নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকারপত্র ডটকম
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি জয়ী হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক কিছুটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে। কিন্তু এর আড়ালে ইউরোপের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংকট। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ডেমোক্র্যাটদের জয় ইউরোপের উগ্র ডানপন্থার উত্থান নিয়ে আত্মতুষ্টি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতায় বাধ্য করার চেষ্টা আরও বাড়াতে পারেন, যা কিয়েভের স্বার্থের পরিপন্থী।
২৯ অক্টোবর প্রকাশিত আল জাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ইউরোপের রাজনৈতিক গতিপথ মৌলিকভাবে বদলে যাবে—এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। তবে এর পরোক্ষ প্রভাব ইউরোপের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর পড়তে পারে।
### ডেমোক্র্যাটদের জয় ইউরোপে আত্মতুষ্টি তৈরি করতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই কক্ষেই গড়ে প্রায় আট পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে দলটি।
কার্নেগি ইউরোপের গবেষক ক্যাথরিন ফিয়েশির মতে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে জয়ী হলে কিংবা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিলে ইউরোপের একাংশে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিজেই সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম। ফলে ইউরোপের উগ্র ডানপন্থি রাজনীতির ঝুঁকিকে অনেকে কম গুরুত্ব দিতে পারেন।
ফ্রান্সের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দেশটির কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা মেরিন লে পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে তাঁর সম্ভাব্য ভোটের হার প্রায় ৩৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিয়েশির আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটদের জয় ইউরোপে এমন বিতর্ক উসকে দিতে পারে—লে পেনের মতো নেতাদের নির্বাচনী উত্থান নিয়ে যে আশঙ্কা রয়েছে, তা কি সত্যিই এতটা গুরুতর, নাকি নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার বদলে যেতে পারে?
### ইউক্রেনের ওপর ট্রাম্পের চাপ বাড়ার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের দ্বিতীয় উদ্বেগ ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা শক্তিশালী অবস্থানে গেলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে সহজ হবে না। বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে ট্রাম্প ইউক্রেনকে দ্রুত রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় যেতে আরও বেশি চাপ দিতে পারেন।
আলোচনায় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এমন পদক্ষেপকে কৌশলগত ভুল বলে অভিহিত করেছেন। ইউক্রেনের অধিকাংশ নাগরিকও এ ধরনের ছাড়ের বিরোধিতা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এরই মধ্যে ইউক্রেনের ওপর চাপ তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তা এবং স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেভিগেশন-সুবিধাকে leverage হিসেবে ব্যবহার করেছেন। জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে রাশিয়ার বক্তব্যও তিনি দুইবার প্রতিধ্বনিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জিওপলিটিকসের ইউক্রেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভিক্টোরিয়া ভদোভিচেঙ্কোর মতে, ইউরোপে রাশিয়ার বহুমাত্রিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বন্ধ হয়নি। ইউরোপের বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়ে রাশিয়া তথ্য ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
### লে পেনের নীতিতে ইউরোপীয় ঐক্যও ঝুঁকিতে
ফ্রান্সে মেরিন লে পেন ক্ষমতায় এলে তাঁর কয়েকটি নীতিগত অবস্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজেটে ফ্রান্সের অবদান কমানো, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা হ্রাস এবং ইউরো মুদ্রা ছেড়ে অবমূল্যায়িত ফ্রাঁ চালুর সম্ভাবনা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনকে ফ্রান্সের সামরিক সহায়তা কমে গেলে দেশটির মোট বিদেশি সামরিক সহায়তার প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হতে পারে। কিয়েল ইনস্টিটিউটের ইউক্রেন সাপোর্ট ট্র্যাকারের তথ্যের বরাত দিয়ে এই হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপের অন্য দেশগুলোর ওপর ইউক্রেনকে সহায়তার বাড়তি দায়িত্ব পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঐক্যও চাপের মুখে পড়তে পারে।
### যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাচ্ছে ইউরোপ
ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অবস্থান এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রশ্নে বিতর্ক ইউরোপের জনমতেও প্রভাব ফেলেছে।
জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্টেলসম্যান স্টিফটংয়ের জরিপের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, ইউরোপীয়দের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র মনে করেন মাত্র ৩১ শতাংশ। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৫১ শতাংশ।
একই জরিপে ৭৩ শতাংশ ইউরোপীয় মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পরিবর্তে ইউরোপের নিজস্ব পথে এগোনো উচিত। ২০২৪ সালে এ মতের পক্ষে ছিলেন ৬৩ শতাংশ।
ইউরোপীয় কমিশনের স্প্রিং ইউরোব্যারোমিটার জরিপে ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা বৈশ্বিক সংকট ও নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জুন মাসের জরিপে ৩৬টি দেশের ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্পের ওপর আস্থা নেই বলে জানিয়েছেন। একই জরিপে ৫৭ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
### এক নির্বাচনে বদলাবে না ইউরোপের রাজনৈতিক বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় হলে ওয়াশিংটন ও ইউরোপের সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হতে পারে। তবে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, উগ্র ডানপন্থার উত্থান এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কেবল মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলের ওপর নির্ভর করছে না।
বিশ্লেষকদের মূল বার্তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য জয়কে ইউরোপের জন্য নিঃশর্ত স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং ইউরোপকে নিজেদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা সক্ষমতা এবং ইউক্রেনকে সহায়তার নীতি আরও শক্তিশালী করতে হতে পারে।
**SEO শিরোনাম:** মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় ইউরোপের জন্য কেন ঝুঁকি?
**ফেসবুক ভাইরাল শিরোনাম:** ট্রাম্পের দল হারলেও বিপদ কাটছে না ইউরোপের! লে পেনের উত্থান ও ইউক্রেন নিয়ে নতুন শঙ্কা
**SEO কীওয়ার্ড:** যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬, ডেমোক্র্যাটদের জয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইউরোপের রাজনীতি, মেরিন লে পেন, ফ্রান্সের নির্বাচন, ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়া, ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
**হ্যাশট্যাগ:** #USMidterms2026 #DonaldTrump #Europe #MarineLePen #UkraineWar #Russia #AlJazeera #Odhikarpatra
