odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 13th October 2026, ১৩th October ২০২৬
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসে আগাম প্রস্তুতি, ঝুঁকিমুক্ত ভবন নির্মাণ, নদী-খাল সংরক্ষণ ও দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান।

শিরোনাম: ভূমিকম্পে ভয়াবহ বিপর্যয়ের শঙ্কা ঢাকায়, পরিকল্পিত নগরায়ণের তাগিদ রাষ্ট্রপতির

odhikarpatra | প্রকাশিত: ১৩ October ২০২৬ ১৮:৪০

odhikarpatra
প্রকাশিত: ১৩ October ২০২৬ ১৮:৪০

বিশেষ  প্রতিবেদক | অধিকারপত্র ডটকম

প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি, বাস্তবভিত্তিক নগর পরিকল্পনা এবং ঝুঁকিমুক্ত অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণের কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকায় ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ নিয়েও আরও বেশি চিন্তা করা প্রয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে পরিকল্পিত নগরব্যবস্থা না থাকায় দুর্যোগের সময় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে। তাই বাড়িঘর নির্মাণ, নগর ব্যবস্থাপনা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং নদীদূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে ঢাকা

রাজধানীর ভূমিকম্পঝুঁকি তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঢাকা শহরের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বড় ভূমিকম্প হলে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং যথাযথ পরিকল্পনার অভাব দুর্যোগের বিপদ বাড়িয়ে দিতে পারে।

তিনি বলেন, কাঠমান্ডু ও তেহরানের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রসঙ্গ থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় পরিকল্পিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

রাষ্ট্রপতির মতে, শুধু দুর্যোগের পর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করলেই হবে না; দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে বাংলাদেশের ঝুঁকি

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দুর্যোগ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, ভূমিধস, খরা, বজ্রপাত ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি এ দেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী।

তিনি ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কথা স্মরণ করে বলেন, ওই দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এবং রাষ্ট্রের ওপর এর প্রভাবের বড় উদাহরণ।

বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাংলাদেশের দায় অত্যন্ত সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও অন্যান্য পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।

 সতর্কবার্তা থেকে আগাম পদক্ষেপে যেতে হবে

দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতাও বেড়েছে।

তবে এখন আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার পাশাপাশি আগাম পদক্ষেপ গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রস্তুতি নিতে হবে এবং দুর্যোগের পর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নদীভাঙন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য আইন প্রণয়নের আহ্বান

দুর্যোগ মোকাবিলায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকার প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁদের বিষয়ে এখনো প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় স্বেচ্ছাসেবকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও সুসংগঠিত করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার।

এ সময় তিনি দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের সচেতনতার প্রশংসা করেন। বিশেষ করে সিলেটের হাওর অঞ্চলের মানুষের আগাম প্রস্তুতি এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের উদ্যোগের প্রশংসা করেন তিনি।

 পরিবার থেকে শুরু হোক প্রস্তুতি

দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের দায়িত্বের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, নিজেদের ঘরবাড়ি নিরাপদ করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদেরও দুর্যোগ প্রস্তুতির আওতায় আনতে হবে।

জরুরি কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদে রাখা, সরকারের সতর্কবার্তায় দ্রুত সাড়া দেওয়া, স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং নদী-খাল রক্ষা ও বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার প্রায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তাঁর আশা, এ উদ্যোগ দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানির প্রবাহ ব্যবস্থাপনার জন্য খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। বর্তমান সরকারও এ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব কর্মসূচি আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যারা

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এবং সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুন্সী রফিকুল আলম।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান।

এর আগে রাষ্ট্রপতি অনুষ্ঠানস্থলে স্থাপিত বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন এবং বক্তব্যের আগে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমনবিষয়ক একটি প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শন করা হয়।

রাষ্ট্রপতি সম্মিলিত উদ্যোগে দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সহনশীলতার সূচনা হোক ঘর থেকে। আসুন, ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে চলি এবং দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলি।”