অধিকার পত্র ডটকম আন্তর্জাতিক ডেক্স :
মূল সংবাদ
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর দেশটির পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
আলজাজিরার ৫ নভেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের যুদ্ধনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর আইনপ্রণেতাদের নজরদারি এবং রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
তবে নির্বাচনে জয় পেলেও ডেমোক্র্যাটদের হাতে প্রেসিডেন্টের ভেটো বাতিল করার মতো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ফলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে তাদের সামনে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকবে।
ইরান যুদ্ধ: অর্থায়ন বন্ধে চাপ দিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা
ইরান যুদ্ধ এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধের ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের জন্য প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে আলজাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনের পর ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ক্ষতি হয়েছে। তবে তিনি সামরিক অভিযানকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে দাবি করেছেন।
ডেমোক্র্যাট সিনেট নেতা চাক শুমার বলেছেন, কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা ব্যবহার করে জনগণের সম্মতি ছাড়া পরিচালিত যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকায় সামরিক ব্যয় বন্ধ করা সহজ হবে না। ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন ব্যবহার করেও ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হতে পারে।
গাজা: ইসরায়েলের সামরিক সহায়তা নিয়ে বাড়তে পারে চাপ
গাজা ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানেও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে দলটির বড় একটি অংশ ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন দিয়ে এলেও নতুন নির্বাচিত প্রগতিশীল নেতাদের অনেকে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও অর্থ সহায়তার সমালোচনা করছেন।
মিশিগান থেকে নির্বাচিত আবদুল এল-সায়েদ ইসরায়েলকে মার্কিন সহায়তা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
অন্যদিকে, নির্বাচনের দিন ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা বন্ধ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। তবে নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি, সামরিক সহায়তা এবং গাজায় মার্কিন অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে তদন্ত ও শুনানির উদ্যোগ নিতে পারেন।
তবে দলের সব সদস্যের অবস্থান এক নয়। ফলে ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
ইউক্রেন: আবারও কি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাবে কিয়েভ?
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে নতুন আশার কথা জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা কমানো, অস্ত্র সরবরাহ বিলম্বিত করা এবং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে আলজাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা সাধারণভাবে ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষে।
জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম জেডডিএফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ইউক্রেনকে সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। নতুন কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হলে ইউক্রেন আরও সহায়তা পেতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলেই অস্ত্র সরবরাহ বা সামরিক সহায়তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না। এ জন্য বাজেট, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আইনপ্রণেতাদের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
জানুয়ারি থেকে শুরু হবে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয় পেলেও নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব গ্রহণ করবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে। তার আগ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে কংগ্রেস।
নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের অর্থায়ন, সামরিক সহায়তা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন।
তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা এবং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব তাদের বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে থাকবে।
অধিকার পত্র ডটকমের বিশেষ বিশ্লেষণ
২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তন নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও যুদ্ধনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
* ইরান: যুদ্ধের অর্থায়ন ও সামরিক অভিযান নিয়ে কংগ্রেসের চাপ বাড়তে পারে।
* গাজা: ইসরায়েলকে অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
* ইউক্রেন: কিয়েভের জন্য মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে শুধু প্রেসিডেন্ট নন, কংগ্রেসেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী জয় সেই ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনছে। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ, ইসরায়েলের সহায়তা প্রত্যাহার কিংবা ইউক্রেনকে নতুন করে অস্ত্র দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত এখনো নিশ্চিত নয়।
সূত্র: আলজাজিরা, ৫ নভেম্বর ২০২৬; রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের নির্বাচনী প্রতিবেদন। Al Jazeera +3
