প্রকাশিত: ১ জুন ২০২৬ | অধিকার পত্র ডটকম
আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি
মাদাগাস্কারের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আন্দোম্বিরি বনের হাজার বছরের পুরোনো এবং স্থানীয়দের কাছে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত ‘সিতাকাকান্তসা’ নামের এক বিশাল বাওবাব গাছ মৃত্যুযাত্রায় রয়েছে। শত শত বছর ধরে টিকে থাকা এই প্রাচীন বৃক্ষটি এখন ধীরে ধীরে ধসে পড়ছে। এর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো আন্দোম্বিরি গ্রামে।
ফরাসি গবেষক সিরিল কর্নু গত বছরের অক্টোবরে গাছটির গোড়ায় কালো রঙের দুর্গন্ধযুক্ত তরল নিঃসরণ দেখতে পান। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বাওবাব নিয়ে গবেষণা করা এই বিজ্ঞানী তখনই বুঝতে পারেন, গাছটির ভেতরে গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘সিতাকাকান্তসা’ এখন তার জীবনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ধীরে ধীরে এর কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং একসময় এটি সম্পূর্ণ ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। কয়েক মাস কিংবা আরও কিছু সময় লাগলেও গাছটির অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন গবেষকরা।
মাদাগাস্কারের রাজধানী আন্তানানারিভোর চিম্বাজাজা জু অ্যান্ড বোটানিক্যাল গার্ডেনসের বাওবাব গবেষক অনজা রাজানামারো বলেন, এই গাছটি শুধু একটি বৃক্ষ নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। গ্রামের মানুষ এটিকে মা-বাবার মতো শ্রদ্ধা করত।
বাওবাব গাছ পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী বৃক্ষগুলোর একটি। স্পঞ্জের মতো জলীয় উপাদানে ভরা কাণ্ডের কারণে এগুলো দীর্ঘ সময় পানি সংরক্ষণ করতে পারে। আফ্রিকা, মাদাগাস্কার ও অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া বাওবাবের বিভিন্ন প্রজাতি কয়েকশ থেকে হাজার বছরেরও বেশি সময় বেঁচে থাকতে সক্ষম।
স্থানীয় মালাগাসি ভাষায় ‘সিতাকাকান্তসা’ নামের অর্থ হলো—‘কাণ্ডের একপাশে দাঁড়িয়ে গান গাইলে অন্যপাশ থেকে সেই গান শোনা যাবে না’। ধারণা করা হয়, গাছটির বয়স এক হাজার থেকে দেড় হাজার বছরের মধ্যে।
২০১৮ সালে এলাকার আরেকটি পবিত্র বাওবাব গাছ ‘সিতাকাকোইকে’ মারা যাওয়ার পর গ্রামবাসীরা ‘সিতাকাকান্তসা’কে তাদের নতুন আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। এরপর এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
স্থানীয় প্রকৃতি গবেষক উইলফ্রেড রামাহাফালি জানান, গত বছরের আগস্ট থেকেই গাছটির স্বাস্থ্য অবনতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। ফেব্রুয়ারিতে এর কাণ্ডে বড় বড় ফাটল তৈরি হয় এবং বর্তমানে গাছটির প্রায় অর্ধেক অংশ ভেঙে পড়েছে। ভেতরে ছত্রাক সংক্রমণও ছড়িয়ে পড়েছে।
গ্রামের প্রধান মাম্পিয়াভি বলেন, ‘সিতাকাকান্তসা’ আমাদের গ্রামকে আশীর্বাদ এনে দিয়েছিল। এই গাছ ছাড়া আমাদের জীবন কল্পনা করা কঠিন। এর মৃত্যুতে সবাই গভীরভাবে মর্মাহত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘস্থায়ী ভারী বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড় এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে গাছটিতে মারাত্মক ছত্রাক সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে বন উজাড়, অগ্নিসংযোগ ও কৃষিকাজের জন্য জমি পরিষ্কার করার মতো কার্যক্রমও মাদাগাস্কারের বাওবাব বনাঞ্চলের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন বাওবাব গাছ জন্মানোর হার অত্যন্ত কম। পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও সংরক্ষণ উদ্যোগের অভাবে ভবিষ্যতে এই অনন্য বৃক্ষপ্রজাতি আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
হাজার বছরের পুরোনো এই বাওবাব গাছটি একসময় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেলে তা শুধু একটি গাছের মৃত্যু হবে না; হারিয়ে যাবে একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রতীক।
হাজার বছরের ‘পবিত্র’ বাওবাব গাছ মৃত্যুযাত্রায়, শোকে মাদাগাস্কারের পুরো গ্রাম
#মাদাগাস্কার #বাওবাব #জলবায়ু_পরিবর্তন #পরিবেশ #প্রকৃতি #আফ্রিকা #সিতাকাকান্তসা #বিশ্বসংবাদ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: