odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 16th June 2026, ১৬th June ২০২৬
গ্রাহকদের নির্বিঘ্নে লেনদেনের আহ্বান জহির হোসেনের, বিতর্কিত শেয়ারের সিদ্ধান্ত হবে আদালতের নির্দেশনায়। দুই দিনে ৫ হাজার কোটি টাকা বিশেষ ধার দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ইসলামী ব্যাংক: দ্রুতই আসছে ৫ সদস্যের নিরপেক্ষ পর্ষদ

Special Correspondent | প্রকাশিত: ১৫ June ২০২৬ ১৯:৪০

Special Correspondent
প্রকাশিত: ১৫ June ২০২৬ ১৯:৪০

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

টানা তিন সপ্তাহের অস্থিরতা ও তীব্র তারল্য সংকটের মুখে থাকা বেসরকারি খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক ও আমানতকারীদের স্বার্থে গত রবিবার (১৪ জুন) রাতে ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পুরো পর্ষদ বাতিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক আদেশে এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। আপাতত ব্যাংকের যাবতীয় কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদের একক দায়িত্ব (চেয়ারম্যানের চলতি দায়িত্ব) দেওয়া হয়েছে। আজ সোমবার (১৫ জুন) দিলকুশায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে যোগ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি পাঁচ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের জন্য যাচাই-বাছাই চলছে।

জহির হোসেন গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বলেন: এখন পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। আমানতকারীদের নির্বিঘ্নে লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ লোক দিয়ে খুব শিগগির একটি সুন্দর পর্ষদ গঠন করব, যাঁরা এই ব্যাংককে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবেন।

আড়াই হাজার কোটি টাকার নতুন তারল্য সহায়তা

পর্ষদ বিলুপ্তির পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকের তীব্র নগদ টাকার সংকট কাটাতে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত সপ্তাহের ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণের আবেদনের প্রেক্ষিতে গতকাল রবিবারের পর আজ সোমবারও দ্বিতীয় দফায় আরও আড়াই হাজার কোটি টাকা বিশেষ ধার দেওয়া হয়েছে। ফলে গত দুই দিনে ব্যাংকটি মোট ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ কেন্দ্রীয় ঋণ পেল। ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আলতাফ হোসেন জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সহায়তার পর গ্রাহকদের আতঙ্ক অনেকটাই কেটে গেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া অর্থের পুরোটা আমাদের ব্যবহার করতে হচ্ছে না। ব্যাংকের একটি বড় শাখা থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, আগের তুলনায় অ্যাকাউন্ট বা হিসাব বন্ধের পরিমাণ প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। অর্থাৎ গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসছে।

কেন এই অচলাবস্থা: দখল ও পাল্টা দখলের ইতিহাস

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটের সূত্রপাত মূলত গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে শরীয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকটির শীর্ষ পদে রদবদলকে কেন্দ্র করে। গত ২৪ মে তৎকালীন চেয়ারম্যান জুবায়দুর রহমান ও এমডি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের একটি অংশ 'সচেতন গ্রাহক ফোরাম'-এর ব্যানারে আন্দোলনে নামে। একপর্যায়ে গত ১ জুন মতিঝিলে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টানা বিক্ষোভ এবং নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর মাত্র দুই সপ্তাহে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নেন আতঙ্কিত আমানতকারীরা, যার ফলে ব্যাংকটিতে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দেয়।

জাতীয় সংসদেও এই সংকট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি তোলে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে গত ৫ আগস্টের পর ব্যাংকের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে জানান, নাবিল গ্রুপসহ বিভিন্ন ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণে অনিয়ম হয়েছে।

পটভূমি:

২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকটি বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এস আলমের প্রভাবমুক্ত করতে পর্ষদ পুনর্গঠন করে। তবে সে সময় ব্যাংকটি জামায়াতে ইসলামী ঘরানার নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের শুরুতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটিতে পুনরায় নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের বসানোর চেষ্টা করলে এই 'দখল ও পাল্টা দখলের' লড়াইয়ে ব্যাংকটি চূড়ান্ত অচলাবস্থার মুখে পড়ে।

বিতর্কিত শেয়ারের বিষয়ে আইনি সিদ্ধান্ত

নতুন পর্ষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জহির হোসেন সাংবাদিকদের আরও জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকের যেসব শেয়ার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মালিকানার বিতর্ক চলছে, সেগুলোর বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের অতীতের যেকোনো ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে বলেও তিনি জানান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, পর্ষদ বাতিলের কারণে ব্যাংকের দৈনন্দিন ও সাধারণ গ্রাহকদের লেনদেন কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়বে না এবং ব্যাংকের যাবতীয় কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মেই পরিচালিত হবে।

--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: