অধিকারপত্র বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা ও নীল দলের শিক্ষকরা একই রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেননি। তবে গণমাধ্যমের নথিতে দেখা যায়, উভয় পক্ষই শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি, আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি, হত্যাকাণ্ড ও হামলার বিচার এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ চেয়েছিল। ‘প্রত্যয়’ পেনশনবিরোধী আন্দোলনেও তাঁরা একই পেশাগত মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন। তাহলে ৫ আগস্টের পর কেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি গোটা শিক্ষকগোষ্ঠীকে ‘দোসর’ বা সমষ্টিগতভাবে দায়ী করার প্রবণতা তৈরি হলো? নথি, বক্তব্য ও সংবাদচিত্রের ভিত্তিতে সেই দ্বৈতনীতি, সহাবস্থান ও বদলে যাওয়া ক্ষমতার রাজনীতি অনুসন্ধান করেছে এই প্রতিবেদন।
ডিসক্লেইমার
প্রতিবেদনটি ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিডিওচিত্রের স্ক্রিনশট, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সংগঠনগুলোর প্রকাশ্য বক্তব্য এবং ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল ও সাদা দলের কর্মসূচি-সংক্রান্ত নথির ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের ফৌজদারি, প্রশাসনিক, নৈতিক কিংবা রাজনৈতিক দায় নির্ধারণ অথবা কাউকে দায়মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত নয়। প্রতিবেদনের লক্ষ্য হলো জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজের ঐক্য–অনৈক্য, পারস্পরিক সহাবস্থান, পেশাগত আন্দোলন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি বিভিন্ন শিক্ষকগোষ্ঠীর অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে শিক্ষক-সম্পর্কে সৃষ্ট বিভাজনের প্রকৃতি অনুসন্ধান করা।
প্রতিবেদনে দলীয় বা আদর্শিক পরিচয়কে কোনো ব্যক্তির অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ব্যক্তির দায় ও সংগঠনের রাজনৈতিক পরিচয় পৃথক রাখা হয়েছে। উদ্ধৃত অভিযোগ, মতামত ও মূল্যায়ন সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপিত; এগুলো আদালত বা নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। যেসব দাবির স্বাধীন সমর্থনে পর্যাপ্ত নথি পাওয়া যায়নি, সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়—অভিযোগ, পর্যবেক্ষণ বা অনুসন্ধানযোগ্য প্রশ্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত অসংগতি থাকলে অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের বক্তব্য অনুপস্থিত থাকলে, যাচাইযোগ্য নথিসহ তাঁদের ব্যাখ্যা, প্রতিবাদ ও সংশোধন প্রকাশের সুযোগ থাকবে। এই অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য কাউকে অভিযুক্ত বা নির্দোষ ঘোষণা করা নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যায়বিচার, একাডেমিক স্বাধীনতা, সহনশীলতা, পেশাগত মর্যাদা এবং সব মতের শিক্ষকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনা।
‘প্রত্যয়’ আন্দোলনে ঐক্য শিক্ষকসমাজকে বিজয়ী করেছিল। পরবর্তী অনৈক্য যদি তাঁদের দুর্বল করে, তাহলে সেই দুর্বলতার সুবিধাভোগী কারা—এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা এখন জরুরি। কেননা যাঁরা জুলাইয়ে বিরোধী মত প্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করেছেন, তাঁরা ক্ষমতার বিন্যাস বদলের পর ভিন্নমতের সহকর্মীদের একই অধিকার দিয়েছেন কি? যাঁরা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিজেদের কর্মসূচি বন্ধ করাকে অন্যায় মনে করতেন, তাঁরা কি পরবর্তী সময়ে অন্য রাজনৈতিক বা আদর্শিক পরিচয়ের শিক্ষককে কেবল তাঁর মতাদর্শের ভিত্তিতে সন্দেহ, বর্জন কিংবা শাস্তির মুখে ঠেলে দিয়েছেন? যাঁরা জুলাইয়ে শিক্ষকসমাজের ঐক্যের কথা বলেছেন, তাঁরা কি আগস্টের পর সেই শিক্ষকসমাজকে বিজয়ী ও পরাজিত শিবিরে ভাগ করেছেন?
যদি কোনো শিক্ষককে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়াই শুধু তাঁর দলীয় পরিচয়, অতীত রাজনৈতিক অবস্থান বা অনুমিত মতাদর্শের কারণে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা, পরীক্ষা, তত্ত্বাবধান কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেটি ন্যায়বিচার নয়। সেটি হবে রাজনৈতিক প্রতিশোধের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
অপরাধ বা পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ অবশ্যই তদন্ত করা যাবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় নিজে কোনো অপরাধ নয়। ব্যক্তিগত দায় প্রমাণের বদলে একটি গোটা মতাদর্শিক গোষ্ঠীকে সমষ্টিগতভাবে দায়ী করা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারনীতি, প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার এবং একাডেমিক স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জুলাই ২০২৪: নীল দল ও সাদা দল কি পরস্পরের প্রতিপক্ষ ছিল, নাকি সংকটের ভিন্ন ভাষ্যকার?
বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদপ্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী নীল দল ও বিএনপিপন্থী সাদা দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও দায় নির্ধারণের ভাষায় সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল। তবে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কর্মসূচিতে বাধা কিংবা প্রত্যক্ষ ‘পারস্পরিক আক্রমণর’ প্রমাণ এই তিন প্রতিবেদনে পাওয়া যায় না। বরং উভয় পক্ষই শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রাণহানি ও তদন্তের কথা বলেছে—যদিও সংকটের কারণ এবং সরকারের দায় নিয়ে তাদের অবস্থান ছিল ভিন্ন।
৭ জুলাই: সরকার তখন ‘পর্যবেক্ষক’, সমাধানের সময় অনির্দিষ্ট
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে দুটি আন্দোলন পাশাপাশি চলছিল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ স্কিম বাতিলের দাবিতে কর্মবিরতিতে ছিলেন। একই সময়ে শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন।
৭ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সরকার শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের আন্দোলন “গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ” করছে এবং যথাসময়ে সমস্যার সমাধান হবে। শিক্ষকদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানান; কিন্তু বৈঠক কখন হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় দেননি।
কোটা প্রশ্নে সরকারের অবস্থান ছিল কিছুটা দূরত্ব রক্ষার। ওবায়দুল কাদের বলেন, শিক্ষার্থীরা যে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, সেটি সরকারের নয়; আদালতের সিদ্ধান্ত। বিষয়টি বিচারাধীন হওয়ায় সরকারের কথা বলার সুযোগ সীমিত—এমন ব্যাখ্যা তিনি সামনে আনেন।
একই বক্তব্যে তিনি বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর বিরুদ্ধে কোটা ও পেনশন আন্দোলনের ওপর “ভর” করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষায়, বিরোধীরা নিজেরা আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে অন্যদের আন্দোলনের সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এই বক্তব্য থেকে সরকারের তিন স্তরের অবস্থান বোঝা যায়:
- ১. সরকার আন্দোলন দুটিকে তখনো সরাসরি দমন বা প্রত্যাখ্যানের ভাষায় ব্যাখ্যা করেনি; “পর্যবেক্ষণ” ও ভবিষ্যৎ সমাধানের কথা বলেছে।
- ২. কোটা সংকটের প্রত্যক্ষ দায় আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর স্থানান্তর করার চেষ্টা করেছে।
- ৩. আন্দোলনের রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোকে অভিযুক্ত করেছে।
এই তৃতীয় অবস্থানটিই পরবর্তী সময়ে সাদা দলের ভাষ্যের সঙ্গে সরকারের সবচেয়ে বড় বিরোধ তৈরি করে।
১৫ জুলাই: সাদা দলের অবস্থানে সরাসরি সরকার ও ছাত্রলীগের সমালোচনা
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ ওঠার পর সাদা দল প্রকাশ্যে নিন্দা জানায়। সাদা দলের বিবৃতিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি “ন্যায্য ও যৌক্তিক” বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। সংগঠনটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রত্যাশী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কে করা মন্তব্যেরও প্রতিবাদ জানায়।
এখানে সাদা দলের অবস্থান সরকারের অবস্থান থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা।
সরকার ৭ জুলাই আন্দোলনকে পর্যবেক্ষণ এবং আদালতের এখতিয়ার হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সাদা দল ১৫ জুলাই সংকটটিকে আর শুধু বিচারাধীন কোটা–প্রশ্ন হিসেবে দেখেনি। তাদের ভাষ্যে এটি হয়ে ওঠে আন্দোলনকারীদের ওপর দলীয় ছাত্রসংগঠনের হামলা, সরকারের অসংবেদনশীলতা এবং তরুণ প্রজন্মকে বিভক্ত করার রাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন।
তবে সাদা দলের বিবৃতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভারসাম্যও দেখা যায়। তারা মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে প্রত্যাখ্যান করেনি। বরং মুক্তিযুদ্ধকে “অহংকার ও শ্রেষ্ঠ অর্জন” এবং মুক্তিযোদ্ধাদের “জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান” হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের আপত্তি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানের নামে তরুণ প্রজন্মকে বিভক্ত করা এবং কোটা প্রশ্নকে রাজনৈতিক মেরুকরণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে।
অর্থাৎ সাদা দল সরকারের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রাজনৈতিক ভাষ্যের বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা দাঁড় করায়নি; একই ঐতিহাসিক অর্জনকে ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে স্থাপন করেছে।
৩ আগস্ট: নীল দলের ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন
৩ আগস্ট নীল দল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করে। কর্মসূচির ঘোষিত বিষয় ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ড, শিক্ষার্থী–শিক্ষকদের ওপর হামলা, নাশকতা ও ধ্বংসযজ্ঞের বিচার।
এই কর্মসূচিতে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কেবল একাডেমিক সংকট হিসেবে না দেখে “জাতীয় সংকট” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্থবিরতা থেকে এই সংকট তৈরি হয়েছে এবং তা সমাধানের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নিতে হবে। এই বক্তব্য কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
- প্রথমত, সরকার তখন পর্যন্ত সংকটকে পর্যবেক্ষণ, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার আলোকে ব্যাখ্যা করছিল। অথচ আওয়ামীপন্থী নীল দলের কর্মসূচিতে সংকটটির রাজনৈতিক প্রকৃতি স্বীকার করা হয়।
- দ্বিতীয়ত, নীল দল শুধু নাশকতা বা ধ্বংসযজ্ঞের বিচার চায়নি; “সব হত্যা” এবং “শিক্ষার্থী–শিক্ষকদের ওপর হামলার” বিচার দাবি করেছে। এর অর্থ, তাদের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যে প্রাণহানি ও হামলার বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়নি।
- তৃতীয়ত, অধ্যাপক আখতারুজ্জামান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ন্যায্যতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কীভাবে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা করতে হয়, শিক্ষার্থীরা তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন।
- চতুর্থত, নীল দলের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে ক্যাম্পাসে স্বাধীন মতপ্রকাশ, নির্যাতন–নিপীড়ন বন্ধ, আবাসিক হলের পরিবেশ উন্নয়ন, সব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি ছিল।
এসব বক্তব্য তৎকালীন সরকারের সরল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের অনুলিপি ছিল না। নীল দল সরকারের রাজনৈতিক ধারার কাছাকাছি থাকলেও ৩ আগস্ট তারা সরকারের কাছেই সংলাপের উদ্যোগ, তদন্ত, বিচার এবং মতপ্রকাশের নিরাপত্তা দাবি করেছে।
নীল ও সাদা দলের অবস্থানের মিল কোথায়?
তিনটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে অন্তত চারটি বিষয়ে দুই দলের মধ্যে আংশিক অভিন্নতা দেখা যায়।
|
বিষয় |
সাদা দলের অবস্থান |
নীল দলের অবস্থান |
|---|---|---|
|
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন |
ন্যায্য ও যৌক্তিক |
নিয়মতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃতি |
|
হামলা ও প্রাণহানি |
ছাত্রলীগের হামলার নিন্দা; শাস্তির দাবি |
সব হত্যা ও শিক্ষার্থী–শিক্ষকদের ওপর হামলার তদন্ত ও বিচার |
|
সংকটের সমাধান |
আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে কার্যকর ব্যবস্থা |
জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক সংলাপ |
|
মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্ন |
মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা স্বীকার |
রাজনৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধপন্থী অবস্থান |
উভয় পক্ষই শিক্ষার্থীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি। উভয় পক্ষই সহিংসতা, প্রাণহানি এবং তদন্তের কথা বলেছে। উভয় পক্ষই সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে—যদিও ব্যবহৃত ভাষা এবং দায় নির্ধারণের ধরন আলাদা ছিল।
মূল পার্থক্য: দায় কার এবং বিচার কীভাবে?
দুই দলের সবচেয়ে বড় পার্থক্য ছিল দায় নির্ধারণে।
সাদা দল ১৫ জুলাইয়ের হামলার জন্য সরাসরি ছাত্রলীগকে দায়ী করেছে। তারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেছে এবং সরকারের কাছে আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের ভাষা ছিল সরাসরি, প্রতিবাদী এবং সরকারকে জবাবদিহির মুখোমুখি করার মতো।
নীল দল ৩ আগস্ট সব হত্যা ও হামলার বিচার চাইলেও প্রতিবেদনে ছাত্রলীগ, পুলিশ অথবা সরকারকে সরাসরি দায়ী করার ভাষা পাওয়া যায় না। পাশাপাশি তারা “নাশকতা ও ধ্বংসযজ্ঞের” বিচারের কথাও বলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিপথে পরিচালিত করার অভিযোগ করেন।
অর্থাৎ সাদা দলের ভাষ্যে রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের দায় ছিল প্রধান; নীল দলের ভাষ্যে দায় ছিল বহুপক্ষীয়—হত্যা ও হামলার পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষ, নাশকতা ও ধ্বংসযজ্ঞও তাদের বিবেচনায় ছিল।
এই ব্যবধানই দুই দলের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
পরস্পরের বিরুদ্ধে কি ‘পারস্পরিক আক্রমণ’ হয়েছিল?
পর্যালোচিত তিনটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এর উত্তর: প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় না। সাদা দল তাদের বিবৃতিতে সরকার, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ছাত্রলীগের ভূমিকার সমালোচনা করেছে; কিন্তু নীল দলকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক আক্রমণের তথ্য প্রতিবেদনে নেই। একইভাবে নীল দলের মানববন্ধনে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা, নাশকতা এবং ধ্বংসযজ্ঞের কথা বলা হলেও সাদা দলকে সরাসরি দায়ী বা আক্রমণ করার বিবরণ নেই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ, তিনটি প্রতিবেদনে পাওয়া যায় না—
- এক দল অন্য দলের কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে;
- এক পক্ষ অন্য পক্ষের শিক্ষকদের শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছে;
- পাল্টাপাল্টি ব্যক্তিগত অপমান করেছে;
- বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অন্য পক্ষের কর্মসূচি বন্ধের দাবি জানিয়েছে;
- মতাদর্শের কারণে কোনো শিক্ষককে ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার বা একাডেমিক দায়িত্ব থেকে সরানোর দাবি তুলেছে।
সুতরাং রাজনৈতিক অবস্থানের তীব্র পার্থক্য ছিল, কিন্তু এই দলিলগুলোর সীমার মধ্যে তাকে পারস্পরিক পারস্পরিক আক্রমণ বা শিক্ষক–শিক্ষক সংঘর্ষ বলা যাবে না।
তবে এখানে অনুসন্ধানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনটি সংবাদ পুরো জুলাই মাসের প্রতিটি বিবৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, সভা বা ব্যক্তিগত বক্তব্য ধারণ করে না। তাই “কোনো পর্যায়েই কোনো পারস্পরিক আক্রমণ হয়নি”—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও শুধু এগুলোর ওপর ভিত্তি করে দেওয়া সম্ভব নয়। যথার্থ সিদ্ধান্তের জন্য উভয় দলের সব বিবৃতি, কর্মসূচির ভিডিও, শিক্ষক সমিতির কার্যবিবরণী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পরীক্ষা করা দরকার।
তৎকালীন সরকারের সঙ্গে দুই দলের সম্পর্ক
সাদা দলের অবস্থান ছিল সরকারের বিপরীতে। তারা আন্দোলনকারীদের দাবি সমর্থন করেছে, ছাত্রলীগকে হামলার জন্য দায়ী করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে এটি ছিল সরকারের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টিকারী অবস্থান।
নীল দলের সম্পর্ক ছিল অধিকতর জটিল। সংগঠনটি আদর্শিকভাবে আওয়ামী লীগপন্থী এবং এর নেতাদের অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতির দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু ৩ আগস্টের কর্মসূচিতে তারা শুধু সরকারের অবস্থান পুনরাবৃত্তি করেনি। জাতীয় সংলাপ, সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, স্বাধীন মতপ্রকাশ, নির্যাতন বন্ধ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের নিরাপত্তার দাবি তৎকালীন সরকার ও প্রশাসনের প্রতিও সমালোচনামূলক চাপ তৈরি করেছিল।
অন্যদিকে, নীল দলের বক্তব্যে সরকারের প্রত্যক্ষ দায় নির্ধারণ অনুপস্থিত ছিল এবং “তৃতীয় পক্ষ”, “নাশকতা” ও “ধ্বংসযজ্ঞের” প্রসঙ্গ সরকারি ভাষ্যের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। তাই নীল দলকে এককথায় সরকারের বিরোধী কিংবা সরকারের নিঃশর্ত প্রতিরক্ষাকারী—কোনোটিই বলা যথার্থ হবে না। তাদের অবস্থান ছিল সরকারঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পরিসরের ভেতর থেকে সংকট সমাধান, তদন্ত ও সংলাপের দাবি। সাদা দলের অবস্থান ছিল সরকারের বাইরে থেকে সরাসরি দায়, প্রতিবাদ ও পরিবর্তনের দাবি।
তৎকালীন মিডিয়া অনুসন্ধানের ফলাফল
জুলাই ২০২৪-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দল ও সাদা দল একই রাজনৈতিক জায়গায় ছিল না। ছাত্রলীগের ভূমিকা, সরকারের দায়, তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততা এবং সংকটের রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় তাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ছিল।
কিন্তু তিনটি প্রতিবেদন আরেকটি বাস্তবতাও তুলে ধরে: মতাদর্শগত বিভাজন সত্ত্বেও দুই দলই শিক্ষার্থীদের দাবি ও প্রাণহানির বিষয়কে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি। উভয়েই বিচার, তদন্ত ও সমাধানের কথা বলেছে। ভাষা, দায় নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য আলাদা হলেও শিক্ষকগোষ্ঠী হিসেবে তারা তখন পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিহিংসামূলক অভিযানে নেমেছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অনুসন্ধানী সিদ্ধান্ত হলো: সাদা দল ছিল সরকারের প্রকাশ্য সমালোচক; নীল দল ছিল সরকারঘনিষ্ঠ কিন্তু সংকটের শেষ পর্যায়ে সংলাপ, তদন্ত ও সংস্কারের দাবিদার। তাদের রাজনৈতিক দূরত্ব ছিল স্পষ্ট, কিন্তু পর্যালোচিত প্রতিবেদনে পারস্পরিক পারস্পরিক আক্রমণ, কর্মসূচিতে বাধা বা প্রতিশোধমূলক আচরণের প্রমাণ নেই। এই ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগোষ্ঠীগুলো একই পরিসরে ভিন্ন বক্তব্য প্রকাশ করতে পেরেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ও একাডেমিক চরিত্র রক্ষার জন্য ভবিষ্যতেও সেই নীতি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নীল দলের সহযোগিতা কি দুর্বলতা ছিল?
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সাদা দলের সভা, সংবাদ সম্মেলন ও র্যালিতে বাধা না দেওয়াকে নীল দলের রাজনৈতিক দুর্বলতা বলা যাবে না। বরং সেটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতি একটি ন্যূনতম সম্মান। ভিন্নমতকে কথা বলতে দেওয়া মানে তার প্রতিটি বক্তব্য সমর্থন করা নয়; বরং তার কথা বলার অধিকার স্বীকার করা।
সাদা দলের শতাধিক শিক্ষক যখন ৩ আগস্ট প্রকাশ্য র্যালি ও সমাবেশ করেছেন, তখন নীল দলের শিক্ষক কিংবা তৎকালীন প্রশাসন তাঁদের ওপর দলীয় কর্মী দিয়ে হামলা করায়নি—এটি কোনো অনুগ্রহ ছিল না; এটি ছিল তাঁদের অধিকার। একইভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নীল দল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষক কিংবা অন্য কোনো মতাদর্শের শিক্ষকদের নিরাপদে কথা বলা, পাঠদান, গবেষণা ও সংগঠন করার সুযোগ দেওয়াও কারও দয়া নয়; সেটিও তাঁদের অধিকার।
অধিকার কেবল নিজের জন্য দাবি করলে তা অধিকার থাকে না; সেটি গোষ্ঠীগত সুবিধায় পরিণত হয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখনই, যখন ক্ষমতাবান ব্যক্তি নিজের বিরোধীকেও সেই স্বাধীনতা দেন, যা তিনি নিজের দুর্দিনে দাবি করেছিলেন।
একই শিক্ষক, কিন্তু দুই রকম ন্যায়বিচার?
২০২৪ সালের জুলাইয়ে নীল দলের শিক্ষক নেতৃত্বাধীন প্রত্যয় আন্দোলনকে বিএনপি সমর্থন করলে সেটিকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক সংহতি বলা হয়েছিল। অথচ আগস্টের পর কোনো নীল দলের শিক্ষক যদি পেশাগত অধিকার, একাডেমিক স্বাধীনতা বা ন্যায়বিচারের কথা বলেন, তাঁকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ফ্যাসিবাদের সহযোগী’, ‘স্বৈরাচারের দোসর’ কিংবা ‘বিরোধী শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে সেখানে একটি স্পষ্ট দ্বৈতনীতি তৈরি হয়।
একই কাজের বিচার ক্ষমতার অবস্থান অনুযায়ী বদলাতে পারে না। বিরোধী অবস্থানে থাকলে মতপ্রকাশ ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’, আর ক্ষমতায় এসে প্রতিপক্ষের মতপ্রকাশ ‘ষড়যন্ত্র’—এমন নীতি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি হতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয় আদালত নয়, আবার প্রতিশোধের মঞ্চও নয়। এখানে অভিযোগের বিচার হবে প্রমাণে; রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়। ব্যবস্থা নেওয়া হবে ব্যক্তির নির্দিষ্ট কাজের জন্য; তাঁর দল, গোষ্ঠী বা আদর্শের জন্য নয়। শাস্তির আগে অভিযোগ জানাতে হবে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে, নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
প্রত্যয়ের মঞ্চ কি শুধু প্রয়োজনের ঐক্য ছিল?
সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রশ্নটি এখানেই। প্রত্যয় আন্দোলনে যে পেশাগত ভ্রাতৃত্ব দেখা গিয়েছিল, সেটি কি নীতিনির্ভর সংহতি ছিল, নাকি কেবল অভিন্ন আর্থিক স্বার্থের সাময়িক জোট?
যদি পেনশনের প্রশ্নে নীল ও সাদা দলের শিক্ষক একসঙ্গে বসতে পারেন, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর একজন আরেকজনের কক্ষ বন্ধ, পাঠদান স্থগিত বা পেশাগত অপমানের ঘটনায় নীরব থাকেন, তবে সেই ঐক্যের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তখন মনে হয়, পেনশনের স্বার্থে সবাই সহকর্মী; কিন্তু ক্ষমতা ও প্রতিশোধের প্রশ্নে কেউ বিজয়ী, কেউ পরাজিত।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার মর্যাদা শুধু বেতন, সুপার গ্রেড বা পেনশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সহকর্মীর ন্যায়বিচারের অধিকার রক্ষা করা, বিরোধী মতকে সহ্য করা, প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী না করা এবং রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও পেশাগত সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখাও শিক্ষকতার মর্যাদার অংশ।
প্রশ্নটি সাদা বা নীল দলের নয়—বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মার
আজকের প্রশ্ন কে আওয়ামী লীগপন্থী, কে বিএনপিপন্থী কিংবা কে কোন প্যানেলের শিক্ষক—শুধু তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয় কি প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন বিজয়ীদের প্রতিশোধের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে? নাকি এটি এমন একটি জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হবে, যেখানে সরকার বদলালেও ন্যায়বিচারের নীতি বদলাবে না?
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সাদা দলের শিক্ষকদের সরকারবিরোধী কর্মসূচি পালনের অধিকার ছিল। সেই অধিকার তাঁরা ব্যবহার করেছেন। আজ নীল দল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শিক্ষক কিংবা অন্য যেকোনো ভিন্নমতের শিক্ষকেরও সমান অধিকার রয়েছে—নিরাপদে কাজ করার, কথা বলার, সংগঠিত হওয়ার এবং যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া শাস্তির শিকার না হওয়ার।
ইতিহাস তাই বর্তমান শিক্ষক নেতৃত্বের সামনে একটি সহজ কিন্তু নির্মম আয়না ধরে—জুলাইয়ে যাঁরা নিজের জন্য স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, আগস্টের পর তাঁরা কি প্রতিপক্ষের স্বাধীনতাও রক্ষা করেছেন?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে সমস্যাটি কোনো এক দলের নয়; সমস্যাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক পতনের। আর যদি শিক্ষকসমাজ সেই ভুল সংশোধন করতে চায়, তবে তাকে আবার ২০২৪ সালের প্রত্যয় আন্দোলনের মঞ্চে ফিরে তাকাতে হবে—যেখানে মতাদর্শ ভিন্ন ছিল, কিন্তু শিক্ষক পরিচয়, পেশাগত মর্যাদা এবং পারস্পরিক অধিকার ছিল সবার ঊর্ধ্বে।
হত্যার বিচার, শিক্ষার্থীদের মুক্তি ও ক্যাম্পাসে স্বাভাবিকতা—দুই শিক্ষকগোষ্ঠীর দাবিতে ছিল বিস্ময়কর মিল। তবে রাষ্ট্রের দায় নির্ধারণ এবং সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের অবস্থান ছিল মৌলিকভাবে আলাদা। সেই পার্থক্য কি পুরো নীল দলকে আজ ‘দোসর’ আখ্যা দেওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি?
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। জুলাইয়ের রক্তাক্ত দিনগুলো পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন আতঙ্ক, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার এক ভারী নীরবতায় আচ্ছন্ন। শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন, অনেকে আহত ও গ্রেপ্তার হয়েছেন; হল ও শ্রেণিকক্ষ কার্যত বন্ধ। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সর্বত্র উৎকণ্ঠা।
সেদিন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই আদর্শিক শিক্ষকগোষ্ঠী—আওয়ামী লীগপন্থী নীল দল এবং বিএনপিপন্থী সাদা দল—প্রায় একই সময়ে পথে নামে। উভয় পক্ষই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও হত্যার বিচার চায়। উভয় পক্ষই গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানায়। উভয় পক্ষের কর্মসূচিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা এবং শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার কথা উঠে আসে।
কিন্তু একই যন্ত্রণার সামনে দাঁড়িয়েও তাদের রাজনৈতিক ভাষা এক ছিল না। সাদা দল বলেছিল, সংকটের দায় সরকারের; ন্যায়বিচারের জন্য সরকারের পদত্যাগ প্রয়োজন। নীল দল বলেছিল, সব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার চাই, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনের স্বীকৃতি চাই, তবে সংকট কাটাতে জাতীয় ঐক্য ও সংলাপ দরকার।
এই মিল ও অমিলের মাঝখানেই লুকিয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রকাশ্যে দাঁড়ানোর প্রমাণ থাকার পরও নীল দলের সব শিক্ষককে আজ নির্বিচারে ‘দোসর’, ‘অপরাধী’ কিংবা ‘হত্যার সহযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করা কতটা ন্যায়সংগত?
একই দিনে দুই কর্মসূচি
সংযুক্ত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ আগস্ট নীল দলের শিক্ষকরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেন। কর্মসূচিতে তাঁরা কোটা আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ড, শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের ওপর হামলা এবং সহিংস ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
নীল দলের কর্মসূচিতে আরও দাবি করা হয়—হলে বৈধ শিক্ষার্থীদের অবস্থান নিশ্চিত করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা, শিক্ষার্থী নির্যাতন বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দ্রুত শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকারের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে “ঐতিহাসিক” বলে বর্ণনা করেন। তিনি জাতীয় সংকট নিরসনে উচ্চপর্যায় থেকে সংলাপ ও ঐক্যের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। সংযুক্ত গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম বলছে, আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতেও নীল দলের শিক্ষকেরা মানববন্ধন করেছিলেন।
অন্যদিকে একই দিনে সাদা দলের শতাধিক শিক্ষক উপাচার্যের বাসভবন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে টিএসসি, শহীদ মিনার ও দোয়েল চত্বর হয়ে রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ করেন। তাঁরা হত্যাকাণ্ড, দমন-পীড়ন ও গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানান। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি তাঁরা সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করেন।
সাদা দলের বক্তব্য ছিল অধিক সরাসরি: যাদের তারা হত্যাকাণ্ড ও দমনের জন্য দায়ী মনে করছে, তাদের অধীনে নিরপেক্ষ বিচার সম্ভব নয়। তাই কেবল তদন্ত নয়—সরকার পরিবর্তনও তাদের দাবির অংশ। অর্থাৎ, দুই পক্ষই বিচার চেয়েছিল; কিন্তু বিচার পাওয়ার রাজনৈতিক পথ নিয়ে তাদের অবস্থান ছিল আলাদা।
মিল কোথায় ছিল
২০২৪ সালের সেই উত্তাল ৩ আগস্ট তারিখের প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়া সংবাদ ও প্রতিবেদনসমূহ পাশাপাশি রাখলে অন্তত পাঁচটি বিষয়ে সাদা ও নীল দলের অবস্থানের মিল দেখা যায়।
- প্রথমত, দুই দলই ছাত্রহত্যা ও সহিংসতার বিচার দাবি করেছে।
- দ্বিতীয়ত, উভয় পক্ষ শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন, হামলা কিংবা গ্রেপ্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
- তৃতীয়ত, উভয় দলই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ন্যায্যতার একটি অংশ স্বীকার করেছে। নীল দলের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সম্মান জানানো হয়; সাদা দল সরাসরি তাদের দাবির প্রতি সংহতি জানায়।
- চতুর্থত, উভয় পক্ষই বিশ্ববিদ্যালয়কে সচল করা এবং শিক্ষার নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
- পঞ্চমত, উভয় পক্ষের কর্মসূচিই ছিল প্রকাশ্য। নীল দলের মানববন্ধন ও মিছিল যেমন সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তেমনি সাদা দলের সংবাদ সম্মেলন, র্যালি এবং সরকারবিরোধী বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে।
এই তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো দেখায়, জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজকে শুধু “সরকারপন্থী বনাম আন্দোলনপন্থী”—এই দুই ঘরে ভাগ করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

মূল পার্থক্য ছিল দায় নির্ধারণে
সাদৃশ্যের পরও দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যবধান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সাদা দল হত্যাকাণ্ড এবং দমন-পীড়নের রাজনৈতিক দায় সরাসরি সরকারের ওপর চাপিয়েছে। তাদের ভাষায় কোনো দ্ব্যর্থতা ছিল না। তারা সরকারপ্রধানের পদত্যাগ এবং নতুন বা নিরপেক্ষ ব্যবস্থার দাবি তুলেছিল।
নীল দল ছিল তুলনামূলক সংযত। তারা “সব হত্যাকাণ্ডের” তদন্ত চেয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সমষ্টিগতভাবে অভিযুক্ত করেনি। বরং নীল দলের কোনো কোনো বক্তা আন্দোলনে “তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ”, সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের কথাও বলেছেন।
এই “তৃতীয় পক্ষ” ব্যাখ্যাই নীল দলের অবস্থানের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ। কারণ আন্দোলনের পক্ষের অনেকে মনে করেন, এমন ভাষা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের প্রত্যক্ষ দায়কে আড়াল করেছে। নীল দলের নেতারা যখন হত্যার বিচার চাইছিলেন, একই বক্তব্যে নাশকতা ও অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গ তোলায় তাঁদের অবস্থানের নৈতিক শক্তি দুর্বল হয়েছে—এমন সমালোচনার ভিত্তি রয়েছে।
তবু এটিও সত্য যে তারা প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের বিচার, আহতদের চিকিৎসা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মুক্ত মতপ্রকাশ এবং সংলাপের দাবি তুলেছিল। ফলে পুরো নীল দল “হত্যাকে সমর্থন করেছিল”—এমন সরল সিদ্ধান্ত সংযুক্ত দলিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রঙের ঊর্ধ্বে শিক্ষকসমাজ: সীমিত ক্ষমতা, নীরব সাহস ও সমষ্টিগত দায়ের প্রশ্ন
জুলাই আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজনীতি-সচেতন, তবে কোনো দলীয় পরিচয়ে যুক্ত নন—এমন একজন শিক্ষক কিছুটা হতাশ কণ্ঠে বলেন: “আমাদের শিক্ষকদের ক্ষমতা আসলে খুবই সীমিত। তাঁদের হাতে অস্ত্র নেই, রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের ক্ষমতা নেই, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কর্তৃত্বও নেই। তাঁদের প্রধান শক্তি বিবেক, যুক্তি, নৈতিক অবস্থান ও সম্মিলিত কণ্ঠ। কিন্তু ভয়, রাজনৈতিক চাপ এবং চাকরিগত অনিশ্চয়তার কারণে সেই কণ্ঠও সব সময় সমান জোরে উচ্চারিত হয় না।
তারপরও জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনস্বীকার্য ভূমিকা রয়েছে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের জন্ম, বিকাশ এবং শেষ পর্যন্ত দেশব্যাপী বিস্তার—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়, রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি, অপরাজেয় বাংলা ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা। আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে—এটিকেও শিক্ষকসমাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সম্মিলিত ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সাদা, নীল, গোলাপি কিংবা কোনো রঙেই পরিচিত নন—শিক্ষকদের আদর্শিক পরিচয় যা-ই হোক, তাঁরা শেষ পর্যন্ত একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী। পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ, সংলাপ ও সমন্বয় বজায় রাখার কারণেই অনেক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছিল। কোনো কোনো শিক্ষক থানায় আটক শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে আনতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন; আহত ও আতঙ্কিত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন; হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা ও স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন। এসব ঘটনার উল্লেখ বিভিন্ন সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে রয়েছে।
এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—নীল দলের শিক্ষকেরা কত দ্রুত প্রতিবাদ করেছিলেন? প্রশ্নটি অবশ্যই করা যায়। কিন্তু প্রশ্নটি শুধু নীল দলের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা হলে মূল্যায়নটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কেননা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই হাজার শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আনুমানিক ছয় থেকে সাত শ শিক্ষক নীল দলের সঙ্গে এবং দুই থেকে তিন শ শিক্ষক সাদা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়। বাকি বিপুলসংখ্যক শিক্ষক কোনো দৃশ্যমান দলীয় রঙে পরিচিত ছিলেন না। তাঁদের কতজন প্রথম দিকে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছিলেন? যদি নীরবতাকেই অপরাধের প্রমাণ ধরা হয়, তবে একই মানদণ্ড দলমতনির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে।
বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ শিক্ষকই কোনো হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা বা অংশগ্রহণকারী ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন সীমিত ক্ষমতার সাধারণ শিক্ষক—কেউ ভয়ে নীরব থেকেছেন, কেউ পরিস্থিতি বুঝতে সময় নিয়েছেন, কেউ প্রকাশ্যে মানববন্ধন করেছেন, আবার কেউ নীরবে শিক্ষার্থীদের রক্ষা বা মুক্ত করতে কাজ করেছেন। নৈতিক নীরবতার সমালোচনা হতে পারে; কিন্তু নীরবতা, রাজনৈতিক পরিচয় এবং প্রত্যক্ষ অপরাধ—এই তিনটিকে এক করে দেখা যায় না।
কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হতে হবে। কিন্তু শুধু নীল, সাদা কিংবা রংবিহীন পরিচয়ের ভিত্তিতে সমষ্টিগত অপরাধ আরোপ করা ন্যায়বিচার নয়। ইতিহাসের সৎ মূল্যায়ন করতে হলে দেখতে হবে—কে কী বলেছেন, কখন বলেছেন এবং সংকটের মুহূর্তে বাস্তবে কী করেছেন। সংবাদমাধ্যমের নথিগুলো খুলে পড়লেই সেই বহুমাত্রিক সত্যের অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠবে।”
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, কোনো দলীয় রঙে পরিচিত নন—এমন আরেকজন শিক্ষক বলেন, “সাদা ও নীল দলের মধ্যে আজ যে তীব্র বিরোধ দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালের আগস্টেও তা চোখে পড়েনি। তখন মনে হতো, এমনটাই তো স্বাভাবিক—আদর্শিক অবস্থান আলাদা হলেও সবাই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পরস্পরের সহকর্মী। রাজনৈতিক মতভিন্নতা পেশাগত সৌহার্দ্য, পারস্পরিক মর্যাদা কিংবা সহাবস্থানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই সম্পর্ক কেন অবিশ্বাস, বিভাজন ও সমষ্টিগত অভিযোগে রূপ নিল—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।”
সরকারের ঘনিষ্ঠতা কি নীলদলের অপরাধের প্রমাণ?
নীল দল ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও নীল দলের শিক্ষকরা ছিলেন। এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঘনিষ্ঠতা তাঁদের ওপর বাড়তি নৈতিক দায় আরোপ করে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে তাঁদের কাছ থেকে আরও দ্রুত, আরও স্পষ্ট এবং আরও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিবাদ প্রত্যাশিত ছিল। প্রশ্ন উঠতেই পারে:
- হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার পর তাঁরা কত দ্রুত প্রতিবাদ করেছিলেন?
- রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে তাঁদের বক্তব্য কতটা সুস্পষ্ট ছিল?
- গ্রেপ্তার শিক্ষার্থীদের মুক্ত করতে তাঁরা প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করেছিলেন কি না?
- আহত শিক্ষার্থী ও আক্রান্ত শিক্ষকদের পাশে বাস্তবে কীভাবে দাঁড়িয়েছিলেন?
- তাঁদের বিবৃতি কি মাঠের কর্মকাণ্ডে রূপ নিয়েছিল?
এসব প্রশ্ন বৈধ এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিজে কোনো ব্যক্তির ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণ করে না। “নীল দলের সদস্য” এবং “হত্যা বা নিপীড়নে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ব্যক্তি”—এই দুই পরিচয়কে এক করে দেখলে তদন্তের জায়গা দখল করে নেয় প্রতিশোধ।
কেউ যদি হামলায় উসকানি দিয়ে থাকেন, শিক্ষার্থী নির্যাতন অনুমোদন করে থাকেন, মিথ্যা মামলায় ভূমিকা রাখেন অথবা প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে দমন-পীড়নে সহায়তা করেন—তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সাক্ষ্য ও নথির ভিত্তিতে ব্যবস্থা হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু দলীয় পরিচয়ের কারণে শত শত শিক্ষককে একই অপরাধের অংশীদার বলা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তাহলে এখন সমষ্টিগতভাবে ‘দোসর’ বলা হচ্ছে কেন?
এর পেছনে কয়েকটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ দেখা যায়।
- প্রথম কারণ, ক্ষমতার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতার দায়। নীল দলের বহু শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক সমিতি ও বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় প্রভাবশালী ছিলেন। ফলে সাবেক সরকারের সব ব্যর্থতা ও দমননীতির প্রতীক হিসেবেও তাঁদের দেখা হচ্ছে।
- দ্বিতীয় কারণ, জুলাইয়ের ঘটনাকে পরবর্তী সময় থেকে ফিরে দেখার প্রবণতা। একটি আন্দোলন সফল হওয়ার পর ইতিহাসকে প্রায়ই বিজয়ী ও পরাজিত—এই দুই ভাগে লেখা হয়। মাঝামাঝি অবস্থান, দেরিতে আসা প্রতিবাদ কিংবা সংলাপের আহ্বান তখন সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
- তৃতীয় কারণ, নীল দলের বক্তব্যের দ্বৈততা। একদিকে তারা হত্যার বিচার ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা চেয়েছে; অন্যদিকে কোনো কোনো বক্তা “তৃতীয় পক্ষ”, নাশকতা এবং আন্দোলন ছিনতাইয়ের সরকারি বয়ানের কাছাকাছি ভাষা ব্যবহার করেছেন। ফলে তাদের প্রতিবাদকে অনেকেই আন্তরিক অবস্থান নয়, বরং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
- চতুর্থ কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় রাজনীতির পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণও বদলায়। যে পক্ষ একসময় প্রান্তিক ছিল, ক্ষমতার নতুন পরিবেশে তার প্রভাব বাড়ে। তখন জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের সীমা সহজেই অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।
- পঞ্চম কারণ, ব্যক্তির কাজের পরিবর্তে পরিচয় দিয়ে বিচার করার সুবিধা। নির্দিষ্ট ব্যক্তির নির্দিষ্ট ভূমিকা অনুসন্ধান করা কঠিন; পুরো একটি দলকে ‘দোসর’ বলা সহজ। কিন্তু সাংবাদিকতা ও ন্যায়বিচার—উভয়ের কাজই সহজ অভিযোগের পরিবর্তে কঠিন প্রমাণ অনুসরণ করা।
সাদা দলও কি কেবল পেশাজীবী অবস্থান নিয়েছিল?
সাদা দলের সরকারবিরোধী অবস্থান নিঃসন্দেহে জুলাইয়ের ছাত্রদের দাবির সঙ্গে অধিক সরাসরি সাযুজ্যপূর্ণ ছিল। তারা হত্যার দায় রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করেছে, গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করেছে এবং সরকারপ্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছে।
তবে সাদা দলও একটি আদর্শিক শিক্ষকগোষ্ঠী; তার সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সম্পর্ক প্রকাশ্য। তাই তাদের অবস্থানকে যেমন কেবল “নিরপেক্ষ পেশাজীবী প্রতিবাদ” বলা যাবে না, তেমনি দলীয় পরিচয়ের কারণে তাদের প্রতিবাদকেও অস্বীকার করা যাবে না।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে নীল দলের নেতৃত্বাধীন শিক্ষক সমিতির প্রত্যয় পেনশনবিরোধী আন্দোলনে সাদা দলের শিক্ষকরা অংশ নিয়েছিলেন। বিএনপির নেতারাও সেই আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তখন রাজনৈতিক মতপার্থক্য পেশাগত ঐক্যের পথে বাধা হয়নি। ক্যাম্পাসে বিরোধী অবস্থানের সাদা দলের শিক্ষকরা সংবাদ সম্মেলন করেছেন, মিছিল করেছেন, সরকারের পদত্যাগ চেয়েছেন—কিন্তু শুধু সেই কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠেনি।
এই ইতিহাস বর্তমানের জন্য একটি নৈতিক আয়না। বিরোধী মত প্রকাশের যে অধিকার সাদা দল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভোগ করেছে, একই অধিকার এখন নীল দলের শিক্ষকদেরও প্রাপ্য—যতক্ষণ না কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়।
প্রতিবাদ কি দায়মুক্তির সনদ?
না। ৩ আগস্টের মানববন্ধন বা বিচার দাবির কারণে নীল দলের প্রত্যেক শিক্ষক অতীতের সব দায় থেকে মুক্ত হয়ে যান না। কোনো বিবৃতি ব্যক্তিগত অপকর্ম মুছে দিতে পারে না। কে কখন কী বলেছেন, তার পাশাপাশি কে কী করেছেন—সেটিও দেখতে হবে।
একইভাবে, কোনো সদস্যের সম্ভাব্য অপরাধ পুরো নীল দলের প্রত্যেক শিক্ষকের ওপর চাপানোও গ্রহণযোগ্য নয়। জুলাইয়ের শেষ পর্যায়ে নীল দলের প্রকাশ্য অবস্থান তাদের ভূমিকা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল; কিন্তু সেটিই একমাত্র দলিল নয়।
একটি গ্রহণযোগ্য তদন্তকে অন্তত চারটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে—প্রকাশ্য বক্তব্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড এবং সহিংসতা বা নিপীড়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগসূত্র।
ইতিহাসের কঠিন সত্য
জুলাই আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা ও নীল দল এক জায়গায় এসে মিলেছিল—শিক্ষার্থীদের রক্তপাত বন্ধ করা দরকার, হত্যার বিচার দরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা দরকার।
তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল সেই হত্যার রাজনৈতিক ব্যাখ্যায়।
সাদা দল সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে পদত্যাগ দাবি করেছিল। নীল দল বিচার ও সংলাপ চেয়েছিল, কিন্তু সরকারের পতন নয়; বরং কোনো কোনো বক্তব্যে সরকারি ব্যাখ্যার অংশও পুনরাবৃত্তি করেছিল। এ পার্থক্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিহাসে তা লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার।
কিন্তু পার্থক্য মানেই একটি পক্ষ সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং অন্য পক্ষের প্রত্যেকে অপরাধী—এমন নয়।
জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দাবি ছিল বৈষম্যহীনতা, অধিকার ও জবাবদিহি। সেই আন্দোলনের পর যদি মানুষকে প্রমাণ ছাড়া শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অভিযুক্ত করা হয়, তবে আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
নীল দলের কোনো শিক্ষক অপরাধ করে থাকলে তাঁর বিচার হোক। প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তারও জবাবদিহি হোক। কিন্তু বিচার হতে হবে নাম, কাজ, তারিখ, সিদ্ধান্ত, সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে—দলের রঙের ভিত্তিতে নয়।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয় যদি পরিচয়কে অপরাধের প্রমাণ বানায়, তবে আজকের বিজয়ী আগামী দিনের অভিযুক্ত হতে বেশি সময় লাগবে না।
জুলাইয়ে সহাবস্থান, আগস্টের পর প্রতিশোধ—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজের নৈতিক অবস্থান কেন বদলে গেল?
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও নির্বাচিত শিক্ষক সমিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং নীল দলের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের প্রভাবও ছিল দৃশ্যমান। তা সত্ত্বেও বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত সাদা দলের শিক্ষকেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, সরকারের পদত্যাগসহ ১১ দফা দাবি জানিয়েছেন এবং প্রকাশ্যে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। ৩ আগস্ট তাঁরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে থেকে র্যালি করে টিএসসি, শহীদ মিনার ও দোয়েল চত্বর হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের সামনে সংহতি সমাবেশ করেছেন। সেখানে সরকারবিরোধী স্লোগানও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব কর্মসূচির কারণে তাঁদের কক্ষ তালাবদ্ধ করা হয়নি, শ্রেণিকক্ষ থেকে বিতাড়িত করা হয়নি, চাকরি থেকে অপসারণের দাবি ওঠেনি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়কে শাস্তির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেনি।
এর কারণ কেবল তৎকালীন প্রশাসনের উদারতা ছিল না; এর পেছনে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুমত, সহাবস্থান ও পেশাগত সংহতির একটি মৌলিক স্বীকৃতি। নীল ও সাদা দলের শিক্ষকদের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও তাঁরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একই পেশাজীবী সম্প্রদায়ের সদস্য এবং একই একাডেমিক মর্যাদার অংশীদার—এই উপলব্ধিটি তখন অন্তত পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।
প্রত্যয় আন্দোলন ছিল সেই পেশাগত সংহতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ স্কিমের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছে, শিক্ষকসমাজ চাইলে দলীয় বিভাজন অতিক্রম করতে পারে। আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বে ছিলেন নির্বাচিত শিক্ষক সমিতি ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের নেতারা, যাঁদের অনেকেই নীল দলের সঙ্গে যুক্ত বা আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সাদা দল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক, বামপন্থী, প্রগতিশীল ও দলনিরপেক্ষ শিক্ষকেরাও একই দাবিতে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
বিএনপি ও দলটির মহাসচিবও শিক্ষকদের প্রত্যয়বিরোধী আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সমর্থনের কারণে আন্দোলনরত নীল দলের শিক্ষকদের ‘বিএনপির সহযোগী’ বলা হয়নি। আবার সাদা দলের শিক্ষকেরা নীল দলের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন বলে তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ও মুছে যায়নি। সবাই বুঝেছিলেন, এটি সরকার পতনের আন্দোলন নয়; এটি পেনশন, মর্যাদা, স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার ভবিষ্যৎ রক্ষার পেশাগত আন্দোলন।
এই সম্মিলিত আন্দোলনের সময় একজন শিক্ষক আরেকজনকে প্রথমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন সহকর্মী হিসেবে। প্রত্যয়ের বিরুদ্ধে একই মঞ্চে বসার অর্থই ছিল—মতাদর্শ আলাদা হতে পারে, কিন্তু পেশাগত অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার প্রশ্নে শিক্ষকসমাজ এক।
তাহলে ৫ আগস্টের পর কী বদলে গেল?
এই ইতিহাসের আলোতেই ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে একটি কঠিন নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিএনপিপন্থী বা সাদা দলের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে পরিচিত শিক্ষকদের কেউ কেউ যখন প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব অর্জন করলেন, তখন তাঁরা কি সেই একই সহনশীলতা, সহাবস্থান ও একাডেমিক স্বাধীনতার নীতি অনুসরণ করেছেন?
এই প্রশ্ন কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী ঘোষণার জন্য নয়; বরং নীতির ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের জন্য।
জুন থেকে ৩ আগস্ট: যে ক্যাম্পাসে মত ভিন্ন ছিল, কিন্তু শিক্ষকসমাজ ছিল এক
২০২৪ সালের জুন, জুলাই ও আগস্টের প্রথম তিন দিন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-রাজনীতির ইতিহাসে এই সময়টিকে কেবল দলীয় পরিচয়ের পুরোনো ছকে বিচার করলে প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহ ধরা পড়বে না। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে নীল দল ছিল, সাদা দল ছিল, বিভিন্ন প্রগতিশীল শিক্ষকগোষ্ঠী ছিল, আবার কোনো দলীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা শিক্ষকেরাও ছিলেন। কিন্তু ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিম যখন বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল, তখন অন্তত সাময়িকভাবে দলীয় রঙের দেয়াল ভেঙে গিয়েছিল।
নিজেকে কোনো দলীয় শিবিরের সঙ্গে যুক্ত না করা একজন শিক্ষক সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “তখন আমরা নিজেদের পেশাগত অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এক হয়েছিলাম। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা খর্ব করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে সবাই যুগপৎ আন্দোলন করেছি।”
তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে তৎকালীন সংবাদপ্রবাহের একটি বড় অংশের মিল পাওয়া যায়। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি তখন নীল দল-সমর্থিত শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশ শিক্ষক সমিতিতেও আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শের সমর্থক শিক্ষকদের প্রভাব ছিল। তারপরও আন্দোলনটি সরকারের একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়েছিল। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে সরকারঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শিক্ষকনেতারাই সরকারের পেনশননীতি প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে নেমেছিলেন।
এটি ছিল নিঃশর্ত সরকার-সমর্থনের রাজনীতি থেকে পেশাগত স্বার্থের প্রশ্নে বেরিয়ে আসার একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
মার্চের প্রজ্ঞাপন থেকে জুলাইয়ের সর্বাত্মক কর্মবিরতি
২০২৪ সালের ১৩ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ১ জুলাই বা তার পরে যোগদানকারীদের ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিমের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত সামনে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই স্কিম কার্যকর হলে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বিদ্যমান অবসর-সুবিধা সংকুচিত হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় হয়ে পড়বে।
এখানে আন্দোলনের বিষয়টি কেবল একজন কর্মরত শিক্ষকের মাসিক পেনশন ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ভবিষ্যৎ শিক্ষক নিয়োগ, মেধাবীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে আকৃষ্ট করা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ওপর আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব এবং জাতীয় বেতনকাঠামোয় বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের মর্যাদার প্রশ্ন।
জুনে অবস্থান কর্মসূচি, অর্ধদিবস কর্মবিরতি ও প্রতীকী প্রতিবাদের পর ১ জুলাই থেকে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সর্বাত্মক কর্মবিরতি শুরু হয়। ক্লাস, পরীক্ষা, প্রশাসনিক কাজ, সভা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নিজ নিজ দাবিতে একই কর্মসূচির পরিসরে এসে দাঁড়ান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনকেন্দ্রিক অবস্থান কর্মসূচিতে নীল, সাদা, গোলাপি কিংবা দলনিরপেক্ষ—বিভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষকের উপস্থিতি ছিল। সেখানে কারও রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করে বসার চেয়ার দেওয়া হয়নি; কারণ দাবিটি ছিল সামষ্টিক। একটি প্রজন্মের শিক্ষক বুঝেছিলেন, বিভক্ত থাকলে আমলাতন্ত্রের সঙ্গে নীতিগত দর-কষাকষিতে তাঁরা দুর্বল হয়ে পড়বেন।
এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই গিয়েছিল। কিন্তু সরকারসমর্থক হিসেবে পরিচিত শিক্ষকেরা আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে তখন রাষ্ট্রদ্রোহ, সরকারবিরোধিতা অথবা রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তোলা হয়নি। বরং সরকার ও শিক্ষকনেতাদের মধ্যে একাধিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।
একই ক্যাম্পাসে পাশাপাশি দুটি আন্দোলন
জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি বড় আন্দোলন পাশাপাশি চলেছে। কলাভবন এলাকায় শিক্ষকেরা ‘প্রত্যয়’ স্কিম বাতিল, স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো এবং সুপার গ্রেডের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন, যা পরবর্তী সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিস্তৃত রূপ নেয়।
এই দুটি আন্দোলনের বিষয় আলাদা হলেও ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক উত্তাপ, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং শিক্ষক–শিক্ষার্থীর সম্পর্কের জায়গায় তারা একে অপরকে স্পর্শ করেছিল। শিক্ষকসমাজের বিভিন্ন অংশ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, হতাহত হওয়ার ঘটনা, গণগ্রেপ্তার এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
এখানেও নীল ও সাদা দলের রাজনৈতিক ভাষা অভিন্ন ছিল না। সাদা দল তৎকালীন সরকার ও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত সরাসরি ভাষায় বক্তব্য দিয়েছে। নীল দল হত্যা, হামলা ও সংকটের বিচার চাইলেও রাজনৈতিক দায় নির্ধারণে অপেক্ষাকৃত সতর্ক ও বহুপক্ষীয় ভাষা ব্যবহার করেছে। কিন্তু উভয় পক্ষই শিক্ষার্থীদের দাবি, সহিংসতা, প্রাণহানি এবং রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি।
৩০ জুলাই: বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে সাদা দলের সংবাদ সম্মেলন
৩০ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে সাদা দল সংবাদ সম্মেলন করে। সেখানে কোটা আন্দোলন, শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক সংকট এবং সরকারের পদত্যাগের দাবি নিয়ে বক্তব্য দেওয়া হয়। দলীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নিজেদের আদর্শিক অবস্থান নিয়েও তারা প্রকাশ্যে কথা বলে।
এটি ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি। তা সত্ত্বেও সাদা দলের শিক্ষকেরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে বসে সংবাদ সম্মেলন করতে পেরেছিলেন। সংযুক্ত সংবাদচিত্রে নীল দলের কোনো শিক্ষককে কর্মসূচি বন্ধ করতে, বক্তাদের হেনস্তা করতে কিংবা ক্যাম্পাসে মব তৈরি করতে দেখা যায় না।
তবে অনুসন্ধানী নির্ভুলতার স্বার্থে একটি সীমা উল্লেখ করা প্রয়োজন: “কেউ বাধা দেয়নি”—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সেদিনের আয়োজক, ক্লাব কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু প্রকাশিত সংবাদ ও দৃশ্যমান উপকরণে কোনো বাধা, সংঘর্ষ বা হামলার বিবরণ নেই।
আজ সেই সময়ের সাদা দলের নেতাদের কাছেই তাই প্রশ্ন রাখা যেতে পারে: ৩০ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনের জন্য তাঁদের কি অনুমতি পেতে সমস্যা হয়েছিল? নীল দলের কোনো শিক্ষক কি বাধা দিয়েছিলেন? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি অনুষ্ঠানটি বন্ধ করেছিল? নাকি রাজনৈতিক মতবিরোধ সত্ত্বেও তাঁদের বক্তব্য প্রকাশের অধিকার তখন স্বীকৃত হয়েছিল?
৩ আগস্ট: একই দিনে ভিন্ন কর্মসূচি
৩ আগস্ট ছিল শিক্ষক-রাজনীতির সহাবস্থান বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন।
অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে নীল দল মানববন্ধন করে। সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, শিক্ষার্থী–শিক্ষকদের ওপর হামলা এবং নাশকতা–ধ্বংসযজ্ঞের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করা হয়। জাতীয় ঐক্য ও সংলাপের আহ্বান জানানো হয়। দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, আবাসিক হলে স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং নির্যাতন বন্ধের দাবিও তোলা হয়।
নীল দলের কর্মসূচির পর উপাচার্যের কাছে পাঁচ দফা স্মারকলিপি দেওয়া হয়। সেই স্মারকলিপিতে ক্যাম্পাসের সব ঘটনার তদন্ত, দোষীদের শাস্তি, আবাসিক হলে বৈধ শিক্ষার্থীদের অবস্থান, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি ছিল।
একই দিন সাদা দলও র্যালি ও সংহতি সমাবেশ করে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে থেকে র্যালি শুরু করে টিএসসি, শহীদ মিনার ও দোয়েল চত্বর অতিক্রম করে রাজু ভাস্কর্যের সামনে সমাবেশ করে। সেখানে সরকারবিরোধী স্লোগান, হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানানো হয়।
দুই পক্ষের বক্তব্য এক ছিল না। গন্তব্যও এক ছিল না। কিন্তু একই ক্যাম্পাসে কাছাকাছি সময়ে দুই বিপরীত রাজনৈতিক ধারার শিক্ষকগোষ্ঠী নিজেদের কর্মসূচি পালন করেছে। পর্যালোচিত প্রতিবেদনগুলোতে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে বাধা দিয়েছে, হামলা করেছে কিংবা অনুষ্ঠান ভেঙে দিয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
এটাই ছিল সহাবস্থান: ঐক্য মানে একই বক্তব্য নয়; পরস্পরের বক্তব্য রাখার অধিকার মেনে নেওয়া।
নীল দল কি আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন?
নীল দলকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে একটি ধারণাগত পার্থক্য জরুরি। সংগঠনটি আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধপন্থী রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেও সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগের ঘোষিত অঙ্গসংগঠন নয়। এর সদস্যরা সাধারণত বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আদর্শে নিজেদের পরিচিত করেন।
একইভাবে সাদা দল বিএনপি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেও এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির অঙ্গসংগঠন নয়। উভয় সংগঠনই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-রাজনীতির প্ল্যাটফর্ম। ফলে রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং প্রত্যেক সরকারি বা দলীয় সিদ্ধান্তের নিঃশর্ত দায় বহন—এই দুটি এক নয়।
একজন শিক্ষক নীল দলের সদস্য হয়েও সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারেন। ‘প্রত্যয়’ আন্দোলনে সেটিই ঘটেছে। একইভাবে সাদা দলের একজন শিক্ষক বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী হয়েও একাডেমিক বিষয়ে স্বাধীন অবস্থান নিতে পারেন।
রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের প্রমাণ নয়; নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডই ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করবে।
শিক্ষকসমাজের বৃহত্তর ঐক্য
‘প্রত্যয়’ আন্দোলনে কেবল নীল ও সাদা দল নয়, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কসহ অন্যান্য শিক্ষকগোষ্ঠীও সংহতি জানিয়েছিল। তাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সরকারের সমালোচনার ভাষা ভিন্ন ছিল, কিন্তু প্রত্যয় স্কিম বাতিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের স্বতন্ত্র মর্যাদা রক্ষার দাবিতে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
এই ঐক্যের কারণ ছিল বাস্তব। আলাদা আলাদা রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত শিক্ষকসমাজ আমলাতন্ত্রের সঙ্গে দর-কষাকষিতে দুর্বল; কিন্তু ৫৪ বা ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা একসঙ্গে দাঁড়ালে সরকারকে আলোচনায় আসতে হয়।
৩ আগস্ট রাতে সরকার প্রত্যয় স্কিম প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানায় এবং পরবর্তী সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের ওই স্কিমের বাইরে রাখার বিষয়টি কার্যকর হয়। এরপর শিক্ষক ফেডারেশন আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
এটি ছিল শিক্ষকসমাজের সম্মিলিত আন্দোলনের একটি দৃশ্যমান সাফল্য—কোনো একক রঙের জয় নয়।
এক দিনের ব্যবধানে কী বদলে গেল?
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি এখানেই।
৩ আগস্ট পর্যন্ত যে ক্যাম্পাসে নীল দল ও সাদা দল আলাদা কর্মসূচি করেও পরস্পরের রাজনৈতিক অস্তিত্ব মেনে নিয়েছিল, ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর সেই সহনশীলতা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ল কেন? যে শিক্ষকেরা কয়েক দিন আগেও একই পেশাগত দাবিতে পাশাপাশি বসেছিলেন, তাঁদের একটি অংশ কীভাবে হঠাৎ সামষ্টিকভাবে সন্দেহভাজন, অগ্রহণযোগ্য কিংবা অধিকারবঞ্চিত হয়ে গেলেন?
পরবর্তী সময়ে নীল দল বা মুক্তিযুদ্ধপন্থী শিক্ষকদের কোনো কর্মসূচি—যেমন বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে ইফতার আয়োজন—বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই নথি, প্রক্টর কার্যালয়ের বিজ্ঞপ্তি, ক্লাব কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং আয়োজকদের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। যাচাইয়ের আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রশাসনিক কর্মকর্তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হবে না।
কিন্তু নীতিগত প্রশ্নটি এড়ানোর সুযোগ নেই:
৩০ জুলাই সাদা দল যদি বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে সরকারবিরোধী সংবাদ সম্মেলন করতে পারে, তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নীল দল কেন একই ক্লাবে শান্তিপূর্ণ সামাজিক বা সাংগঠনিক কর্মসূচি করতে পারবে না? নিরাপত্তা-ঝুঁকি থাকলে প্রশাসনের দায়িত্ব কি কর্মসূচি বাতিল করা, নাকি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা? এক পক্ষের মতপ্রকাশকে অধিকার এবং অন্য পক্ষের মতপ্রকাশকে উসকানি হিসেবে দেখা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপেক্ষতা কোথায় থাকে?
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়
সর্বশেষ সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে সাদা দল হেতে যে তিনজন শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁদের জয় কেবল নিজ দলের ভোটে এসেছে—এমন দাবি প্রমাণ ছাড়া করা যায় না। শিক্ষক-নির্বাচনে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, পেশাগত সম্পর্ক, একাডেমিক অবস্থান এবং দল-অতিক্রমী ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নীল দলের শিক্ষকেরাও যদি সাদা দলের কোনো প্রার্থী বা বর্তমান প্রশাসনের কোনো শিক্ষকনেতাকে ভোট দিয়ে থাকেন, তবে নির্বাচিত প্রতিনিধির দায় কেবল নিজ সমর্থকদের প্রতি সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি পুরো শিক্ষকসমাজের প্রতিনিধি।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন পাওয়া নেতৃত্বের প্রথম দায়িত্ব হলো সংখ্যালঘু মতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষা করাই গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সৌহার্দ্য কোথায় হারাল?
জুলাইয়ের শিক্ষক-ঐক্য হয়তো আদর্শিক ঐক্য ছিল না; ছিল পেশাগত প্রয়োজনের ঐক্য। কিন্তু সেই ঐক্য দেখিয়েছিল, মতপার্থক্য বজায় রেখেও শিক্ষকসমাজ একই দাবিতে দাঁড়াতে পারে এবং এক পক্ষের পৃথক কর্মসূচি অন্য পক্ষ সহ্য করতে পারে।
৫ আগস্টের পর সেই সৌহার্দ্য ভেঙে যাওয়া কেবল নীল ও সাদা দলের সম্পর্কের সংকট নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি, একাডেমিক স্বাধীনতা, সহনশীলতা এবং শিক্ষকদের সামষ্টিক দর-কষাকষির শক্তির সংকট।
বিভক্ত শিক্ষকসমাজ শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ রক্ষা করে? শিক্ষকদের, নাকি সেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল রাখতে চায়?
‘প্রত্যয়’ আন্দোলনের শিক্ষা ছিল—ঐক্যবদ্ধ শিক্ষকসমাজ সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাতে পারে। পরবর্তী বিভাজনের শিক্ষা হচ্ছে—রাজনৈতিক প্রতিশোধের চক্রে শিক্ষকসমাজ নিজেই নিজের শক্তি ক্ষয় করতে পারে।
জুলাই ২০২৪-এর ক্যাম্পাস তাই আজও একটি প্রশ্ন রেখে যায়: মত ভিন্ন হতে পারে, ইতিহাসের ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে, রাজনৈতিক আদর্শও ভিন্ন হতে পারে—কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কি সবার জন্য সমান হবে না?
এই প্রশ্নের উত্তর নীল দল বা সাদা দলের একার নয়। এর উত্তর দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি এবং সমগ্র শিক্ষকসমাজকে।
‘বিভক্ত শিক্ষকসমাজ কার স্বার্থ রক্ষা করছে?’
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক ও শিক্ষানীতি গবেষক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনপূর্ণ। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে আমলাতন্ত্রের একটি অংশের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বিভিন্ন সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে।
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য নীতি প্রণয়নের সময় তাঁদের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা না করে আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তেও আমরা তার প্রতিফলন দেখেছি। এটি শুধু আর্থিক সুবিধার প্রশ্ন ছিল না; এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নও জড়িত ছিল।”
ওই অধ্যাপকের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘প্রত্যয়’ আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—রাজনৈতিক ও আদর্শিক পার্থক্য অতিক্রম করে শিক্ষকসমাজ ঐক্যবদ্ধ হলে সরকারের একটি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করানো সম্ভব। নীল দল, সাদা দল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এবং দলীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা শিক্ষকেরা নিজ নিজ প্ল্যাটফর্ম থেকে আন্দোলন করলেও তাঁদের প্রধান দাবি ছিল অভিন্ন। সেই সম্মিলিত চাপই শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের ‘প্রত্যয়’ স্কিমের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তিনি বলেন, “শিক্ষকেরা যদি তখন বিভক্ত থাকতেন, তাহলে দাবি আদায় অত্যন্ত কঠিন হতো। নতুন প্রজন্মের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়তো সেই পেনশনকাঠামোর মধ্যেই প্রবেশ করতে হতো। এতে শুধু অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির আকর্ষণ এবং শিক্ষকতার সামগ্রিক মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।”
‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’—অভিযোগ, নাকি অনুসন্ধানের বিষয়?
ওই গবেষক বর্তমান শিক্ষক-রাজনীতির বিভাজনকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, কোনো শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ, সহিংসতা কিংবা পেশাগত অসদাচরণে জড়িত থাকলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর বিচার হতে পারে। কিন্তু দলীয় বা আদর্শিক পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি সম্পূর্ণ শিক্ষকগোষ্ঠীকে সন্দেহের মধ্যে ফেলা হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর ওপর পড়ে না; পুরো শিক্ষকসমাজের সামষ্টিক শক্তি দুর্বল হয়ে যায়।
“ডিভাইড অ্যান্ড রুল বা বিভক্ত করে নিয়ন্ত্রণ করা ক্ষমতাকাঠামোর একটি পুরোনো কৌশল,” তিনি বলেন। “শিক্ষকেরা নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তাঁদের পেশাগত দাবি, স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো, গবেষণা-সুবিধা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নগুলো পেছনে চলে যায়। তখন অন্য শক্তির পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।”
তবে শিক্ষকসমাজের বর্তমান বিরোধকে কোনো পরিকল্পিত “ষড়যন্ত্র” হিসেবে প্রমাণ করার মতো প্রত্যক্ষ নথি এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়, অনুসন্ধানযোগ্য আশঙ্কা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। কারা বিভাজন থেকে সুবিধা পাচ্ছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন পর্যায়ে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব কমছে এবং শিক্ষকসমাজের অনৈক্যের সময়ে নতুন কোনো প্রশাসনিক বা আর্থিক নীতি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তথ্য ও নথির ভিত্তিতে খোঁজা প্রয়োজন।
ব্যক্তির দায় ব্যক্তির, মতাদর্শের নয়
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অধ্যাপকের মতে, ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি হওয়া উচিত—ব্যক্তির দায় ব্যক্তির ওপরই বর্তাবে। কেউ বেআইনি কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলে তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে; কিন্তু নীল দল, সাদা দল বা অন্য কোনো সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাকে অপরাধের বিকল্প প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
তিনি বলেন, “দলীয় পরিচয় দেখে শাস্তি এবং রাজনৈতিক সুবিধা দেখে ক্ষমা—দুটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ক্ষতিকর। এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না; কেবল প্রতিশোধের চক্র তৈরি হয়। আজ একটি পক্ষ আক্রান্ত হলে কাল ক্ষমতার পরিবর্তনে অন্য পক্ষ আক্রান্ত হবে।”
এই পর্যবেক্ষণ জুলাই ২০২৪-এর অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সামনে আনে। তখন শিক্ষকেরা মতাদর্শগত পার্থক্য বজায় রেখেও নিজেদের পেশাগত অস্তিত্বের প্রশ্নে এক হতে পেরেছিলেন। একই ক্যাম্পাসে পৃথক রাজনৈতিক কর্মসূচি হয়েছে; কিন্তু পর্যালোচিত সংবাদে এক পক্ষ অন্য পক্ষের সভা ভেঙে দিয়েছে কিংবা শিক্ষককে মতাদর্শের কারণে মবের মুখে ঠেলে দিয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
সামনে বড় প্রশ্ন
বর্তমান বিভাজন যদি আরও গভীর হয়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদেরই। স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো, গবেষণা বরাদ্দ, আবাসন, চিকিৎসা, পেনশন, শিক্ষক নিয়োগের মান, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলোতে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
ফলে প্রশ্নটি শুধু নীল দল ও সাদা দলের সম্পর্কের নয়। প্রশ্নটি হলো—শিক্ষকসমাজ নিজেদের মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের মধ্যে রাখবে, নাকি সেই বিভাজনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবে যেখানে শিক্ষকসমাজের সামষ্টিক দর-কষাকষির শক্তিই বিলীন হয়ে যায়?
৫ আগস্টের পর প্রশ্নটি কেন আরও গুরুত্বপূর্ণ?
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অতীতের ভূমিকা পর্যালোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোনো শিক্ষক সহিংসতা উসকে দিয়েছেন কি না, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন কি না, মিথ্যা মামলা, নির্যাতন কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত অবশ্যই হতে পারে।
কিন্তু তদন্ত এবং সমষ্টিগত দোষারোপ এক বিষয় নয়।
“নীল দল করেছেন”, “একটি নির্দিষ্ট আদর্শে বিশ্বাস করেন” কিংবা “আগের সরকারের সময়ে পদে ছিলেন”—এগুলো কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে না। অপরাধ বা পেশাগত অসদাচরণ নির্ধারণ করতে হলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, যাচাইযোগ্য প্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কারণসংবলিত সিদ্ধান্ত।
এই নীতির পরিবর্তে যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শ্রেণিকক্ষ থেকে সরিয়ে দেওয়া, কক্ষ তালাবদ্ধ করা, গবেষণা ও তত্ত্বাবধান বন্ধ করা, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা দলগত শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে সেটি ন্যায়বিচার নয়—ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে প্রতিশোধের ভাষা বদলে যাওয়া মাত্র।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়, নীতির ধারাবাহিকতায়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চরিত্রের পরীক্ষা তখনই হয়, যখন প্রতিষ্ঠানটি নিজের অপছন্দের মতকেও কথা বলতে দেয়। জুলাই ২০২৪-এ বিরোধী শিক্ষকগোষ্ঠী সরকারবিরোধী সংবাদ সম্মেলন ও সমাবেশ করতে পেরেছিল—এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিন্নমত ধারণের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। কিন্তু সেই অধিকার যদি কেবল একটি পক্ষের জন্য প্রযোজ্য হয়, তবে তা আর অধিকার থাকে না; হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সুবিধা।
যাঁরা ৩০ জুলাই সংবাদ সম্মেলনের অধিকার পেয়েছিলেন এবং ৩ আগস্ট প্রকাশ্য র্যালি করতে পেরেছিলেন, তাঁদের অধিকার যেমন সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন ছিল, তেমনি ৫ আগস্টের পর নীল দল, আওয়ামীপন্থী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অথবা অন্য যেকোনো মতাদর্শের শিক্ষককেও প্রমাণ ছাড়া অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই কোনো দলকে নির্দোষ বা দোষী ঘোষণা করা নয়। প্রশ্নটি হলো: ভিন্নমতের অধিকার তখন স্বীকৃত হলে, ৫ আগস্টের পর একই অধিকার কোথায়? মতাদর্শ কি অপরাধ—নাকি সবার জন্য সমান হবে ন্যায়বিচার? বিশ্ববিদ্যালয় যদি এই প্রশ্নের নীতিনিষ্ঠ উত্তর দিতে না পারে, তবে ক্ষমতার রং বদলাবে—কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের সংকট বদলাবে না।
লেখক: বিশেষ প্রতিবেদক, অধিকারপত্র


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: