অধিকারপত্র সম্পাদকীয়│১৬ অক্টোবর ২০২৬
শারদীয় দুর্গোৎসবের মণ্ডপে আলো জ্বলিলে শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন দৃশ্যমান হয় না; একই জনপদে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের নিরাপদে বসবাসের সামর্থ্যও পরীক্ষিত হয়। ঢাকের বাদ্য ও শুভেচ্ছার আড়ালে কোনো পরিবার যদি আতঙ্কে দিন কাটায়, তবে উৎসবের সামাজিক সার্থকতা অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি আন্তরিক শারদীয় শুভেচ্ছা জানাইয়া অধিকার পত্রের অবস্থান স্পষ্ট: ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা, গুজবের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল প্রতিরোধ এবং হামলার নিরপেক্ষ বিচারকে একই নাগরিক কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত করিতে হইবে।
সম্প্রীতি কেবল সৌজন্যের শব্দ হইলে সংকটের মুহূর্তে তাহার শক্তি থাকে না। প্রতিবেশীর আনন্দে শুভেচ্ছা জানানো মূল্যবান; কিন্তু তাঁহার নিরাপত্তা বিপন্ন হইলে পাশে দাঁড়ানো অধিক জরুরি। কোনো সম্প্রদায়ের উৎসব নির্বিঘ্নে পালিত হইবে কি না, তাহা স্থানীয় প্রভাবশালীর সদিচ্ছার উপর নির্ভর করিতে পারে না। নাগরিকের মর্যাদা অনুগ্রহের বিষয় নহে। রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিকল্প হিসাবে সামাজিক সহযোগিতাকে দাঁড় করানোও অনুচিত; বরং উভয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন প্রয়োজন।
বাংলার সাহিত্য ও সংগীত এই পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূল্যবান শিক্ষা বহন করে। কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত সম্ভারে শ্যামাসংগীত, ভজন ও কীর্তনের পাশাপাশি হামদ, নাত ও মর্সিয়া স্থান পাইয়াছে। এই বহুমুখিতা দেখায়, অন্যের বিশ্বাসের অনুভূতি বুঝিবার প্রয়াস নিজের পরিচয় বিলোপের শর্তে আবদ্ধ নহে। তবে শিল্পের এই ইতিহাস দিয়া বর্তমানের বৈষম্য ঢাকিয়া রাখা চলিবে না। উত্তরাধিকারের যথার্থ সম্মান তখনই হইবে, যখন জীবিত মানুষের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তায় তাহার প্রতিফলন ঘটিবে। বিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাঠচক্রে এই রচনাগুলি প্রেক্ষাপটসহ আলোচিত হইলে তরুণেরা ভিন্ন বিশ্বাসকে অনুমানের পরিবর্তে অধ্যয়ন ও সংলাপের মাধ্যমে জানিবার সুযোগ পাইবে।
বিপদের ইতিহাসও স্মরণযোগ্য। ২০১২ সালে রামুতে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ও গুজব ছড়াইবার পর বৌদ্ধবিহার এবং বসতবাড়িতে হামলা হইয়াছিল। ২০১৭ সালে রংপুরের ঠাকুরপাড়ায় কথিত ধর্ম অবমাননামূলক ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করিয়া হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ঘটে। ঘটনাদ্বয়ের শিক্ষা কোনো প্রযুক্তিকে একমাত্র অপরাধী ঘোষণা করা নহে। উসকানি ছড়ানো, মানুষ জড়ো করা এবং হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত মানুষেরই; সেই দায়িত্ব নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত না করিলে প্রতিরোধের পথও অস্পষ্ট থাকিবে।
একটি সংগত আপত্তি এই যে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উপেক্ষা করিলে ক্ষোভ বাড়িতে পারে; আবার নিরাপত্তার নামে নির্বিচারে নজরদারি চালাইলে মতপ্রকাশ সংকুচিত হইতে পারে। উভয় আশঙ্কাই গুরুত্বের দাবি রাখে। অভিযোগ গ্রহণ, তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনমতো আইনানুগ প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তি, তাঁহার পরিবার কিংবা সমগ্র সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জনতার শাস্তি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। অভিযোগের তদন্ত এবং মানুষের সুরক্ষা পৃথক দায়িত্ব; প্রথমটির অজুহাতে দ্বিতীয়টি স্থগিত রাখা যায় না।
আরও একটি সীমা স্বীকার করা প্রয়োজন। উৎসবস্থলে উপস্থিতি কিংবা অন্য ধর্মের আচার পালনে অংশগ্রহণ সম্প্রীতির বাধ্যতামূলক পরীক্ষা হইতে পারে না। কেহ ধর্মীয় কারণে দূরত্ব রাখিয়াও প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় আন্তরিক হইতে পারেন। সামাজিক সৌহার্দ্যের দাবি হইবে পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীনতা; বিশ্বাসের অভিন্নতা নহে। এই পার্থক্য মানিয়া চলিলে সহযোগিতার পরিসর প্রসারিত হইবে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার আহ্বান অধিক মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য হইবে।
প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ হইতে পারে মণ্ডপভিত্তিক লিখিত যোগাযোগ ও জরুরি সাড়াদানের পরিকল্পনা। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও আয়োজকেরা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম, যোগাযোগের উপায়, প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ এবং চিকিৎসাসহায়তার ব্যবস্থা আগেই নির্ধারণ করিবেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিধিরাও প্রয়োজনীয় তথ্য জানিবেন। স্বেচ্ছাসেবকের কাজ হইবে পথনির্দেশ, সহায়তা ও বিপদের সংবাদ পৌঁছানো; সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ঘেরাও বা জেরা করা নহে। নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের চলাচলের প্রয়োজন পরিকল্পনার শুরুতেই বিবেচিত হইতে হইবে।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ অনলাইন উত্তেজনার দ্রুত ও সংযত মোকাবিলা। আপত্তিকর পোস্ট দেখিলে নাগরিকেরা তাহা পুনঃপ্রচার না করিয়া মূল সংযোগ, প্রকাশের সময় ও প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করিতে পারেন। বিশ্বাসযোগ্য হুমকি থাকিলে আয়োজক ও পুলিশকে জানাইতে হইবে। কর্তৃপক্ষ যাচাই করিয়া যতটুকু নিশ্চিত তথ্য প্রকাশযোগ্য, তাহা দ্রুত জানাইবেন; অনিশ্চয়তাও স্পষ্ট করিবেন। সম্পূর্ণ তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত নীরব থাকিলে গুজবের জায়গা বাড়িতে পারে, আবার অনুমানকে সত্য বলিলে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হইবে।
সংবাদমাধ্যম ও ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্বও সুনির্দিষ্ট। অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্যের ভাষায় শিরোনাম করা, উসকানিমূলক ছবি বারবার দেখানো কিংবা যাচাই ছাড়াই পরিচয় প্রকাশ করা বিপন্নতা বাড়াইতে পারে। সংবাদে প্রমাণের অবস্থা, সংশ্লিষ্ট মানুষের বক্তব্য এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন অগ্রাধিকার পাইবে। ধর্মীয় নেতারা নিজ নিজ অনুসারীকে জানাইবেন, আপত্তির প্রতিকার চাহিবার পথ শান্তিপূর্ণ ও আইনানুগ। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য; অপরাধীর পরিচয়ের ভিত্তিতে নিন্দা বা নীরবতা বাছাই চলিবে না।
এই ব্যবস্থার প্রথম প্রত্যাশিত সুফল সরাসরি মানুষের জীবনে পৌঁছাইবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সহায়তার পথ জানা থাকিলে বিপন্ন পরিবার দ্রুত সংবাদ দিতে পারিবে, আয়োজনের ভিড় সামলানো সহজ হইবে এবং জরুরি সাড়াদানে বিলম্ব কমিবার সুযোগ তৈরি হইবে। দ্বিতীয় সুফল সামাজিক আস্থার: অভিযোগের তদন্ত ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা দৃশ্যমান হইলে নিরপরাধ মানুষের আতঙ্ক এবং প্রতিশোধের আহ্বান দুর্বল হইতে পারে। তাহার জন্য অবশ্য নিয়মের প্রয়োগ সকলের ক্ষেত্রে সমান হওয়া আবশ্যক।
তবে যোগাযোগ কমিটি গঠনই সাফল্যের প্রমাণ নহে। স্থানীয় ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রণে তাহা ক্ষতিগ্রস্তের অভিযোগ চাপা দেওয়ার মাধ্যমও হইতে পারে। সেই ঝুঁকি ঠেকাইতে সরাসরি প্রশাসনের নিকট অভিযোগ জানাইবার বিকল্প পথ, অভিযোগের লিখিত প্রাপ্তিস্বীকার এবং অগ্রগতি জানিবার সুযোগ রাখিতে হইবে। হামলা ঘটিলে নিরাপত্তা ও চিকিৎসার পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি নথিবদ্ধকরণ, সাক্ষীর সুরক্ষা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। আপসের নামে বিচারপ্রার্থীর উপর চাপ সৃষ্টি করিলে সম্প্রীতির ভাষাই অন্যায়ের আশ্রয় হইয়া উঠিবে।
উৎসব শেষে আয়োজক ও প্রশাসন অভিযোগ, সাড়াদানের বিলম্ব এবং চলাচলের অসুবিধা পর্যালোচনা করিবেন; ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা সেখানে প্রাধান্য পাইবে। সৌহার্দ্যের মূল্যায়ন শুধু মণ্ডপের সংখ্যা বা শুভেচ্ছাবার্তার প্রাচুর্যে হইতে পারে না। অধিকার পত্র মনে করে, নিরাপদ দুর্গোৎসবের প্রয়োজনীয় শর্ত হইল সমান মর্যাদার বাস্তব নিশ্চয়তা এবং অন্যায়ের প্রতিকারের বিশ্বাসযোগ্য পথ। মহাষষ্ঠীর শুভেচ্ছা বিজয়ার পরও দায়িত্বের বন্ধনে স্থায়ী হউক। মণ্ডপের আলো তখনই সমাজের আলো হইবে, যখন তাহার পাশে কোনো প্রতিবেশীর ঘর ভয়ে অন্ধকার থাকিবে না।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com
