odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 30th April 2026, ৩০th April ২০২৬
মহান মে দিবস ও শ্রমিক শ্রেণির অধিকার: মজুরি বৈষম্য, রেশনিং এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা

পুঁথির পিঠে চড়া বাস্তব, কিংবা হাসিতে বিষের বাণী: শ্রমিক শ্রেণির জীবনমান উন্নয়ন ও রাষ্ট্র নির্মাণের অঙ্গীকার— মে দিবসে এক জ্বলন্ত প্রবন্ধ!

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৩০ April ২০২৬ ১৮:০৫

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৩০ April ২০২৬ ১৮:০৫

অধিকারপত্র ডটকম-এর বিশেষ সম্পাদকীয় প্রতিবেদন

মহান মে দিবস এলেই দেশজুড়ে লাল পতাকার ঢেউ আর গগনবিদারী স্লোগান শোনা যায়, কিন্তু রাজপথের সেই উত্তাপ শ্রমিকের জীর্ণ ঘরের উনুন পর্যন্ত পৌঁছায় না। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেটে যে ৮ ঘণ্টা কাজের লড়াই শুরু হয়েছিল, আধুনিক বাংলাদেশেও সেই সংগ্রামের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি। আজকের এই বিশেষ প্রবন্ধে শ্রমিক শ্রেণির জীবনমান, মজুরি বৈষম্য এবং তাদের অধিকার রক্ষায় ধর্মের ভূমিকা নিয়ে এক গভীর ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রবন্ধটিতে উঠে এসেছে এক নির্মম সত্য—বর্তমান বাজারে একজন শ্রমিকের পরিবারের গড় ব্যয়ের তুলনায় প্রাপ্ত মজুরি যৎসামান্য। ১২,৫০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি দিয়ে যেখানে চার সদস্যের সংসার চলে না, সেখানে রেশনিং ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। প্রবন্ধকার এখানে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম—প্রতিটি জীবনদর্শনই শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায্য মজুরিকে ইবাদত বা নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করেছে। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন; এখানে শ্রমিকরা আজও ধর্ম, অঞ্চল ও রাজনীতির নামে বিভক্ত। "দুনিয়ার মজদুর এক হও"—এই স্লোগানকে কেবল উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের দাবি তোলা হয়েছে এখানে। শ্রমিকের প্রাপ্য কোনো দয়া নয়, বরং অধিকার। মালিকের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর না করে শ্রমিকের ঐক্যবদ্ধ শক্তিই পারে একটি শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে।

কিউয়ার্ডস: মে দিবস, শ্রমিক অধিকার, ন্যূনতম মজুরি, রেশনিং ব্যবস্থা, শ্রমিক ঐক্য, শিল্প বিপ্লব, শিকাগো আন্দোলন, শ্রমিকের মর্যাদা, ইসলাম ও শ্রমিক অধিকার, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন।

মালিকের দেয়ালে সোনার হাতা, শ্রমিকের জামায় তালি

মহান মে দিবস এলেই দেশের সর্বত্র এক অদ্ভুত দ্বৈত দৃশ্যপট তৈরি হয়। একদিকে লাল পতাকার ঢেউ, মিছিলের স্লোগান, সভা-সেমিনারে উচ্চারিত দৃঢ় প্রতিশ্রুতি; অন্যদিকে একই শ্রমিকের ক্লান্ত মুখ, ভাঙা শরীর, অনিশ্চিত আগামী। এই বৈপরীত্যই আমাদের সময়ের সবচেয়ে তীব্র বাস্তবতা। কথা অনেক, প্রতিশ্রুতি আরও বেশি—কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ যেন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।

সত্যি বলতে কী, এই সময়টাতে অনেকের মতো আমিও হাসি। কারণ আলোচনাসভার অনেক মঞ্চে এমন বক্তাদের দেখা যায়, যাদের জীবনে শ্রমিকের ঘাম নেই, আছে কেবল বক্তৃতার ভাষা। তারা শ্রমিকের জীবন নিয়ে এমনভাবে কথা বলেন, যেন বই পড়ে শেখা কোনো কল্পকাহিনি বর্ণনা করছেন। এই হাসি অবশ্য নিছক আনন্দের নয়—এ এক ধরনের ব্যঙ্গ, যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘশ্বাস।

আজকের এই আলোচনায় তাই আমরা সরাসরি বাস্তবতার মুখোমুখি হব—হাস্যরসের আড়ালে, কিন্তু তীক্ষ্ণ সত্যের আলোয়।

মে দিবস: ইতিহাসের রক্তাক্ত আহ্বান

১৮৮৬ সালের শিকাগো। শিল্পবিপ্লবের উত্তাপে দগ্ধ এক সময়। শ্রমিকরা দিনের পর দিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করছে—কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, নেই বিশ্রামের নিশ্চয়তা। এই অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে তারা একত্রিত হলো একটি সরল দাবিতে—“আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা ব্যক্তিগত জীবন।”

এই দাবির পেছনে ছিল জীবন-মৃত্যুর সংগ্রাম। হে মার্কেটের সেই রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে শ্রমিকরা শুধু একটি দাবি উত্থাপন করেনি; তারা মানবিক শ্রমব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। সেই সংগ্রামের ফলেই আজ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে আট ঘণ্টার কর্মদিবস স্বীকৃত।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অর্জন কি সত্যিই সর্বত্র বাস্তবায়িত হয়েছে?

স্লোগানের আড়ালে বিভক্ত বাস্তবতা

“দুনিয়ার মজদুর এক হও”—এই স্লোগানটি আজও প্রতিধ্বনিত হয়। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিক সমাজ কতটা ঐক্যবদ্ধ?

আজকের বাস্তবতা হলো, শ্রমিকরা নানা পরিচয়ে বিভক্ত—ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল, রাজনৈতিক মতাদর্শ। একই কারখানায় কাজ করা দুই শ্রমিকও অনেক সময় একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। ফলে যে শক্তি একত্রিত হলে পরিবর্তন সম্ভব, তা ভেঙে যায় ছোট ছোট খণ্ডে।

ঐতিহাসিকভাবে এই বিভাজনের শিকড় রয়েছে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিতে। ঔপনিবেশিক শাসকরা যে কৌশল ব্যবহার করেছিল, তা আজও ভিন্ন আকারে বিদ্যমান। শুধু শাসক পাল্টেছে, কৌশল নয়।

ধর্মীয় বয়ান বনাম অর্থনৈতিক বাস্তবতা

আমাদের সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিশ্রমকে পুণ্যের কাজ হিসেবে দেখা হয়—এটি একটি ইতিবাচক ধারণা। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই ধারণাকে ব্যবহার করে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারকে আড়াল করা হয়।

শ্রমিককে বলা হয়—ধৈর্য ধরো, পরিশ্রম করো, আল্লাহ বা ঈশ্বর পুরস্কার দেবেন। কিন্তু সেই পুরস্কার যদি শুধু পরকালের প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, আর বর্তমান জীবনে সে ন্যায্য মজুরি না পায়—তাহলে এই বয়ান প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ধর্ম কখনোই শোষণকে সমর্থন করে না। বরং সব ধর্মেই ন্যায্যতা, সমতা ও মানবিক আচরণের কথা বলা হয়েছে। তাই ধর্মীয় মূল্যবোধকে ব্যবহার করে শ্রমিকের অধিকার খর্ব করা এক ধরনের নৈতিক বিকৃতি।

শ্রমিক অধিকার ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি

শ্রমিক শ্রেণির অধিকার নিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি একটি গভীর ও মানবিক বিষয়। বিশেষ করে ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মে শ্রমিকের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি, সম্মানজনক আচরণ ও ন্যায়বিচারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই অধিকারগুলো শুধু আইনি নয়; বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচিত।

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার মানবসভ্যতার এক মৌলিক নৈতিক ভিত্তি। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, প্রায় সব প্রধান ধর্মেই শ্রম, ন্যায্য মজুরি, মর্যাদা ও মানবিক আচরণের ওপর গভীর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম—প্রতিটি ধর্মেই শ্রমিকের অধিকারকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখা হয়।

  • ইসলামে শ্রমিক অধিকার: ইসলামে শ্রমিকের অধিকার অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে শ্রমিককে ভাইয়ের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কর্মচারীরা তোমাদের ভাই… তাদের সাধ্যের বাইরে কাজ দিও না; আর দিলে সাহায্য করো” (বুখারি)।কুরআন ও হাদিসে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, সম্মান ও নিরাপত্তার কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। মহানবী (সা.) আরও বলেছেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো” (সুনান ইবনে মাজাহ)। এই নির্দেশনা শুধু সময়মতো বেতন প্রদানের নয়, বরং শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষারও প্রতিফলন। ইসলামে জোর দেওয়া হয়েছে—শ্রমিকের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া যাবে না, কাজের পরিবেশ হতে হবে মানবিক, এবং সহানুভূতি ও সদাচরণ নিশ্চিত করতে হবে। এক হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ সেই ব্যক্তির বিরোধিতা করবেন, যে শ্রমিকের কাছ থেকে পূর্ণ কাজ নিয়ে তার প্রাপ্য মজুরি দেয় না (বুখারি)। কুরআনেও বলা হয়েছে, “কোনো কর্মীর কাজই আমি নষ্ট করি না” (সূরা আলে ইমরান: ১৯৫)। ইসলাম শ্রমকে ইবাদতের অংশ হিসেবে দেখে এবং সৎ ও দক্ষ শ্রমিককে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে গণ্য করে।
  • খ্রিষ্টধর্মে শ্রমিক অধিকার: খ্রিষ্টধর্মেও শ্রমজীবী মানুষের অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাইবেলে বলা হয়েছে, “কর্মী তার মজুরির যোগ্য।”যিশুখ্রিষ্টের শিক্ষায় প্রত্যেক মানুষ ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি—অতএব শ্রমিক ও মালিক উভয়ের মর্যাদা সমান। পুরাতন নিয়মে উল্লেখ আছে, দরিদ্র শ্রমিককে অত্যাচার করা যাবে না এবং তার মজুরি যথাসময়ে প্রদান করতে হবে (দ্বিতীয় বিবরণ ২৪:১৪–১৫)। নতুন নিয়মেও একই নীতি পুনরাবৃত্ত হয়েছে (লূক ১০:৭; ১ তীমথিয় ৫:১৮)। খ্রিষ্টীয় নৈতিকতায় শ্রমিক শোষণকে গুরুতর অন্যায় হিসেবে দেখা হয়। পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার ও দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো এই ধর্মের অন্যতম মূলনীতি।
  • হিন্দুধর্মে শ্রম ও কর্ম: হিন্দুধর্মে শ্রম ও কর্মের ধারণা “কর্ম” তত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, মানুষের অধিকার কর্মে, ফলে নয় (২:৪৭)। এখানে নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।ঐতিহাসিকভাবে বর্ণব্যবস্থা শ্রম বিভাজনের কাঠামো তৈরি করলেও আধুনিক ব্যাখ্যায় সব ধরনের কাজের মর্যাদা সমান বলে বিবেচিত। শ্রমকে ঈশ্বরসেবার অংশ হিসেবে দেখা হয় এবং ন্যায়পরায়ণতা, দয়া ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে শ্রমিকের প্রতি সুবিচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
  • বৌদ্ধধর্মে শ্রমিক অধিকার: বৌদ্ধধর্মে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারকে “সম্যক জীবিকা” ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা অষ্টাঙ্গিক মার্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নীতিতে বলা হয়—জীবিকা অর্জনের পথ হতে হবে ন্যায়সঙ্গত, ক্ষতিহীন ও শোষণমুক্ত। গৌতম বুদ্ধ শ্রমের মর্যাদা, সংযম ও সহানুভূতির ওপর জোর দিয়েছেন। বৌদ্ধ শিক্ষায় সকল মানুষের সমান মর্যাদা স্বীকৃত; তাই শ্রমিক শ্রেণিকে নিম্ন হিসেবে দেখা হয় না। অন্যের শ্রম শোষণকে অকল্যাণকর কর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
  • অন্যান্য ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি: অন্যান্য ধর্মেও শ্রমিকের প্রতি ন্যায়বিচারের সাধারণ নীতি দেখা যায়। ইহুদি ধর্মে দরিদ্র শ্রমিকের মজুরি আটকে না রাখার নির্দেশ রয়েছে। সিকখ ধর্মে সমতা ও কঠোর পরিশ্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সার্বিকভাবে, প্রায় সব ধর্মেই শ্রমকে মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং শোষণের বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে।
  • ধর্মীয় শিক্ষার আলো: সার্বিকভাবে বলা যায়, ধর্মীয় শিক্ষাগুলো শ্রমজীবী মানুষের অধিকারকে শুধু আইনগত নয়, বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানবিক আচরণ ও সামাজিক মর্যাদা—এই বিষয়গুলো সব ধর্মেই সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।আধুনিক বিশ্বে শ্রমিক অধিকার রক্ষায় নানা আইন ও নীতিমালা থাকলেও, ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোর বাস্তব প্রয়োগ একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমতাপূর্ণ সমাজ গঠনে সহায়ক হতে পারে। ইসলামের “ভ্রাতৃত্ব”, খ্রিষ্টধর্মের ন্যায্য মজুরির নীতি, গীতার নিষ্কাম কর্ম এবং বৌদ্ধধর্মের সম্যক জীবিকা—সবই শ্রমিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পথনির্দেশ দেয়।

মজুরি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান বৈষম্য

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে উৎপাদন ও রপ্তানি আয় বাড়ছে, অন্যদিকে শ্রমিকের জীবনমান তেমন উন্নত হচ্ছে না। বর্তমানে গার্মেন্টস খাতে ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা। কিন্তু একটি চার সদস্যের পরিবারের মাসিক ন্যূনতম ব্যয় হিসাব করলে দেখা যায়—

  • খাদ্য: ৭,০০০–৯,০০০ টাকা
  • বাসা ভাড়া: ৪,০০০–৬,০০০ টাকা
  • যাতায়াত ও অন্যান্য: ২,০০০–৩,০০০ টাকা

অর্থাৎ, মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১৫,০০০–২০,০০০ টাকার মধ্যে। ফলে শ্রমিককে হয় অতিরিক্ত কাজ করতে হয়, নয়তো ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—এই মজুরি কি জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট, নাকি শুধু বেঁচে থাকার জন্য?

রেশনিং ব্যবস্থা: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের জন্য একটি কার্যকর রেশনিং ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সাশ্রয়ী দামে চাল, ডাল, তেল সরবরাহ করা গেলে তাদের জীবনযাত্রার চাপ অনেকটাই কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে রেশনিং ব্যবস্থা নানা সমস্যায় জর্জরিত—সরবরাহ ঘাটতি, দুর্নীতি, দীর্ঘ লাইন, অপ্রতুল নজরদারি। ফলে এই ব্যবস্থা তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছে না। একটি আধুনিক, ডিজিটাল রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে এই সমস্যা অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব।

শ্রমিকের দৈনন্দিন জীবন: অদেখা সংগ্রাম

একজন শ্রমিকের দিন শুরু হয় ভোরে, শেষ হয় গভীর রাতে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম মজুরি, শারীরিক ক্লান্তি—এই তিনটি বিষয় তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার সন্তানদের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা, ভবিষ্যতের সঞ্চয়—সবই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে থাকে। অথচ এই শ্রমিকই দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এই বাস্তবতা আমাদের একটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করায়—আমরা কি আমাদের শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করছি?

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: তুলনামূলক চিত্র

আন্তর্জাতিকভাবে দেখা যায়, অনেক দেশেই শ্রমিকদের জন্য উন্নত মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ—

  • চীন: প্রায় ৩০০ ডলার (ন্যূনতম মজুরি)
  • ভিয়েতনাম: ১৭০+ ডলার
  • ইন্দোনেশিয়া: ২৪০+ ডলার

বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে নিচে অবস্থান করছে। এর একটি কারণ হলো সস্তা শ্রমনির্ভর উৎপাদন মডেল, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

করণীয়: বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ

শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—

১. জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ
২. কার্যকর ও স্বচ্ছ রেশনিং ব্যবস্থা চালু
৩. আট ঘণ্টার কর্মদিবস নিশ্চিত করা
৪. স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ
৫. শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা
৬. নীতিনির্ধারণে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি

উপসংহার: ঐক্যই মুক্তির পথ

শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বও। একটি সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন তার শ্রমিকরা সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারে। “দুনিয়ার মজদুর এক হও”—এই স্লোগানটি কেবল উচ্চারণের জন্য নয়; এটি বাস্তবায়নের আহ্বান। বিভাজন নয়, ঐক্যই পারে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি নিশ্চিত করতে।

শেষ কথা

শ্রমিকের প্রাপ্য দয়া নয়—অধিকার। তার ঘাম যেন তারই জীবনে স্বস্তি এনে দেয়—এই প্রত্যাশাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। আজ যে শ্লোগান —“দুনিয়ার মজদুর এক হও,”—তা শ্লোগানের চেয়েও বেশি কিচ্ছু! তা হলো বাঁচার মন্ত্র। ইউরোপের মেশিনের যুগে মজুর এক হয়েছিল বলেই তারা আট ঘণ্টা কাজ ও ভোটাধিকার পেয়েছিল। আর আমাদের এ দেশে আজো দুপুর বেলায় মালিক ‘চা খেতে’ ডাকলে চলতে হয়, নইলে ‘ছাঁটাইয়ের ভয়।’ এই দ্বিধাবিভক্ত মনকে জয় করতেই হবে। শুধু মে দিবসের পতাকা উড়িয়ে নয়, প্রতিদিনের কারখানায়, রেশন দোকানে, মজুরি মিটিং-এ—সেখানে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আর তার আগ পর্যন্ত, এই হাস্যব্যাঙ্গের বাণী আমার শেষ কথা:

“ওরে শ্রমিক ভাই, তোর জামায় জীর্ণ ছেঁড়া,
মালিকের বাড়ির দেয়ালে সোনার হাতা,
ঔপনিবেশিক সাপের ছোবল যে এখনো জাগে,
একবার বল ‘আমরা’—ভাঙবে সব জটাল জাল জাফরি তাগে!”

এই মে দিবসে স্মরণ করি শিকাগোর হে মার্কেটের শহীদদের। তারা ৮ ঘণ্টার কর্মদিবসের জন্য লড়াই করেছিলেন। আমরাও লড়ছি—মানবিক মজুরি, মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য। এ লড়াই একা একজনের নয়, সকল শ্রমিকের।

শেষ করব একটা ছোট গল্প দিয়ে। একটা গরিব শ্রমিক রাজাকে বলল, “মহারাজ, আমার পেট ভরে না।” রাজা বললেন, “খাওয়ার জন্য তোমাকে আরও কাজ করতে হবে।” শ্রমিক বলল, “কিন্তু আমি তো সারাদিন কাজ করি।” রাজা হেসে বললেন, “তাহলে রাতেও কাজ করো।” এই গল্পটা আমাদের বাস্তবতা। কিন্তু এখন সময় এসেছে বলার—“না, আর নয়। আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরিবর্তন আনব।”

দুনিয়ার মজদুর এক হও! শ্রমিক শ্রেণির জয় হোক। শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র নির্মাণের পথে আমরা এগিয়ে যাই।

ধন্যবাদ সকলকে। জয় বাংলা, জয় শ্রমিক! জয় হোক মেহনতি মানুষের। মে দিবসের আগাম শুভেচ্ছা।

 অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#MayDay #MeDibas #WorkersRights #LabourClass #Adhikarpatra #MinimumWage #Rationing #Equality #শ্রমিক_অধিকার #মে_দিবস #মেহনতি_মানুষ #অধিকারপত্র

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: