সংসদ প্রতিবেদক | অধিকার পত্র ডটকম
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর পরিবর্তে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেন। প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে র্যাব গঠনের বিদ্যমান আইনি বিধান বাতিল করে পুলিশের অধীনে নতুন এই ইউনিট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিল উত্থাপনের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম আপত্তি জানান।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘র্যাব’ নামে কোনো সংস্থা থাকবে না—এটি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। তবে পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা থাকায় সেই প্রয়োজন পূরণ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এসআরবি গঠনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।
র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা পুরো পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করার কারণ হতে পারে না।
এসআরবিতে বাড়বে জবাবদিহি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, প্রস্তাবিত এসআরবিতে র্যাবের তুলনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য আরও শক্তিশালী বিধান রাখা হয়েছে।
তিনি বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের বিলটি সংসদীয় কমিটিতে যাচাই-বাছাইয়ের সময় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রস্তাবিত আইনে র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, দায়-দেনা, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার ও অন্যান্য নথিপত্র এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী এসআরবি পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ সদস্য, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং নির্ধারিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন বা প্রেষণের মাধ্যমে ইউনিটটি গঠন করা হবে।
এসআরবির জন্য নির্ধারিত পতাকা, প্রতীক ও ইউনিফর্ম থাকবে। ইউনিটটির মহাপরিচালক হিসেবে একজন কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তার পদমর্যাদা অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নিচে হবে না।
তদন্ত, গ্রেপ্তার ও তল্লাশির ক্ষমতা
প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের পাশাপাশি তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং মালামাল বা আলামত জব্দের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব আলামত ও জব্দ করা সামগ্রী সংরক্ষণের জন্য ইউনিটটির নিজস্ব মালখানার ব্যবস্থাও থাকবে।
নাগরিকদের অভিযোগ এবং ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একাধিক সদস্য নিয়ে একটি ‘অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধসহ গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করাই হবে এই ইউনিট গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
একই সঙ্গে এসআরবির ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রস্তাবিত আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরে বিলটি যাচাই-বাছাই করে চার কর্মদিবসের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
এপিবিএনের জন্যও নতুন আইনি কাঠামোর উদ্যোগ
এদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’-ও জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। বিদ্যমান অধ্যাদেশ বাতিল করে এপিবিএনের জন্য নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করাই এ বিলের লক্ষ্য।
প্রস্তাবিত আইনে পুলিশের অধীনে বিভিন্ন এপিবিএন ইউনিট, যেমন—স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন, হিল ব্যাটালিয়ন ও এয়ারপোর্ট ব্যাটালিয়নসহ সরকার নির্ধারিত অন্যান্য ব্যাটালিয়নের কার্যক্রমের বিধান রাখা হয়েছে।
বিল অনুযায়ী, এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি প্রচলিত আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী কোনো প্রাঙ্গণে প্রবেশ, তল্লাশি, সম্পত্তি জব্দ এবং গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এপিবিএন সদস্যদের শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির বিষয়ও বিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণভাবে কোনো সংগঠনের সদস্য হওয়া কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার ওপর বিধিনিষেধ থাকবে। তবে পেশাগত উন্নয়ন বা এপিবিএনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে অনুমতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সংবাদপত্রে কোনো তথ্য কিংবা নথিপত্র প্রকাশ করা বা প্রকাশে সহায়তা করা থেকে এপিবিএন সদস্যদের বিরত থাকার বিধান রাখা হয়েছে।
এপিবিএন বিলটিও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: