভাগে তালিকাভুক্ত হয়েছে কি না, তা জানা যায় না;
- প্রতিষ্ঠান ও বোর্ডভিত্তিক duplicate record যাচাই করা হয়নি;
- বয়স ও শ্রেণির সমতা নিশ্চিত নয়।
অতএব ৭১.৪৬ শতাংশকে পরিকল্পনামূলক আনুমানিক অংশ বলা যায়, কিন্তু চূড়ান্ত জাতীয় পরিসংখ্যান নয়।
জাতীয় শিক্ষার্থীসংখ্যায় কওমির সামগ্রিক অংশ কত?
এই প্রশ্নেরও নির্ভুল উত্তর দেওয়ার জন্য একই বছরের একটি সমন্বিত denominator প্রয়োজন। অর্থাৎ একই বছরে—
- প্রাথমিক;
- মাধ্যমিক;
- উচ্চমাধ্যমিক;
- কারিগরি;
- আলিয়া;
- বিশ্ববিদ্যালয়;
- পেশাগত শিক্ষা;
- কওমি—
সব শিক্ষার্থীর unique headcount প্রয়োজন।
বর্তমানে কওমির ৭০ লাখ একটি all-level estimate, অথচ অন্যান্য ধারার সংখ্যা প্রতিষ্ঠান ও স্তরভিত্তিক। এগুলো সরাসরি যোগ করলে একই শিক্ষার্থী দুইবার গণনা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো কওমি শিক্ষার্থী একই সঙ্গে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, আলিয়া বা সাধারণ শিক্ষার পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। আবার মক্তবের শিশু সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ভর্তি থাকতে পারে। তাই জাতীয় শিক্ষার্থীসংখ্যার মধ্যে কওমির সুনির্দিষ্ট শতাংশ এখনই প্রকাশ করা পদ্ধতিগতভাবে সঠিক হবে না।
তবে ৭০ লাখের সরকারি অনুমান সত্যের কাছাকাছি হলে এটি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে কওমি শিক্ষা বাংলাদেশের কোনো ক্ষুদ্র প্রান্তিক ধারা নয়; বরং শিক্ষার্থীসংখ্যার বিচারে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা উপব্যবস্থা।
পরিসংখ্যানগত সিদ্ধান্ত: যা বলা যায় এবং যা বলা যায় না
|
প্রশ্ন |
নির্ভরযোগ্য উত্তর |
|
প্রাথমিক স্তরে কওমির শতাংশ |
নির্ধারণ করা যায় না; স্তরভিত্তিক কওমি তথ্য নেই |
|
মাধ্যমিক স্তরে কওমির শতাংশ |
নির্ধারণ করা যায় না |
|
উচ্চশিক্ষায় কওমির শতাংশ |
নির্ধারণ করা যায় না |
|
জাতীয় মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে কওমির অংশ |
নির্ধারণযোগ্য নয় |
|
কওমি বনাম আলিয়া শিক্ষার্থী অনুপাত |
আনুমানিক ২.৫০ : ১ |
|
মোট মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মধ্যে কওমির অংশ |
আনুমানিক ৭১.৪৬% |
|
মোট মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মধ্যে আলিয়ার অংশ |
আনুমানিক ২৮.৫৪% |
|
হিসাবের নির্ভরযোগ্যতা |
সীমিত; ভিন্ন বছর ও ভিন্ন তথ্যপদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল |
এই তথ্যশূন্যতা কেন একটি জাতীয় নীতিগত সংকট
একটি শিক্ষাব্যবস্থায় আনুমানিক ৭০ লাখ শিক্ষার্থী থাকলেও যদি জানা না যায় তাদের কতজন শিশু, কতজন কিশোর, কতজন নারী, কতজন প্রতিবন্ধী, কতজন আবাসিক, কতজন ঝরে পড়ছে এবং কতজন উচ্চশিক্ষায় পৌঁছাচ্ছে—তাহলে রাষ্ট্র কার্যত তার একটি বৃহৎ শিক্ষার্থীসমাজকে পরিকল্পনার বাইরে রাখছে।
এর ফলে সরকার নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে পারে না—
- কোথায় কত শিক্ষক প্রয়োজন;
- কোন বয়সে কতজন শিশু কওমিতে প্রবেশ করছে;
- প্রাথমিক শিক্ষার শিখনফল কতটা অর্জিত হচ্ছে;
- কওমি থেকে সাধারণ বা কারিগরি শিক্ষায় স্থানান্তরের হার কত;
- কতজন দাওরায়ে হাদিসে পৌঁছায়;
- কতজন কর্মসংস্থানে প্রবেশ করে;
- কতজন শিক্ষার্থী দ্বৈতভাবে তালিকাভুক্ত;
- নারী ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অংশ কত;
- কোন প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও আবাসন ঝুঁকি বেশি;
- শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারি ও বেসরকারি ব্যয় কত।
এটি শুধু পরিসংখ্যানের ঘাটতি নয়; এটি শিক্ষা পরিকল্পনা, বাজেট, শিশুর অধিকার এবং জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের শূন্যতা।
প্রস্তাবিত জাতীয় কওমি শিক্ষা শুমারি
এই সংকট দূর করতে ব্যানবেইস, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, আল-হাইআতুল উলয়া, বেফাক ও অন্যান্য কওমি বোর্ডের অংশগ্রহণে একটি National Qawmi Education Census পরিচালনা করা জরুরি। এতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্তত সংগ্রহ করতে হবে—
- প্রতিষ্ঠান ও বোর্ডের নাম;
- আইনগত ও পরিচালনাগত পরিচয়;
- স্তরভিত্তিক শিক্ষার্থী;
- বয়স ও লিঙ্গ;
- আবাসিক ও অনাবাসিক অবস্থা;
- হিফজ, নূরানি ও কিতাব বিভাগের পৃথক সংখ্যা;
- শিক্ষকসংখ্যা ও যোগ্যতা;
- প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী;
- ঝরে পড়া ও স্থানান্তর;
- পরীক্ষার্থী ও উত্তীর্ণ;
- উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে অগ্রগতি।
কওমি শিক্ষাকে জাতীয় শিক্ষা পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা মানে তার ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং দেশের লাখো শিক্ষার্থীকে দৃশ্যমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
কওমি শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন না হওয়া কি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে?
পূর্ণাঙ্গভাবে বলা যায়, ২০১৩ সালের খসড়া আইনটি কার্যকর হলে সব সমস্যা সমাধান হতো—এমন নিশ্চয়তা নেই। আইনটির প্রতিনিধিত্ব, স্বাধীনতা ও সরকারি ক্ষমতার সীমা আরও পর্যালোচনা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আইন প্রত্যাহারের পরে কার্যকর বিকল্প কাঠামো গড়ে না ওঠায় রাষ্ট্র কয়েকটি বড় সুযোগ হারিয়েছে।
- জাতীয় কওমি শিক্ষা তথ্যভান্ডার তৈরি হয়নি;
- সব স্তরের অভিন্ন সংজ্ঞা ও শিখনফল নির্ধারিত হয়নি;
- শিক্ষক প্রশিক্ষণের জাতীয় ব্যবস্থা হয়নি;
- শিশু ও নারী মাদ্রাসার সুরক্ষা মান প্রতিষ্ঠিত হয়নি;
- বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সাধারণ দক্ষতার ন্যূনতম কাঠামো বাধ্যতামূলক হয়নি;
- প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার কোনো গ্রহণযোগ্য accreditation ব্যবস্থা তৈরি হয়নি;
- দাওরায়ে হাদিসের নিচের স্তরগুলোর সনদ-সেতু ও উচ্চশিক্ষার পথ অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
তাই আইনটি না হওয়ায় শুধু সরকার নিয়ন্ত্রণ হারায়নি; রাষ্ট্র লাখো শিক্ষার্থীর শিক্ষা-অধিকার নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগও হারিয়েছে।
রাষ্ট্র কেন বারবার পিছিয়ে যায়?
রাষ্ট্রের পশ্চাদপসরণের পেছনে চারটি কারণ বিশেষভাবে কাজ করেছে।
- প্রথমত, সংঘাতের আশঙ্কা। আইনবিরোধী আন্দোলন, রক্তপাত বা গৃহযুদ্ধের ভাষা রাজনৈতিক ব্যয় বাড়ায়।
- দ্বিতীয়ত, প্রতিনিধিত্বের অনিশ্চয়তা। একটি পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করলে অন্য পক্ষ বিরোধিতা করে।
- তৃতীয়ত, নির্বাচনী রাজনীতি। বৃহৎ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বিরোধিতা নেওয়ার ঝুঁকি সরকার এড়াতে চায়।
- চতুর্থত, পরিষ্কার নীতিদর্শনের অভাব। সরকার ঠিক করেনি—কওমি শিক্ষা কি সম্পূর্ণ স্বাধীন ধর্মীয় ব্যবস্থা, publicly accountable parallel system, নাকি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অংশ।
এই অস্পষ্টতা থাকলে প্রতিটি সরকার সংকট এলে আপস করবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরি করবে না।
সমাধান: নিয়ন্ত্রণ নয়, সাংবিধানিক জবাবদিহিসহ সহ-শাসন
কওমি শিক্ষার সংস্কার সরকারি দখলদারি দিয়ে সফল হবে না। আবার সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাধীনতাও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন co-governance বা সহ-শাসনভিত্তিক কাঠামো।
একটি নতুন বাংলাদেশ কওমি শিক্ষা উন্নয়ন ও মাননিশ্চিতকরণ পরিষদ গঠন করা যেতে পারে, যেখানে—
- সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য হবেন বিভিন্ন কওমি বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানের আলেম;
- নারী কওমি মাদ্রাসার বাধ্যতামূলক প্রতিনিধিত্ব থাকবে;
- শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকবে;
- শিক্ষা, শিশুসুরক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞ থাকবেন;
- রাষ্ট্রের প্রতিনিধি সীমিত ও সংজ্ঞায়িত ভূমিকা পালন করবেন;
- চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচন হবে স্বচ্ছ মনোনয়ন ও নির্দিষ্ট মেয়াদে;
- সিদ্ধান্ত, বাজেট ও প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
রাষ্ট্র ধর্মীয় নেসাব নির্ধারণ করবে না। কিন্তু রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে—
- শিশুর নিরাপত্তা;
- ন্যূনতম বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও ডিজিটাল শিক্ষা;
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ;
- নির্যাতনবিরোধী নীতি;
- আর্থিক স্বচ্ছতা;
- সনদের মান;
- উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে প্রবেশপথ।
কওমি প্রতিষ্ঠান নিজের ধর্মীয় পরিচয়, উচ্চতর কিতাব, আধ্যাত্মিক অনুশাসন ও প্রতিষ্ঠান সংস্কৃতি সংরক্ষণ করবে।
শেষ কথা: স্বাধীনতা কার—প্রতিষ্ঠানের, না শিশুরও?
কওমি মাদ্রাসা ব্যক্তির খেয়ালখুশির প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। ব্যক্তি জমি দিতে পারেন, অর্থ দিতে পারেন, প্রতিষ্ঠাতা হতে পারেন; কিন্তু কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ সীমিত করার নৈতিক বা ধর্মীয় অধিকার তাঁর নেই।
শিক্ষা একটি আমানত। কোরআনের শিক্ষা জ্ঞান, ন্যায় ও কল্যাণের পক্ষে; অজ্ঞতা, শোষণ বা দায়িত্বহীন স্বাধীনতার পক্ষে নয়। তাই কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা রক্ষা করতে হবে, কিন্তু সেই স্বকীয়তার কেন্দ্র হতে হবে শিক্ষার্থীর কল্যাণ—কোনো ব্যক্তির কর্তৃত্ব নয়।
সংস্কারবিরোধিতাকে ধর্মরক্ষা এবং জবাবদিহিকে সরকারি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। একইভাবে রাষ্ট্রকেও কওমি শিক্ষাকে রাজনৈতিক দর-কষাকষির ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার না করে জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
কওমি শিক্ষার প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তার শিক্ষার্থী ধর্মীয় জ্ঞানে গভীর, আধুনিক দক্ষতায় সক্ষম, নাগরিক মর্যাদায় সমান এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্বাচনে স্বাধীন হবে।
আগামী পর্বে: আড়াই শতাব্দীর মাদ্রাসা শিক্ষা: রাষ্ট্র কি এবার বিমাতাসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে? জাতীয়করণ, এমপিও, অর্থায়ন, শিক্ষক মর্যাদা, অবকাঠামো, দক্ষতাভিত্তিক পাঠক্রম ও ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের অবসান হবে কবে?│আড়াই শতাব্দী পরও আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা কেন জাতীয়করণ, এমপিও, শিক্ষক মর্যাদা ও আধুনিক শিক্ষায় পিছিয়ে—বৈষম্য ও সংস্কারের পথ নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#কওমি_মাদ্রাসা #মাদ্রাসা_শিক্ষা #কওমি_শিক্ষা_সংস্কার #শিক্ষা_সংস্কার #বাংলাদেশের_শিক্ষা #অধিকারপত্র #শিক্ষা_নীতি #কওমি_শিক্ষার্থী #আলেম_সমাজ #দাওরায়ে_হাদিস #মাদ্রাসা_আধুনিকায়ন #দক্ষতাভিত্তিক_শিক্ষা #শিক্ষক_প্রশিক্ষণ #কর্মসংস্থান #ডিজিটাল_শিক্ষা #ফ্রিল্যান্সিং #GCC_কর্মসংস্থান #শিশুসুরক্ষা #PSEA #মাননিশ্চিতকরণ #শিক্ষায়_সমতা #সামাজিক_সংহতি #মানবসম্পদ_উন্নয়ন #ReformationByUsForUs #EducationReform #QawmiMadrasa #BangladeshEducation

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: