অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক│ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু মানুষের নেতিবাচকতার বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। তবুও সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং জনপরিসরে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা, ব্যঙ্গ ও অবমূল্যায়নের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে? এটি কি শুধুই বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন, নাকি এর পেছনে কাজ করছে সামাজিক তুলনার মনস্তত্ত্ব, প্রতীকী রাজনীতি, ডিজিটাল অ্যালগরিদম, নেতিবাচক তথ্যের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতা? এই নিবন্ধে আন্তর্জাতিক গবেষণা, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, গণযোগাযোগ তত্ত্ব এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে—কীভাবে একটি জাতীয় প্রতীক একই সঙ্গে গৌরব, বিতর্ক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। একই সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে গঠনমূলক সমালোচনা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবমূল্যায়নের মৌলিক পার্থক্য এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি রাষ্ট্র ও নাগরিকের কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত।
প্রেক্ষিত নির্মাণ: অমল আলো ও অন্ধকারের সংঘাত—প্রশংসা না সমালোচনা—কোনটি বেশি সহজ?
ইতিহাসের এক চিরন্তন অমোঘ লিপি এই যে—মহীরুহ যত উচ্চে মস্তক উত্তোলন করে, ঝড়ের প্রথম আঘাত তার স্কন্ধেই আছড়ে পড়ে; যে নদী যত বিপুল জলধি বহন করে, তার কূলেই তীরের ভাঙন তত প্রমত্ত রূপ নেয়। ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান—সামাজিক অবয়বে তার প্রভাবের বিস্তার যত দিগন্তব্যাপী হয়, তাকে ঘিরে বিতর্ক ও সমালোচনার আবর্তও ততটাই ঘনঘটাবদ্ধ হয়ে ওঠে। প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষের এই দ্বান্দ্বিক যাত্রাপথে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজ-মনস্তত্ত্বের আঙিনায় বারবার প্রতিধ্বনিত হয়: প্রশংসা না সমালোচনা—কোনটি বেশি সহজ? এই জিজ্ঞাসা কেবল কোনো লঘু কৌতূহল নয়; বরং তা একটি জনপদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিকে উন্মোচন করে।
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইঁটের পর ইঁট গেঁথে তোলা কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একাধারে এই জনপদের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার অবিসংবাদিত মহোত্তম স্মারক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক খেরোখাতায় একটি প্রবাদতুল্য সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত যে—অন্যান্য সভ্যতায় রাষ্ট্রসমূহ নিজেদের প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে, অথচ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামক এক অবিনশ্বর জ্ঞানপীঠ নিজেই একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত ও নির্মাণ করেছে। সেই বৃটিশ উপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকে আজ অবধি, ভাষা-আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ চেতনা থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত রণাঙ্গন পেরিয়ে এই বিদ্যায়তন স্বদেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও সংস্কৃতির ধমনীতে প্রতিনিয়ত নেতৃত্বের নতুন রসদ জুগিয়ে চলেছে।
অথচ, এই অসামান্য গৌরবের সমান্তরালে সমকালীন জনপরিসরে ও সামাজিক মাধ্যমের করাল অ্যালগরিদমে এক বিস্ময়কর মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্যের কোলাহল আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। যে প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে একটি জাতির সামষ্টিক অহংকার আবর্তিত হওয়ার কথা, তাকেই প্রতিনিয়ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সস্তা ট্রল, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবমূল্যায়ন কিংবা তীব্র বিদ্বেষের মুখোমুখি হতে হয়। কেন এই রূপ বৈরিতা? এই সংকটের উৎস কেবল সমকালীন রাজনীতির উপরিভাগের কলহেই নিহিত নয়; এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে গভীর সামাজিক মনোবিজ্ঞান (Social Psychology), গণযোগাযোগের নেতিবাচক কাঠামো এবং ক্ষমতার জটিল মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কের গোলকধাঁধায়।
একজন একাডেমিক ও গবেষক হিসেবে এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টাক্ষরে উচ্চারণ করা প্রয়োজন যে, প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচনা কি তবে অনভিপ্রেত? উত্তর অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন—‘একেবারেই নয়।’ গঠনমূলক ও তথ্যনির্ভর সমালোচনা ব্যতীত কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার একাডেমিক স্বাধীনতা ও গবেষণার দিগন্তকে প্রসারিত করতে পারে না। তবে সমাজ-মনস্তত্ত্বের নিরিখে ‘সমালোচনা’ এবং ‘অবমূল্যায়ন’—এই দুইয়ের মাঝে এক অলঙ্ঘনীয় নৈতিক সীমারেখা বিদ্যমান। সমালোচনা সর্বদা প্রাতিষ্ঠানিক সংশোধনের অন্বেষায় প্রশ্ন তোলে—“কীভাবে আমরা আরও উন্নত ও বিশ্বমানের হতে পারি?”; পক্ষান্তরে, অবমূল্যায়ন এক অন্ধ নেতিবাচকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে ঘোষণা করে—“এখানে ভালো বা অর্জনের কিছুই নেই।” প্রথমটি যেখানে প্রমাণের ভিত্তিতে উন্নয়নের নতুন বাতায়ন উন্মোচন করে, দ্বিতীয়টি সেখানে সাময়িক জনপ্রিয়তার লোভে একটি জাতির চিন্তার দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোকেই ধূলিসাৎ করতে চায়।
প্রদত্ত নিবন্ধটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সাময়িক মতাদর্শের সংকীর্ণ বৃত্তে আবদ্ধ নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শিক্ষা ও মিডিয়া কমিউনিকেশনের স্বীকৃত তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে, সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ কোণ থেকে এই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার স্বরূপ উদ্ঘাটন করা। বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার যৌক্তিক ব্যবচ্ছেদ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের মধ্যকার রূপরেখা চিনে নেওয়াই একটি প্রাজ্ঞ ও মননশীল সমাজের লক্ষণ। কারণ, একটি পরিণত সমাজ তার পরম আলোকবর্তিকাকে অন্ধভাবে দেবতা জ্ঞান করে মহিমান্বিতও করে না, আবার ক্ষণস্থায়ী আবেগের বশবর্তী হয়ে তাকে অস্বীকারের প্রতিযোগিতাতেও নামে না; বরং সত্য, যুক্তি ও প্রমাণের আলোয় তাকে আগলে রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তার ভিত্তি নির্মাণ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও বড় একটি জাতীয় প্রতীক
পৃথিবীর প্রতিটি দেশেরই এমন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলো কেবল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়; বরং জাতীয় পরিচয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্রে হার্ভার্ড, যুক্তরাজ্যে অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ, ফ্রান্সে সরবোন, জাপানে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ভারতের কিছু ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয়—এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচয় তাদের ক্যাম্পাস বা ডিগ্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা জাতির চিন্তা, নীতি, নেতৃত্ব এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের নির্মাতা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও ঠিক তেমন একটি প্রতিষ্ঠান।
১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপনিবেশিক বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি জ্ঞানচর্চা, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং রাজনৈতিক সচেতনতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের ইতিহাসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের অবদান সুপ্রতিষ্ঠিত। এ কারণেই অনেক গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে মূল্যায়ন করেন। "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে"—এই বহুল ব্যবহৃত বাক্যটি ইতিহাসের আক্ষরিক বর্ণনা নয়; বরং রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির অসামান্য অবদানকে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করার একটি রূপক।
তবে ইতিহাসের এই গৌরবের সঙ্গে বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যও রয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের গবেষণা অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ভূমি, প্রযুক্তি, গবেষণা তহবিল এবং একাডেমিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি করেছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন সময়ে নগর সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক আলোচনায় উল্লেখ রয়েছে। একই সময়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু অবকাঠামো ও গবেষণা বিনিয়োগ সেই অনুপাতে বাড়েনি। তবুও সীমিত সম্পদের মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে এবং দেশ-বিদেশে গবেষণা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে নেতৃত্বদানকারী অসংখ্য মানবসম্পদ তৈরি করে চলেছে।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন কি কেবল তার সীমাবদ্ধতার ভিত্তিতে হবে, নাকি তার সম্পদ, সক্ষমতা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং অর্জন—সবকিছু মিলিয়ে হবে? একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে মূল্যায়ন করতে হলে তার গবেষণা বাজেট, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অবকাঠামো, নীতিগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক অবদান—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ একই মানদণ্ডে বিপুল সম্পদসমৃদ্ধ একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সীমিত সম্পদে পরিচালিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য বিচার করা ন্যায়সংগত নয়।
অতএব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যে কোনো আলোচনা যদি সত্যিকার অর্থে জ্ঞানভিত্তিক হতে চায়, তবে তার ইতিহাসের গৌরব যেমন স্মরণ করতে হবে, তেমনি বর্তমানের সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করতে হবে। কারণ একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি প্রকৃত দায়িত্ব অন্ধ প্রশংসা নয়, আবার অকারণ অবমূল্যায়নও নয়; বরং তথ্য, প্রমাণ এবং ন্যায্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তার শক্তি ও দুর্বলতা উভয়কেই মূল্যায়ন করা। একটি পরিণত সমাজ তার বিশ্ববিদ্যালয়কে পূজা করে না, কিন্তু তাকে তুচ্ছও করে না; বরং তাকে উন্নত করার জন্য বিনিয়োগ, সমালোচনা এবং আস্থার মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য গড়ে তোলে।
কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সমালোচনা এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে? — মনোবিজ্ঞানের আলোকে একটি বিশ্লেষণ
কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমালোচনা নতুন কিছু নয়। বরং সমালোচনা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—সব প্রতিষ্ঠান সমানভাবে সমালোচিত হয় না। যে প্রতিষ্ঠান যত বেশি পরিচিত, যত বেশি প্রভাবশালী এবং যত বেশি প্রতীকী অর্থ বহন করে, তাকে ঘিরে আবেগ, প্রত্যাশা এবং বিতর্কও তত বেশি তৈরি হয়। এই কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যে কোনো মন্তব্য, সমালোচনা কিংবা বিতর্ক খুব দ্রুত জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। এর পেছনে কেবল রাজনৈতিক কারণ নয়; মানুষের চিন্তা ও আচরণের কিছু মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যও কাজ করে।
মনোবিজ্ঞানে Negativity Bias নামে একটি সুপরিচিত ধারণা রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের মস্তিষ্ক ইতিবাচক তথ্যের তুলনায় নেতিবাচক তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং দীর্ঘ সময় মনে রাখে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি এক বছরে শতাধিক গবেষণা প্রকাশ করে, হাজারো শিক্ষার্থী সফলভাবে স্নাতক হয় কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জন করে, সেসব খবর সাধারণত সীমিত পরিসরে আলোচিত হয়। কিন্তু একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে সেটিই মুহূর্তের মধ্যে জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। কারণ মানুষের মন স্বাভাবিকভাবেই ব্যতিক্রমী, সংঘাতপূর্ণ ও নেতিবাচক ঘটনার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। এটি কোনো একটি দেশের বৈশিষ্ট্য নয়; এটি মানব মস্তিষ্কের একটি সর্বজনীন প্রবণতা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় Social Comparison Theory, যা সামাজিক মনোবিজ্ঞানী লিয়ন ফেস্টিঙ্গার প্রস্তাব করেছিলেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষ নিজের অবস্থান ও সাফল্য মূল্যায়নের জন্য তথা নিজের অবস্থান বোঝার জন্য অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের প্রতীকী মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে অনেকে সচেতন বা অবচেতনভাবে নিজেদের অবস্থান, প্রতিষ্ঠান বা অর্জনকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। এই তুলনা কখনো ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে, আবার কখনো হতাশা, বিরক্তি বা প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দেয়। তখন সমালোচনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নীতিগত দুর্বলতা নিয়ে থাকে না; বরং সেটি সামাজিক মর্যাদা, প্রতীকী অবস্থান এবং পরিচয়ের প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Symbolic Identity বা প্রতীকী পরিচয়। কোনো প্রতিষ্ঠান যখন একটি জাতির ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রগঠনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেটি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান থাকে না; বরং জাতীয় পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়। এমন প্রতীককে কেউ গর্বের উৎস হিসেবে দেখেন, আবার কেউ বিদ্যমান ক্ষমতা, ঐতিহ্য বা অভিজাত কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখেন। ফলে একই প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। এই বহুমাত্রিক অর্থই সমালোচনাকে কখনো বাস্তব সমস্যা থেকে সরিয়ে প্রতীকী বিতর্কে রূপান্তরিত করে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোনো ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা করলেই তাঁর উদ্দেশ্য নেতিবাচক—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গবেষণাগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক সমালোচনাই বাস্তব সমস্যা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার মান, গবেষণা, আবাসন, সেশনজট বা সুশাসনের প্রশ্ন থেকে উঠে আসে, যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আবার অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রতীকী অবস্থান বা জনমনোযোগ আকর্ষণের প্রবণতাও সমালোচনার ভাষাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই প্রতিটি বক্তব্যকে তার প্রেক্ষাপট, তথ্যভিত্তি ও উদ্দেশ্যের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
অতএব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সমালোচনার দ্রুত বিস্তারকে কেবল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। বরং মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও গণযোগাযোগের সমন্বিত বিশ্লেষণ আমাদের দেখায় যে একটি উচ্চপ্রভাবশালী ও প্রতীকী প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই জনআবেগ, সামাজিক তুলনা, উচ্চ প্রত্যাশা এবং গণমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রে অবস্থান করে। এই বাস্তবতা বোঝা গেলে সমালোচনাকে আরও যুক্তিনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে এবং একই সঙ্গে গঠনমূলক সমালোচনা ও উদ্দেশ্যহীন অবমূল্যায়নের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় করাও সহজ হবে।
প্রতীকী ক্ষমতা, রাজনীতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: কেন জাতির শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে?
ক্ষমতার রাজনীতি কেবল সংসদ, রাজনৈতিক দল কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতীক, স্মৃতি, ইতিহাস এবং জ্ঞানপ্রতিষ্ঠানকেও ঘিরে আবর্তিত হয়। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান ও উচ্চশিক্ষা গবেষণায় বহুদিন ধরেই বলা হচ্ছে, যে বিশ্ববিদ্যালয় একটি জাতির ইতিহাস ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়, সেটি অনিবার্যভাবে রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিতর্কের অংশে পরিণত হয়। এই বাস্তবতা কেবল বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের বহু দেশের ক্ষেত্রেই সত্য। হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, সরবোন, হামবোল্ট, টোকিও কিংবা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়—প্রত্যেকটিই কোনো না কোনো সময়ে জাতীয় রাজনীতি, মতাদর্শ এবং সামাজিক পরিবর্তনের বিতর্কের কেন্দ্র হয়েছে। সেই অর্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও একটি ব্যতিক্রম নয়; বরং একটি ঐতিহাসিক নিয়মের অংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত্ব হলো, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে নিয়ে আলোচনা অনেক সময় শুধুমাত্র শিক্ষানীতি নিয়ে থাকে না; বরং জাতীয় পরিচয়, ইতিহাসের ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নেও পরিণত হয়। ফলে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মন্তব্য করেন, তখন সেই মন্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নয়, বরং একটি জাতীয় প্রতীককে ঘিরে জনমত তৈরির অংশ হয়ে ওঠে। এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতীকী শক্তি নিহিত।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ু (Pierre Bourdieu) তাঁর Symbolic Capital ধারণায় দেখিয়েছেন, সমাজে কিছু প্রতিষ্ঠান এমন এক ধরনের প্রতীকী মর্যাদা অর্জন করে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের মতোই প্রভাবশালী। এই প্রতীকী মর্যাদা মানুষকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, নেতৃত্ব এবং বৈধতা প্রদান করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীকী পুঁজি হিসেবে বিবেচিত। এখানকার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, অর্থনীতি এবং নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঘিরে আলোচনা কখনোই কেবল ক্যাম্পাসের ভেতরের বিষয় থাকে না; তা জাতীয় আলোচনার অংশে পরিণত হয়।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতীকী গুরুত্ব যত বাড়ে, তার প্রতি জনসাধারণের প্রত্যাশাও তত বৃদ্ধি পায়। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ প্রায়ই এমন একটি মানদণ্ড প্রয়োগ করেন, যা অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। একটি ছোট ঘটনা, একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা একটি বিচ্ছিন্ন অনিয়মও তখন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করে। অথচ একই ধরনের ঘটনা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে ঘটলে তা হয়তো জাতীয় আলোচনায়ই আসে না। এই বৈষম্যমূলক দৃশ্যমানতা (visibility effect) সামাজিক মনোবিজ্ঞান ও গণযোগাযোগ গবেষণায় সুপরিচিত একটি বিষয়।
এখানে আরেকটি বিষয়ও বিবেচনা করা জরুরি। গণতান্ত্রিক সমাজে বিশ্ববিদ্যালয় কোনোভাবেই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বরং একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, গবেষণার মান, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অধিকার এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ। কিন্তু যখন সমালোচনা তথ্য, প্রমাণ এবং যুক্তির পরিবর্তে কেবল আবেগ, বিদ্রূপ বা সাময়িক জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে, তখন তা জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ না করে বরং জনপরিসরকে আরও বিভক্ত করতে পারে। একজন গবেষক বা সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো এই দুই ধরনের প্রবণতার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা।
সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রাজনৈতিক বক্তব্য, জনআলোচনা এবং সামাজিক বিতর্ককে কেবল বিরোধ বা বিদ্বেষের চোখে দেখলে বাস্তবতার অনেকটাই অদেখা থেকে যায়। আবার প্রতিটি সমালোচনাকে বিশ্ববিদ্যালয়বিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করাও সমানভাবে অযৌক্তিক। বরং একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সমাজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা উচিত, যেখানে স্বাধীন চিন্তা, কঠোর আত্মসমালোচনা, তথ্যনির্ভর বিতর্ক এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা—সবগুলোই পাশাপাশি অবস্থান করবে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার অন্ধ প্রশংসায় নয়; বরং সত্যনিষ্ঠ সমালোচনা গ্রহণ করার সক্ষমতা এবং সেই সমালোচনাকে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করার মধ্যেই নিহিত।
ভাইরাল হওয়ার মনোবিজ্ঞান: কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে একটি নেতিবাচক মন্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে?
ডিজিটাল যুগ আমাদের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ যেমন বহুগুণ বাড়িয়েছে, তেমনি তথ্যের বিস্তার, গ্রহণ ও মূল্যায়নের ধরনও আমূল বদলে দিয়েছে। আগে কোনো বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা আনুষ্ঠানিক গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট, একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও বা একটি উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বহুল পরিচিত প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই ডিজিটাল আলোচনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, কেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিবাচক অর্জনের চেয়ে বিতর্কিত মন্তব্য অনেক দ্রুত ভাইরাল হয়? এর উত্তর কেবল মানুষের আচরণে নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রযুক্তিগত কাঠামো এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতার মধ্যেও নিহিত।
গণযোগাযোগ গবেষণায় Agenda Setting Theory এবং Framing Theory দেখায় যে, মানুষ কী নিয়ে ভাববে এবং কীভাবে ভাববে—এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও যোগাযোগমাধ্যমের উপস্থাপনার ধরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো আবার একটি ভিন্ন যুক্তিতে পরিচালিত হয়। তাদের মূল লক্ষ্য ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখা। ফলে যে বিষয় বেশি প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য, শেয়ার বা আবেগ সৃষ্টি করে, অ্যালগরিদম সেটিকেই আরও বেশি মানুষের সামনে নিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ায় তথ্যের সত্যতা নয়; বরং তার Engagement Value বা সম্পৃক্ততা তৈরির ক্ষমতা বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণের তুলনায় একটি উত্তেজনাপূর্ণ বা তীব্র সমালোচনামূলক মন্তব্য অনেক দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি Emotional Contagion বা আবেগের সংক্রমণের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ক্ষোভ, বিস্ময়, রাগ কিংবা বিদ্রূপ মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়ায়। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে কোনো বিতর্কিত মন্তব্য অনেকের কাছে কেবল তথ্য নয়; বরং একটি আবেগীয় প্রতিক্রিয়ার উৎস হয়ে ওঠে। মানুষ তখন মন্তব্যটি যাচাই করার আগেই সেটি শেয়ার করে, সমর্থন বা বিরোধিতা করে এবং অজান্তেই সেই তথ্যের বিস্তার ঘটায়। এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় একই চিত্র পাওয়া যায়।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এটিকে নিয়ে যে কোনো বক্তব্যের সম্ভাব্য পাঠকসংখ্যা অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক বেশি। একজন ব্যক্তি যদি কোনো অপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একই ধরনের মন্তব্য করেন, তা হয়তো সীমিত পরিসরে থেকে যাবে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বক্তব্য জাতীয় আলোচনায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অর্থাৎ, ভাইরাল হওয়ার পেছনে বক্তব্যের বিষয়বস্তুর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতীকী পরিচিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে এই বাস্তবতা থেকে একটি বিপজ্জনক প্রবণতাও জন্ম নিতে পারে। যদি জনমনোযোগ অর্জনের সহজ উপায় হয়ে দাঁড়ায় কোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্রমাগত তীব্র বা উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্য করা, তাহলে জনপরিসরে ধীরে ধীরে একটি "Attention Economy" গড়ে ওঠে, যেখানে তথ্যের গভীরতার চেয়ে দৃশ্যমানতা বেশি মূল্য পায়। তখন গবেষণাভিত্তিক আলোচনা, নীতিগত সমালোচনা কিংবা গঠনমূলক বিতর্ক তুলনামূলকভাবে আড়ালে চলে যায়। ফলস্বরূপ সমাজে এমন একটি ধারণা তৈরি হতে পারে যে, প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক অবদান আলোচনার যোগ্য নয়; কেবল তার ব্যর্থতাই আলোচনার বিষয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি জ্ঞানসমাজের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
তাই ডিজিটাল যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে জনআলোচনাকে মূল্যায়ন করার সময় কেবল বক্তব্যের ভাষা নয়, বরং সেটি কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, কেন ছড়িয়ে পড়ছে এবং কোন যোগাযোগ কাঠামো তাকে ত্বরান্বিত করছে—এসব প্রশ্নও বিবেচনা করা জরুরি। একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অবশ্যই সমালোচনার ক্ষেত্র হবে; কিন্তু সেই সমালোচনা যেন তথ্য, প্রমাণ ও যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, অ্যালগরিদমের তৈরি সাময়িক আবেগের ওপর নয়। কারণ ক্ষণস্থায়ী ভাইরালতা একটি জাতির জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না; সেটি পারে কেবল দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, দায়িত্বশীল বিতর্ক এবং তথ্যনির্ভর জনপরিসর।
গঠনমূলক সমালোচনা নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবমূল্যায়ন?—দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়
একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার অস্তিত্বের অন্যতম ভিত্তিই হলো প্রশ্ন, বিতর্ক, আত্মসমালোচনা এবং নতুন জ্ঞানের অনুসন্ধান। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই, সেখানে প্রকৃত অর্থে জ্ঞানচর্চাও বিকশিত হয় না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সমালোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়; বরং এটি একটি প্রাণবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের লক্ষণও হতে পারে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—গঠনমূলক সমালোচনা (Constructive Criticism) এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবমূল্যায়ন (Institutional Denigration) কখনোই এক বিষয় নয়।
গঠনমূলক সমালোচনার ভিত্তি হলো তথ্য, প্রমাণ, গবেষণা এবং উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা। একজন গবেষক যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাজেট বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, আবাসন সংকট, একাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কিংবা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশ্লেষণ করেন, তখন তাঁর লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করা নয়; বরং আরও শক্তিশালী করা। এই ধরনের সমালোচনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সম্পদস্বরূপ। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও নিয়মিত আত্মসমালোচনা, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং বহিরাগত পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই নিজেদের উন্নত করেছে।
অন্যদিকে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবমূল্যায়নের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে তথ্যের পরিবর্তে সাধারণীকরণ, যুক্তির পরিবর্তে আবেগ, বিশ্লেষণের পরিবর্তে বিদ্রূপ এবং সংস্কারের পরিবর্তে অবিশ্বাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা একজন ব্যক্তির আচরণকে পুরো প্রতিষ্ঠানের পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করা, দীর্ঘ ইতিহাস ও বহুমাত্রিক অবদানকে অস্বীকার করা, কিংবা এমন ধারণা সৃষ্টি করা যে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো ইতিবাচক দিকই নেই—এসবই অবমূল্যায়নের লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের বক্তব্য স্বল্পমেয়াদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা জ্ঞানভিত্তিক জনআলোচনাকে দুর্বল করে।
এখানে আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সাধারণত আবেগপূর্ণ। কেউ সেখানে পড়েছেন, কেউ পড়তে চেয়েও পারেননি, কেউ শিক্ষক ছিলেন, কেউ আবার বাইরের পর্যবেক্ষক। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মানুষের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি একেক রকম। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু সেটি কখনোই পুরো প্রতিষ্ঠানের একমাত্র বাস্তবতা নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় হাজারো শিক্ষক, লক্ষাধিক শিক্ষার্থী, শতবর্ষের ইতিহাস এবং অসংখ্য বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার সমষ্টি। তাই কোনো একটি অভিজ্ঞতাকে পুরো প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করলে বাস্তবতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারক, বুদ্ধিজীবী এবং নাগরিক সমাজেরও একটি বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা হবে তথ্যনির্ভর, তুলনামূলক এবং প্রাসঙ্গিক। যদি গবেষণার ঘাটতি থাকে, তবে প্রশ্ন হবে—কেন গবেষণা বাজেট অপর্যাপ্ত? যদি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির প্রয়োজন হয়, তবে আলোচনার বিষয় হবে—কোন নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন? যদি শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ থাকে, তবে তা সমাধানের পথ নিয়েই বিতর্ক হবে। কিন্তু যদি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে কেবল বিদ্রূপ, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা সাময়িক জনপ্রিয়তা, তবে প্রকৃত সমস্যাগুলোই আড়ালে থেকে যাবে।
সুতরাং, একটি জাতির পরিপক্বতা বোঝা যায় সে তার বিশ্ববিদ্যালয়কে কীভাবে সমালোচনা করে। পরিণত সমাজ বিশ্ববিদ্যালয়কে ভুলত্রুটিমুক্ত মনে করে না, আবার তার শতবর্ষের অবদানও অস্বীকার করে না। তারা জানে, একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্নত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কঠোর কিন্তু ন্যায্য সমালোচনা, স্বাধীন গবেষণা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল করে কোনো জাতি কখনো শক্তিশালী হয় না; বরং বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সক্ষম, স্বাধীন ও বিশ্বমানের করে তুললেই একটি দেশের জ্ঞান, অর্থনীতি, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ হয়।
সীমিত সম্পদের মধ্যেও সাফল্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনকে কোন মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা উচিত?
কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি রয়েছে—অর্জনকে সবসময় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বিচার করতে হয়। একই মানদণ্ডে বিপুল অর্থায়ন, অত্যাধুনিক গবেষণাগার, উচ্চ আন্তর্জাতিক অনুদান এবং বিস্তৃত ক্যাম্পাসসম্পন্ন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সীমিত সম্পদে পরিচালিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করা ন্যায্য নয়। উচ্চশিক্ষা মূল্যায়নের আন্তর্জাতিক আলোচনায় তাই এখন ক্রমশ একটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—Performance Relative to Resources বা উপলব্ধ সম্পদের তুলনায় একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মূল্যায়ন করলে আলোচনার একটি ভিন্ন মাত্রা সামনে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও অবকাঠামো, আবাসন, গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তি এবং গবেষণা অর্থায়ন একই অনুপাতে বাড়েনি। শতবর্ষের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসও বিভিন্ন সময়ে নগরায়ণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে সংকুচিত হয়েছে বলে ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। বিশ্বের অনেক শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে নতুন গবেষণা কেন্দ্র, বিজ্ঞান পার্ক, উদ্ভাবন ল্যাব এবং আন্তর্জাতিক ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করছে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত ভৌত পরিসর ও সীমিত সম্পদ নিয়েই প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আরেকটি বাস্তবতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, ব্যাংকিং, কূটনীতি, শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং উদ্যোক্তা খাত—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। দেশের বহু রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। অর্থাৎ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব কেবল তার ক্যাম্পাসের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় সমাজে তার দীর্ঘমেয়াদি অবদানের মাধ্যমে।
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিং নিয়েও প্রায়ই আলোচনা হয়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। QS World University Rankings, Times Higher Education (THE) কিংবা অন্যান্য বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং মূলত গবেষণা প্রকাশনা, উদ্ধৃতি (citations), আন্তর্জাতিকীকরণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, গবেষণা আয়, শিল্পখাতের সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক সুনামের মতো বিভিন্ন সূচকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এই সূচকগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সামাজিক অবদানকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করে না। একই সঙ্গে যেসব দেশে গবেষণায় বিপুল সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে, সেসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিযোগিতা কাঠামোগতভাবেই অসম। ফলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান মূল্যায়নের সময় তার অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতাও বিবেচনা করা জরুরি।
এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আধুনিক অবকাঠামো এবং একাডেমিক স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে বিশ্বমানের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও ভালো অবস্থান প্রত্যাশা করা হয়, তবে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ, নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে। কেবল ফলাফল দাবি করে, কিন্তু প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না করে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
অতএব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন হওয়া উচিত দুই দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রথমত, কোথায় কোথায় উন্নতির প্রয়োজন—গবেষণা, আন্তর্জাতিকীকরণ, প্রশাসনিক দক্ষতা, অবকাঠামো এবং শিক্ষার মান। দ্বিতীয়ত, সীমিত সম্পদের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি যে জাতীয় নেতৃত্ব, জ্ঞানচর্চা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে শতবর্ষ ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, সেই অবদানও সমান গুরুত্বের সঙ্গে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল তার সীমাবদ্ধতা দিয়ে বিচার করা যেমন অন্যায়, তেমনি কেবল তার ঐতিহাসিক গৌরব দিয়ে বর্তমানের সমস্যাকে আড়াল করাও সমানভাবে অগ্রহণযোগ্য। একটি পরিণত জাতি এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই তার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে মূল্যায়ন করে এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী করে তোলে।
একটি জাতির আত্মমর্যাদা ও তার বিশ্ববিদ্যালয়: বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল করলে শেষ পর্যন্ত কার ক্ষতি হয়?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি তার বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করেছে, সেই জাতিই দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় অগ্রগামী হয়েছে। আবার যে সমাজ তার বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র, জনতুষ্টিমূলক বিতর্কের বিষয় বা সাময়িক জনপ্রিয়তা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, সেই সমাজ শেষ পর্যন্ত জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা হারিয়েছে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ভবন, শ্রেণিকক্ষ বা পরীক্ষার কেন্দ্র নয়; এটি একটি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অবকাঠামো (Intellectual Infrastructure)। যেমন সড়ক, সেতু বা বিদ্যুৎ একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় একটি জাতির জ্ঞান, উদ্ভাবন, নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণের ভিত্তি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা গভীরভাবে প্রযোজ্য। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা নিয়ে অসংখ্য মানুষ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, অর্থনীতি, কূটনীতি, সংস্কৃতি এবং ব্যবসায়িক নেতৃত্ব—বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অবদান দৃশ্যমান। এর অর্থ এই নয় যে সব সাফল্যের কৃতিত্ব এককভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের; বরং বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বহু মানুষ নিজেদের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ পেয়েছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি এখানেই—সে কেবল ডিগ্রি প্রদান করে না; সে চিন্তাশক্তি, নেতৃত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলে।
এই কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জনআলোচনার ভাষাও হওয়া উচিত জাতীয় দায়িত্ববোধসম্পন্ন। যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ঘাটতি থাকে, তাহলে প্রশ্ন হবে—রাষ্ট্র কি পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল দিচ্ছে? যদি শিক্ষক সংকট থাকে, তাহলে আলোচনা হবে—কেন দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত নিয়োগ হচ্ছে না? যদি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির প্রয়োজন হয়, তাহলে বিতর্ক হবে—কীভাবে আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা, উচ্চমানের গবেষণাগার, উদ্ভাবনী তহবিল এবং একাডেমিক স্বাধীনতা বাড়ানো যায়? অর্থাৎ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত সমাধান, শুধুমাত্র সমালোচনা নয়।
এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকার বিনিয়োগ করে, শিল্পখাত গবেষণায় অর্থায়ন করে, প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অনুদান দেন, নাগরিক সমাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষায় সোচ্চার থাকে। কারণ তারা জানে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানোন্নয়ন। বাংলাদেশেও যদি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল সমালোচনার বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়কে সমালোচনা করা যাবে না। বরং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা তখনই বৃদ্ধি পায়, যখন সে যুক্তিসংগত সমালোচনা গ্রহণ করতে পারে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং নিজেকে ক্রমাগত সংস্কার করতে পারে। কিন্তু সমালোচনার লক্ষ্য যদি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের পরিবর্তে তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করা হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জাতির জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে গবেষণার প্রতি আগ্রহ কমে, মেধাবীরা নিরুৎসাহিত হয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অতএব, একটি জাতির আত্মমর্যাদা অনেকাংশে প্রতিফলিত হয় সে তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কেমন আচরণ করে তার ওপর। আমরা কি এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলব, যেখানে জনপ্রিয়তার জন্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত বিদ্রূপ করা হবে, নাকি এমন একটি সংস্কৃতি গড়ব, যেখানে তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, ন্যায্য মূল্যায়ন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং একাডেমিক স্বাধীনতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং বাংলাদেশ আগামী প্রজন্মের জন্য কেমন জ্ঞানসমাজ গড়তে চায়, সেই দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: গ্রামবাংলার স্বপ্নের দরজা, মেধার সর্ববৃহৎ প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক মনস্তত্ত্ব
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত শুধু রাষ্ট্রনির্মাণে নয়; বরং সামাজিক গতিশীলতা (Social Mobility) সৃষ্টিতে। পৃথিবীর বহু দেশে অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে ধনী ও সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের প্রাধান্যে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি ভিন্ন সামাজিক প্রতীক। এটি এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়, যার দিকে আজও তাকিয়ে থাকে চরাঞ্চল, পাহাড়, হাওর, উপকূল, সীমান্তবর্তী জনপদ এবং প্রত্যন্ত গ্রামের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি ক্যাম্পাস নয়; এটি দারিদ্র্য থেকে সম্ভাবনার পথে যাত্রার একটি প্রতীক।
বাংলাদেশের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকের সন্তান, দিনমজুরের সন্তান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সন্তান কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন শিক্ষার্থী যখন রাত জেগে পড়াশোনা করে, তখন তার স্বপ্নের কেন্দ্রে প্রায়ই থাকে একটি নাম—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ তারা বিশ্বাস করে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলে শুধু একটি ডিগ্রি নয়; বরং একটি নতুন জীবন, নতুন পরিচয় এবং নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, প্রশাসক, বিচারপতি, কূটনীতিক, অর্থনীতিবিদ, সাহিত্যিক ও নীতিনির্ধারকের জীবনকাহিনি সেই বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করেছে। তাঁদের সাফল্য প্রমাণ করেছে—জন্মস্থান নয়, সুযোগ এবং মেধাই একজন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
এই কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মেধাভিত্তিক সামাজিক ন্যায়বিচারের (Merit-based Social Mobility) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এখানে ভর্তির প্রতিযোগিতায় একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান এবং একজন ধনী শিল্পপতির সন্তান একই প্রশ্নপত্রের সামনে বসে। পরীক্ষার খাতায় পারিবারিক সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা আর্থিক ক্ষমতার কোনো আলাদা মূল্য নেই; সেখানে মূল্যায়িত হয় প্রস্তুতি, অধ্যবসায়, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং মেধা। এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা বহু প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের তরুণদের কাছে বিশ্বাস জাগিয়েছে যে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সামাজিক অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব।
তবে এই প্রতিযোগিতার আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী আবেদন করলেও সীমিত আসনের কারণে অধিকাংশই ভর্তি হতে পারে না। এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং উচ্চ প্রতিযোগিতার একটি স্বাভাবিক পরিণতি। অনেক অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীও কেবল সীমিত আসনের কারণে সুযোগ পান না। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারা কখনোই একজন মানুষের সামগ্রিক সক্ষমতার পরিমাপক নয়। বরং এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
একই সঙ্গে সামাজিক মনোবিজ্ঞানের একটি বাস্তবতাও এখানে বিবেচ্য। কোনো উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের জন্য মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, এমন পরিস্থিতিতে কিছু মানুষের মধ্যে হতাশা, প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা নেতিবাচক মূল্যায়নের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তবে এটিকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। কারণ অধিকাংশ মানুষই নিজের অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে অন্য পথে সাফল্য অর্জন করেন। আবার কেউ কেউ সেই অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে সমালোচনার চোখে দেখতে পারেন। এই দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই মানব-মনস্তত্ত্বের পরিচিত বাস্তবতা।
অতএব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার শতবর্ষের ঐতিহ্যই নয়; বরং আজও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন দরিদ্র শিক্ষার্থীর মনে স্বপ্ন জাগানোর ক্ষমতা। যতদিন বাংলাদেশের কোনো গ্রামে বসে একটি শিশু বিশ্বাস করবে—"আমি একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব, গবেষণা করব, বিজ্ঞানী হব, দেশ ও বিশ্বের জন্য কাজ করব", ততদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি অটুট থাকবে। কারণ একটি জাতির শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য তার ভবন, র্যাঙ্কিং বা পরিসংখ্যান নয়; বরং একটি প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখার সাহস দেওয়া। আর যে বিশ্ববিদ্যালয় লক্ষ লক্ষ তরুণের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে সংজ্ঞায়িত করা যায় না; সে একটি জাতির সম্ভাবনার প্রতীক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ‘ব্লেম গেম’: মনোসামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোকে একটি বিশ্লেষণ
কোনো জাতির সবচেয়ে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তীব্র সমালোচনা, অবমূল্যায়ন বা দোষারোপের প্রবণতা কেবল বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়; এটি বিশ্বের বহু দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেও দেখা যায়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সমালোচনা (criticism) এবং ব্লেম গেম (blame game) এক বিষয় নয়। সমালোচনার লক্ষ্য সমস্যার সমাধান খোঁজা, কিন্তু ব্লেম গেমের লক্ষ্য প্রায়ই কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা প্রতীককে জনঅসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা। কেন এমনটি ঘটে, তার ব্যাখ্যা মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং গণযোগাযোগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বে পাওয়া যায়।
- ১. Negativity Bias—নেতিবাচক তথ্যের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ: মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্ক ইতিবাচকের তুলনায় নেতিবাচক তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এটিই Negativity Bias। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি বছরে শত শত গবেষণা প্রকাশ করে, হাজার হাজার শিক্ষার্থী সফলভাবে স্নাতক হয় বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে, সেসব সংবাদ সাধারণত সীমিত মনোযোগ পায়। কিন্তু একটি বিতর্কিত ঘটনা বা তীব্র সমালোচনামূলক বক্তব্য মুহূর্তেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ফলে জনপরিসরে এমন একটি ধারণা তৈরি হতে পারে, যেন প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক অবদান অপেক্ষা তার ব্যর্থতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করে।
- ২. Social Identity Theory—প্রতীককে আঘাত করে পরিচয় নির্মাণ: হেনরি তাজফেলের Social Identity Theory অনুযায়ী, মানুষ নিজের পরিচয় গড়ে তোলে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে এবং অন্য গোষ্ঠী থেকে নিজেকে পৃথক করে। একটি ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয় যখন জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন তাকে সমর্থন কিংবা সমালোচনা—উভয়ই কখনো কখনো পরিচয় রাজনীতির অংশে পরিণত হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে বিতর্ক অনেক সময় কেবল শিক্ষাবিষয়ক থাকে না; বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের মাধ্যমেও রূপান্তরিত হতে পারে।
- ৩. Symbolic Politics—প্রতীকের বিরুদ্ধে লড়াই সহজ, কাঠামোগত সমস্যার সমাধান কঠিন: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের Symbolic Politics তত্ত্ব দেখায়, জটিল সামাজিক সমস্যার পরিবর্তে প্রতীকী কোনো প্রতিষ্ঠানকে আলোচনার কেন্দ্রে আনা রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক সহজ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় দৃশ্যমান, পরিচিত এবং আবেগপূর্ণ প্রতীক হওয়ায় তাকে ঘিরে বক্তব্য সহজেই জনমনোযোগ পায়। কিন্তু গবেষণা বাজেট, উচ্চশিক্ষার অর্থায়ন, নীতিগত দুর্বলতা বা দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মতো জটিল প্রশ্ন তুলনামূলক কম আলোচিত হয়। ফলে আলোচনার কেন্দ্র সরে যায় কাঠামোগত সমস্যা থেকে প্রতীকী সংঘাতে।
- ৪. Scapegoat Theory—জটিল সমস্যার জন্য একটি দৃশ্যমান প্রতীককে দায়ী করা: সামাজিক মনোবিজ্ঞানের Scapegoat Theory অনুযায়ী, সমাজ যখন হতাশা, ক্ষোভ বা অসন্তোষে ভোগে, তখন সেই অসন্তোষ কখনো কখনো একটি দৃশ্যমান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপ করা হয়। এটি সব ক্ষেত্রে ঘটে—এমন নয়; কিন্তু ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। কোনো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার উচ্চ দৃশ্যমানতার কারণে কখনো কখনো এই প্রতীকী দোষারোপের লক্ষ্য হতে পারে। এতে বাস্তব সমস্যার সমাধান হয় না; বরং জটিল প্রশ্নের একটি সরল ব্যাখ্যা তৈরি হয়।
- ৫. Relative Deprivation Theory—তুলনামূলক বঞ্চনার অনুভূতি: এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ কেবল বাস্তব বঞ্চনার কারণে নয়; বরং অন্যের তুলনায় নিজেকে পিছিয়ে মনে করলেও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে যারা ব্যক্তিগত, সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক তুলনার প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান মূল্যায়ন করেন, তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আবেগীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এটিকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না; এটি একটি সাধারণ মনোসামাজিক ব্যাখ্যা।
- ৬. Agenda Setting ও Algorithmic Amplification—ডিজিটাল যুগের ‘ব্লেম ইকোনমি’: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়, যা বেশি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে উত্তেজনাপূর্ণ সমালোচনা, তীব্র ভাষা বা বিতর্কিত মন্তব্য প্রায়ই গবেষণাভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্লেষণের তুলনায় বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এভাবে একটি "Blame Economy" তৈরি হতে পারে, যেখানে দায়ারোপই দৃশ্যমানতা অর্জনের সহজ উপায় হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রক্রিয়া শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়; বিশ্বের বহু নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম ও জনপরিচিত প্রতিষ্ঠানকেও প্রভাবিত করে।
- ৭. Cognitive Dissonance—বাস্তবতা ও প্রত্যাশার সংঘাত: মনোবিজ্ঞানী লিয়ন ফেস্টিঙ্গারের Cognitive Dissonance Theory অনুযায়ী, যখন মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, তখন সেই অস্বস্তি দূর করার জন্য মানুষ কখনো কখনো নিজের ব্যাখ্যা পরিবর্তন করে। একটি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে পূর্বধারণা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে বাস্তবতা না মিললে, কেউ কেউ প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মূল্যকে কমিয়ে দেখার প্রবণতা দেখাতে পারেন। এটি একটি সম্ভাব্য মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা; তবে ব্যক্তিভেদে প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে।
লোকায়ত রূপক থেকে ডিজিটাল অ্যালগরিদম: উচ্চশিক্ষা ও রাজনৈতিক যোগাযোগের সমাজ-মনস্তত্ত্ব
গ্রামবাংলার লোকগাথায় সমাজ-কলহের যে চিরন্তন অনুঘটক ‘কূটনীবুড়ি’, উত্তর-সত্য (Post-truth) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ডিজিটাল যুগে সে আজ এক অদৃশ্য, ক্ষিপ্র ও সর্বগ্রাসী অ্যালগরিদমে রূপান্তরিত হয়েছে। অতীতে যে অপপ্রচার সীমাবদ্ধ থাকত কোনো এক গ্রামীণ মহল্লায়, আজ তা বিভ্রান্তিকর শিরোনাম, প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন ভিডিও কিংবা যাচাইহীন বার্তার ছদ্মবেশে সামাজিক মাধ্যমের স্রোতে ভেসে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে লাখো মানুষের মনস্তত্ত্বকে অবরুদ্ধ করছে। রাজনৈতিক যোগাযোগের পরিভাষায়, মানুষের বিস্ময়, ক্ষোভ ও ভয়ের মতো তীব্র আবেগকে পুঁজি করে এই অ্যালগরিদম গঠনমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনকে আড়াল করত এক বিধ্বংসী ‘ইনফরমেশন ক্যাসকেড’ বা তথ্য-বিভ্রাটের জন্ম দেয়। বাংলার জ্ঞানতপস্যার মহীরুহ ও জাতীয় প্রতীক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায়শই এই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়; যেখানে শতবর্ষের প্রামাণ্য ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি, কিংবা একাডেমিক অর্জনসমূহ নীরবে নিভৃতে রয়ে যায়, অথচ আংশিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো বিতর্ক ক্ষণিকের আলোড়নে জনপরিসরকে আচ্ছন্ন করে। তবে এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের একটি সুনির্দিষ্ট নৈতিক সীমারেখা রয়েছে; প্রতিটি তথ্যনির্ভর সমালোচনা গণতান্ত্রিক সমাজের প্রাণস্পন্দন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অপরিহার্য অংশ। কিন্তু যখনই সমালোচনা তার বস্তুনিষ্ঠতা হারিয়ে অসম্পূর্ণ তথ্য ও অ্যালগরিদমিক উত্তেজনার শিকারে পরিণত হয়, তখনই জনপরিসর সত্যের পথ থেকে চ্যুত হয়। এই সংকট উত্তরণে গণমাধ্যম, গবেষক ও নাগরিক সমাজের যৌথ দায়বদ্ধতা রয়েছে—যেখানে দ্রুততার চেয়ে প্রেক্ষাপট ও প্রমাণের সত্যতাই তথ্যের যুগে সবচেয়ে বড় সক্ষমতা।
এই প্রাতিষ্ঠানিক অবমূল্যায়নের প্রবণতাটি মূলত এক গভীর সামাজিক ব্যাধি ও জাতীয় মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন, যাকে লোকায়ত প্রবাদের আলোয় বলা যায়—“আকাশের দিকে মুখ করে থুতু ছুড়ে দিলে তা নিজের গায়েই ফিরে আসে।” মানুষ যখন নিজের চেয়ে বৃহত্তর কোনো ঐতিহাসিক সত্য বা সামষ্টিক চেতনার স্মারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তার লোভে অসত্য ও অন্ধ বিদ্বেষের আশ্রয় নেয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের গৌরব ম্লান হয় না; বরং সমালোচকের নিজেরই বিচারবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রবীন্দ্রনাথের সেই কালজয়ী কবিতার মতো—“তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে / সব গাছ ছাড়িয়ে / উঁকি মারে আকাশে”—যে প্রতিষ্ঠান উচ্চতায় আসীন, ঝড়ের প্রথম আঘাত তাকেই সইতে হয়, কিন্তু সেই আঘাত তার উচ্চতাকে খর্ব না করে বরং তার শিকড়ের দৃঢ়তাকেই প্রমাণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি কেবল তার ইট-পাথরের অবয়বে নয়, বরং তার মুক্তবুদ্ধির সংস্কৃতি ও শতবর্ষের মননশীলতায়। সপ্তদশ শতকের কবি আবদুল হাকিম তাঁর ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় লিখেছিলেন—“যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।” এই সাহিত্যিক রূপককে বর্তমানের উচ্চশিক্ষা ও রাষ্ট্রচিন্তার প্রেক্ষাপটে প্রসারিত করলে দেখা যায়, যে জাতি নিজের ভাষার ইতিহাস ভুলে যায় সে যেমন আত্মপরিচয় হারায়, তেমনি যে সমাজ নিজের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান-ঐতিহ্যের প্রতীককে ইতিহাসবিচ্ছিন্নভাবে অবজ্ঞা করে, সে মূলত নিজের জ্ঞানসভ্যতার ভিত্তিকেই অস্বীকার করে। মহীরুহের মতো দাঁড়িয়ে থাকা এই জাতীয় আলোকবর্তিকা তাই সাময়িক আবেগের তরঙ্গে কম্পিত হয় না, কারণ এর শিকড় প্রোথিত ইতিহাসে, কাণ্ড নির্মিত জ্ঞানে, আর শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নের দিগন্তে।
অমাবস্যার পেঁচা ও চিরন্তন সূর্য: উচ্চশিক্ষা ও প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাজ-মনস্তত্ত্ব
পুরাণের গভীর অরণ্যে আর লোককথার কুয়াশাচ্ছন্ন প্রান্তরে যে অমোঘ লোকায়ত কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়—“পেঁচা রাষ্ট্র করে পেলে কোনো ছুতা / জানো না? সূর্যের সাথে আমার শত্রুতা!”—তা মূলত সময়ের অতল গহ্বর থেকে ভেসে আসা মানব-মনস্তত্ত্বের এক আদিম অন্ধকার গুহার প্রতিধ্বনি। সমাজ-মনোবিজ্ঞানের আলো we লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই রূপকটি আসলে Social Comparison Theory (সামাজিক তুলনা তত্ত্ব), Status Anxiety (মর্যাদাবোধের সংশয়) এবং Symbolic Competition (প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতা)-এর এক ধ্রুপদী আখ্যান। মানুষ বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী অনেক সময় নিজের সামাজিক দৃশ্যমানতা ও অস্তিত্বের দীনতাকে আড়াল করতে সমাজ-মানসে সুপ্রতিষ্ঠিত, অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ও প্রভাবশালী কোনো মহৎ প্রতিষ্ঠান বা প্রতীকের বিরুদ্ধে এক কৃত্রিম, একপাক্ষিক ও প্রতীকী সংঘাতের অবতারণা করে। বড় প্রতীকের অবয়বে আঘাত হেনে বা তার বিরোধিতার ছলে জনপরিসরে নিজের ক্ষণভঙ্গুর অহমিকাকে দৃশ্যমান করাই এই মনস্তত্ত্বের মূল চালিকাশক্তি। অথচ, এই অন্ধকারের বাসিন্দারা ভুলে যায় যে, পেঁচার চিরন্তন বিদ্বেষ বা অস্বীকারে দীপ্তিময় সূর্যের আহ্নিক গতি স্তব্ধ হয় না; সূর্য তার নির্ধারিত কক্ষপথে উদিত হয়ে অরণ্য, পল্লী, সমুদ্র আর নগরকে উষ্ণতার আঁচলে ঢেকে দেয়। এই রূপকের দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক সত্যটি আজকের উত্তর-সত্য (Post-truth) ও ডিজিটাল বিশ্বে এক চরম রূঢ় বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
বর্তমান যুগে মানুষের অবদমিত মনস্তত্ত্ব, সামাজিক মাধ্যমের অন্ধ অ্যালগরিদম এবং তথ্যের সুনিয়ন্ত্রিত অস্পষ্টতা—এই তিনের ত্রিবেণী সংগমে গড়ে উঠেছে গুজবের এক অদৃশ্য মহাসমুদ্র। আর এই কৃত্রিম তরঙ্গের আঘাত আজ আছড়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যার পরম তীর্থক্ষেত্রগুলির গায়ে—হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU), কিংবা আমাদের প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবয়বে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি ইতিহাসের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে সত্য; হার্ভার্ডের অমলিন কীর্তি রাজনৈতিক তর্কের ঊর্ধ্বে নয়, অক্সফোর্ডের ঔপনিবেশিক স্মৃতিবিজড়িত পদচিহ্ন আজও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু, কেমব্রিজের প্রাঙ্গণে কেঁপে উঠেছে ক্ষোভের ঝড়, আর জেএনইউ তো প্রতিনিয়ত বহু-বিচারিত ও আলোচিত। কিন্তু এই মহাসূর্য সদৃশ প্রতিষ্ঠানগুলির প্রকৃত উত্তর লুকায়িত আছে তাদের গভীর গবেষণার নিরন্তর ধারায়, প্রামাণ্য ইতিহাসে আর প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তার অটল বুনিয়ানে। তারা প্রতিদিন পেঁচার ডাক শুনতে বাধ্য হলেও, তাদের সৃষ্টিশীলতার আলোয় সেই কোলাহলকে ডিঙিয়ে এক শ্রুতিমধুর গাম্ভীর্যে আত্মস্থির ভাষায় উদ্ভাসিত হয়।
গুজবের মনোবিজ্ঞান: যখন পেঁচার ডাক অ্যালগরিদমে প্রতিধ্বনিত হয়
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মনোবিজ্ঞানী গর্ডন অলপোর্ট ও লিও পোস্টম্যান তাঁদের যুগান্তকারী গ্রন্থ The Psychology of Rumor (১৯৪৭)-এ মানবমনের এই চিরন্তন দুর্বলতার এক গাণিতিক অথচ রসোত্তীর্ণ সূত্র প্রদান করেছিলেন:
Rumor = Importance X Ambiguity (R = i X a)
এখানে বিষয়টির গুরুত্ব (i) এবং তথ্যের অস্পষ্টতা (a) পরস্পর গুণিতক হয়ে গুজবের তীব্রতা (R) নির্ধারণ করে। এই সূত্রটি যেন পেঁচার সেই লোককথারই এক বিজ্ঞানসম্মত মনস্তাত্ত্বিক অনুবাদ। ডিজিটাল যুগ এই সমীকরণকে বহুগুণে চঞ্চল ও বিপজ্জনক করে তুলেছে, যেখানে তথ্যের চেয়ে আবেগের, এবং সত্যের চেয়ে উত্তেজনার বাজার বেশি চঞ্চল। অলপোর্ট ও পোস্টম্যানের প্রদর্শিত তথ্য বিকৃতির তিনটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া—লেভেলিং (Leveling) বা তথ্যের মূল সূক্ষ্মতা সংকুচিত হওয়া, শার্পেনিং (Sharpening) বা ক্ষুদ্র অংশকে অতিরঞ্জিত করা, এবং অ্যাসিমিলেশন (Assimilation) বা তথ্যকে নিজের পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাস ও কুসংস্কারে রূপান্তর করা—আজ সামাজিক মাধ্যমের যুগে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সম্পাদিত হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে Social Identity Theory (সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব), যেখানে মানুষ নিজের গোষ্ঠীবদ্ধ অহম টিকিয়ে রাখতে প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন বক্তব্য বা আংশিক ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে অবলীলায় সত্যকে বিসর্জন দেয়। ফলে মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় সৃষ্টি হয় এক বিধ্বংসী Information Cascade (তথ্য প্রবাহের অন্ধ অনুকরণ), যেখানে যাচাইহীন আবেগের তাড়নায় বিভ্রমই বাস্তবের চেয়ে বেশি জোরালো ও সত্যের প্রতিযোগী হয়ে দাঁড়ায়।
সূর্যের শান্ত স্থৈর্য: প্রতিষ্ঠানের নীরব সাধনা ও প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা
এই তথ্যকোলাহল আর অ্যালগরিদমিক অন্ধকারের বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—বাংলার জ্ঞানতপস্যার সেই শতবর্ষী প্রাচীন বটবৃক্ষ—আজও তার শান্ত স্থৈর্য নিয়ে আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। ভাষা-আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রভাত, রাষ্ট্রচিন্তার উত্থান-পতন আর শত বছরের কৃতী শিক্ষার্থীদের এক সুবিশাল উত্তরাধিকার বুকে নিয়ে এই আলোর উৎস প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব এতটাই বিপুল যে, অলপোর্ট-পোস্টম্যানের সূত্রানুযায়ী তাকে ঘিরে যেকোনো আংশিক বা অসম্পূর্ণ তথ্য দ্রুত গুজবের ঝড়ে রূপ নিতে পারে। তবে সমাজ-মনোবিজ্ঞানের এই বিশ্লেষণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সীমারেখা রয়েছে; প্রতিটি সমালোচনাই গুজব নয়, এবং প্রতিটি সমালোচকই নেতিবাচক উদ্দেশ্যে তাড়িত নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি, একাডেমিক স্বাধীনতা, গবেষণার মান কিংবা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে তথ্যনির্ভর ও গঠনমূলক সমালোচনা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ ও জীবন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণস্পন্দন।
কিন্তু যখন এই সমালোচনা তার বস্তুনিষ্ঠতা হারিয়ে অসম্পূর্ণ তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃতি ও অ্যালগরিদম-নির্ভর উত্তেজনার শিকারে পরিণত হয়, তখনই তা গুজবের মনোবিজ্ঞানে রূপান্তরিত হয়। মেঘ কখনো সাময়িকভাবে সূর্যের আলোকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু তার অস্তিত্বকে মুছে দিতে পারে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উচ্চতা ও মহীত্ব তার সমালোচকের সংখ্যা বা সামাজিক মাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী কলরব দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং তা নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষে, গবেষণাগারে, গ্রন্থাগারে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির নীরব সাধনায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করার অবিনশ্বর ক্ষমতায়। মহৎ প্রতিষ্ঠানসমূহ ক্ষণিকের নেতিবাচকতাকে আত্মস্থ করে নতুন দিগন্তের প্রেরণা খুঁজে নেয়। কারণ, ইতিহাস সাক্ষী—রাতের অধিপতি পেঁচার ডাক একসময় স্তব্ধ হয়, কিন্তু দিনের অধিপতি সূর্যের উদয় অনিবার্য। দিনশেষে ইতিহাস সেই সত্ত্বাকেই পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করে, যে আলো দিতে জানে, যে অন্ধকার দূর করতে পারে এবং যে নিজের সৃজনশীল কর্মনিষ্ঠায় অটল থেকে পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত জাগরিত রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের জন্য তেমনই এক অবিনশ্বর উদয়ের নাম—যার আলো কখনো নিভবে না।
আলোচনা: বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশ্বসংগঠন, একটি বিশ্বসমাজ—সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, কিন্তু ক্ষণস্থায়ী নেতিবাচকতার ঊর্ধ্বে
উচ্চশিক্ষা বিষয়ক সমসাময়িক সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়কে আর কেবল একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয় না; বরং তাকে একটি "World Organization" বা বিশ্বসংগঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। জার্মান সমাজতাত্ত্বিক রুডলফ স্টিখভে (fv) তাঁর The University as a World Organization অধ্যায়ে দেখিয়েছেন, মধ্যযুগীয় ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্ন থেকেই এর জ্ঞান, ডিগ্রি এবং বৌদ্ধিক বৈধতা কোনো একটি শহর বা রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একই সঙ্গে স্থানীয় এবং বৈশ্বিক—একটি প্রতিষ্ঠান, যার শিকড় একটি নির্দিষ্ট নগরে প্রোথিত হলেও যার বৌদ্ধিক বিস্তার সমগ্র বিশ্বজুড়ে।
এই তাত্ত্বিক আলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়; কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা-ব্যবস্থার অংশ। এর শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জ্ঞানচর্চা আজ বহু দেশের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল একটি স্থানীয় রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে বিচার করা তাত্ত্বিকভাবেও অসম্পূর্ণ। কারণ একটি ফ্ল্যাগশিপ বিশ্ববিদ্যালয় তার চারপাশের ক্ষণস্থায়ী জনমতের চেয়ে অনেক বৃহত্তর একটি জ্ঞান-পরিবেশের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে বৈধতার উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞান উৎপাদন, গবেষণা, প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব এবং বৈশ্বিক একাডেমিক স্বীকৃতি। উচ্চশিক্ষার সাংগঠনিক তত্ত্বও বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক ব্যবস্থা (system), ক্ষেত্র (field) এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে, যার পরিচয় কেবল জাতীয় সীমানায় আবদ্ধ নয়।বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি কেবল একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বোঝা হয়, তবে তার প্রকৃত ঐতিহাসিক ও বৌদ্ধিক পরিচয়ের অধিকাংশই অদৃশ্য থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম রাষ্ট্রের পূর্বে নয়, কিন্তু তার বৌদ্ধিক পরিণতি রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করে। রাষ্ট্র তাকে আইন দেয়, সমাজ তাকে শিক্ষার্থী দেয়, কিন্তু জ্ঞান তাকে বিশ্বজনীনতা দেয়। এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ভূখণ্ডের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; এটি মানবসভ্যতার দীর্ঘ জ্ঞান-অভিযাত্রার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, যেখানে প্রতিটি প্রজন্ম পূর্ববর্তী প্রজন্মের অর্জিত প্রজ্ঞার সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে এবং সেই সংলাপের ভেতর দিয়েই ভবিষ্যতের জ্ঞানের ভিত্তি নির্মিত হয়।
ভিলহেল্ম ফন হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক দর্শন নির্মাণ করেছিলেন Lehrfreiheit (শিক্ষাদানের স্বাধীনতা) এবং Lernfreiheit (শেখার স্বাধীনতা)-এর ওপর। তাঁর দৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক নৈতিক পরিসর, যেখানে জ্ঞান কখনো রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অধীন হতে পারে না। পরবর্তীকালে কার্ল ইয়াসপার্স তাঁর The Idea of the University গ্রন্থে বিশ্ববিদ্যালয়কে সংজ্ঞায়িত করেন সত্যের নিরবচ্ছিন্ন অনুসন্ধানের সম্প্রদায় হিসেবে। ইয়াসপার্সের ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি ভবনের স্থাপত্যে নয়, বরং সেই স্বাধীন বৌদ্ধিক পরিবেশে, যেখানে প্রশ্ন করার অধিকারই জ্ঞানের প্রথম শর্ত। অতএব বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু প্রশাসনিক ক্ষমতা নয়; বরং সত্য অনুসন্ধানের নৈতিক সাহস।
সমকালীন উচ্চশিক্ষা-সমাজতত্ত্ব এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে। রুডলফ স্টিখভে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যাখ্যা করেছেন একটি World Organization হিসেবে—এমন এক প্রতিষ্ঠান, যার ভৌগোলিক অবস্থান স্থানীয় হলেও তার জ্ঞানতাত্ত্বিক নাগরিকত্ব বিশ্বজনীন। মধ্যযুগীয় ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেই যে বৈশ্বিক একাডেমিক সম্প্রদায়ের সূচনা, আজকের গবেষণা-সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, একাডেমিক গতিশীলতা এবং আন্তঃরাষ্ট্রিক জ্ঞান-বিনিময় সেই ধারারই সম্প্রসারণ। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো একক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে বিচার করা উচ্চশিক্ষার সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে সংকুচিত করে ফেলে।
এই আলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ও নতুন তাৎপর্যে উদ্ভাসিত হয়। এটি বাংলাদেশের একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়—এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এটিও সমান সত্য যে এটি একটি বৈশ্বিক জ্ঞান-ব্যবস্থার অংশ। এর গবেষণা আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়; এর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জ্ঞান-বিনিময়ে অংশগ্রহণ করেন; এর প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, নীতিনির্ধারণ এবং গবেষণাক্ষেত্রে অবদান রাখেন। সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় কেবল রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয় না; বরং বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত এক বৌদ্ধিক নেটওয়ার্কের মধ্যেও তার অবস্থান নির্মিত হয়।
ক্লার্ক কের তাঁর The Uses of the University-এ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়কে Multiversity হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন—এমন এক জটিল প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং সমাজ একে অপরের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্কে যুক্ত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কখনো একরৈখিক নয়; এটি সর্বদাই বহুস্বরের সমাবেশ। আর সেই বহুস্বরের কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে মতপার্থক্য থাকবে, বিতর্ক থাকবে, এমনকি সংঘাতও থাকবে। কিন্তু মতভেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্বলতা নয়; বরং তার প্রাণশক্তিরই বহিঃপ্রকাশ।
রাজনৈতিক যোগাযোগ তত্ত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ডিজিটাল যুগে দৃশ্যমানতা (visibility) এবং বৈধতা (legitimacy) এক বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কোনো বিষয়কে মুহূর্তের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে, কিন্তু সেই আলোচনার তীব্রতা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ঐতিহাসিক মর্যাদা নির্ধারণ করে না। ক্ষণস্থায়ী জনমত, আবেগনির্ভর প্রচার কিংবা পুনরাবৃত্ত ডিজিটাল বয়ান প্রায়ই বাস্তবতার পরিবর্তে প্রতীকের ওপর নির্ভর করে। ফলে জনপরিসরের উচ্চকণ্ঠতা এবং ইতিহাসের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি—এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।
এই পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে জন ডব্লিউ. মেয়ারের World Society Theory বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর বিশ্লেষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধতা জাতীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে নয়; বরং বৈশ্বিক জ্ঞান-মানদণ্ড, আন্তর্জাতিক গবেষণা-সম্প্রদায়, আন্তঃরাষ্ট্রিক একাডেমিক সহযোগিতা এবং বিশ্বব্যাপী পেশাগত সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়। অর্থাৎ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করে তার জ্ঞানসৃষ্টির সক্ষমতা, নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক আস্থা—তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বয়ান নয়।
পিয়ের বুর্দিয়ের ভাষায় বিশ্ববিদ্যালয় একটি Field of Knowledge, যেখানে প্রতিনিয়ত প্রতীকী পুঁজি (symbolic capital), সাংস্কৃতিক পুঁজি (cultural capital) এবং বৈজ্ঞানিক কর্তৃত্বের জন্য প্রতিযোগিতা চলে। এই প্রতিযোগিতা কখনো কখনো তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়; কিন্তু সেই বিতর্কের মধ্য দিয়েই জ্ঞানের পরিসর সম্প্রসারিত হয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি মতৈক্যে নয়; বরং যুক্তিসংগত মতভেদের সক্ষমতায়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক নেই, সেখানে জ্ঞানও স্থবির হয়ে পড়ে।
রোনাল্ড বার্নেট বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখেছেন এক Supercomplex World-এর প্রতিষ্ঠান হিসেবে—এমন এক বিশ্বে, যেখানে নিশ্চিত সত্যের চেয়ে অনিশ্চয়তা বেশি, সরল উত্তরের চেয়ে জটিল প্রশ্ন বেশি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ জনপ্রিয় মতকে অনুসরণ করা নয়; বরং জটিল বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার বৌদ্ধিক সক্ষমতা সৃষ্টি করা। এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় কখনো জনমতের প্রতিধ্বনি নয়; বরং জনমতের সমালোচনামূলক বিবেক।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানের আলোচনাও একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। যে প্রতিষ্ঠান একটি জাতির বৌদ্ধিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, তাকে ঘিরে আবেগ, প্রত্যাশা, হতাশা এবং সমালোচনার মাত্রাও স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ব্যক্তিগত ক্ষোভ, মতাদর্শগত বিভাজন, গোষ্ঠীগত পরিচয় কিংবা অ্যালগরিদমিক তথ্যপ্রবাহ কোনো শতবর্ষী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না। একটি বিশ্বসংগঠনের স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি, গবেষণার ধারাবাহিকতা, জ্ঞানসৃষ্টির সক্ষমতা এবং প্রজন্মান্তরে নির্মিত মানবসম্পদের ওপর।
অতএব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বোঝার জন্য প্রয়োজন সাময়িক রাজনৈতিক আবহ, ডিজিটাল প্রতিক্রিয়া কিংবা ক্ষণস্থায়ী জনবয়ানের সীমা অতিক্রম করে তার দীর্ঘ ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক এবং সভ্যতাগত অবস্থানকে উপলব্ধি করা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সরকারের নয়, কোনো রাজনৈতিক মতবাদের নয়, এমনকি কোনো একক প্রজন্মেরও নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মূলত সময়ের দীর্ঘ নদীতে প্রবাহমান এক বৌদ্ধিক সভ্যতা, যেখানে প্রতিটি প্রজন্ম সাময়িক, কিন্তু জ্ঞানচর্চা স্থায়ী; ব্যক্তি পরিবর্তিত হয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান তার প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি ও বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করতে থাকে।
এই কারণেই একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়; বরং যুক্তিনিষ্ঠ, প্রমাণভিত্তিক এবং নৈতিক সমালোচনাই তার বিকাশের পূর্বশর্ত। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক উত্তেজনা, ডিজিটাল নেতিবাচকতা বা জনপরিসরের সাময়িক প্রতিক্রিয়ার আলোকে বিচার করা মানে তাকে তার বিশ্বজনীন বৌদ্ধিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার জ্ঞানসৃষ্টির ধারাবাহিকতা, সভ্যতার প্রতি অবদান এবং মানবজাতির সম্মিলিত বৌদ্ধিক অভিযাত্রায় তার স্থায়ী অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই।
কার্ল ইয়াসপার্সের বিশ্ববিদ্যালয়-দর্শন, ভিলহেল্ম ফন হুমবোল্টের জ্ঞান ও স্বাধীনতার ধারণা, ক্লার্ক কেরের বহুমাত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় (Multiversity)-তত্ত্ব, রোনাল্ড বার্নেটের Supercomplex University ধারণা, পিয়ের বুর্দিয়ের জ্ঞানক্ষেত্র (Field of Knowledge) ও প্রতীকী পুঁজির (Symbolic Capital) বিশ্লেষণ এবং জন ডব্লিউ. মেয়ারের বিশ্বসমাজ (World Society) তত্ত্বের সমন্বিত আন্তঃপাঠমূলক বিশ্লেষণ একটি মৌলিক নীতিগত সত্যের দিকে নির্দেশ করে। সেই সত্য হলো—বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কোনো মূল্যায়ন, সমালোচনা বা নীতিগত অবস্থানের গ্রহণযোগ্যতা কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে জ্ঞানগত কর্তৃত্ব (Epistemic Authority), একাডেমিক বৈধতা (Academic Legitimacy), গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ এবং গবেষণাগত জবাবদিহিতার (Scholarly Accountability) মানদণ্ড পূরণের ওপর।
বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মত প্রকাশ করার অধিকার নিঃসন্দেহে সকল নাগরিকের রয়েছে। তবে একাডেমিক পরিসরে একটি মতামতের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয় বক্তার পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং তার যুক্তির গুণমান, ব্যবহৃত পদ্ধতি, প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা এবং গবেষণাগত সততার ভিত্তিতে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নীতিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বয়ান কিংবা অনুমাননির্ভর ধারণার বিষয় নয়; এটি একটি প্রমাণনির্ভর জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি বক্তব্যকে যুক্তি, উপাত্ত এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাইযোগ্য হতে হয়।
এই প্রেক্ষাপটে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কর্মকাণ্ড, গবেষণা-সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক জীবন, নীতিগত কাঠামো কিংবা জ্ঞান-উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা গবেষণাগতভাবে সম্পৃক্ত নয় এবং যার বিশ্লেষণ সহকর্মী-পর্যালোচিত (peer-reviewed) গবেষণা, যাচাইযোগ্য উপাত্ত বা প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, তার উত্থাপিত অনুমাননির্ভর (hypothetical), প্রমাণবিহীন বা সাধারণীকরণমূলক নেতিবাচক অভিযোগ একাডেমিক বৈধতার পর্যাপ্ত ভিত্তি অর্জন করে না। এমন বক্তব্য জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হতে পারে, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গবেষণালব্ধ সত্য বা নীতিগতভাবে প্রতিষ্ঠিত মূল্যায়নে পরিণত হয় না।
উচ্চশিক্ষা-তত্ত্বের আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বৈশ্বিক জ্ঞানপ্রতিষ্ঠান (Global Knowledge Institution) হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার সুনাম, বৈধতা এবং মর্যাদা গড়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, জ্ঞান উৎপাদন, আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং বৈশ্বিক সহকর্মী-সমাজের স্বীকৃতির ভিত্তিতে। ফলে এমন প্রতিষ্ঠানের সমালোচনাও হতে হবে একই মাত্রায় প্রমাণসমর্থিত (Evidence-Informed), পদ্ধতিগতভাবে সুসংহত (Methodologically Rigorous) এবং গবেষণাগতভাবে জবাবদিহিমূলক (Scholarly Accountable)। অন্যথায় সেই সমালোচনা একাডেমিক বিতর্কের অংশ না হয়ে জনমত, মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত অবস্থানের প্রকাশ হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
অতএব, একটি বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নীতিগত সমালোচনার বৈধতা নির্ভর করে সমালোচনার তীব্রতার ওপর নয়, বরং তার প্রমাণের দৃঢ়তা, বিশ্লেষণের গভীরতা, পদ্ধতিগত শুদ্ধতা এবং বৌদ্ধিক সততার ওপর। প্রকৃতপক্ষে উচ্চ শিক্ষার একাডেমিক তত্ত্বগুলো সাধারণভাবে এই সিদ্ধান্ত দেয় যে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য একাডেমিক দাবি প্রমাণ, পদ্ধতি ও যুক্তির ওপর নির্ভরশীল। এগুলো এমন দাবি করে না যে শুধু প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ব্যক্তিরাই বৈধ সমালোচনা করতে পারেন। বাস্তবে বহিরাগত গবেষক, স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ, স্বীকৃত মূল্যায়নকারী সংস্থা বা অনুসন্ধানী গবেষকেরাও কঠোর গবেষণাপদ্ধতি অনুসরণ করে বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা উপস্থাপন করতে পারেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করে আবেগনির্ভর অভিযোগ নয়; বরং গবেষণালব্ধ সত্য, যুক্তিনিষ্ঠ সমালোচনা এবং জ্ঞানভিত্তিক নীতিগত পর্যালোচনা। এ কারণেই বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যেকোনো সমালোচনা এমন মানদণ্ড অনুসরণ করা উচিত, যা আন্তর্জাতিক একাডেমিক সম্প্রদায়ে গ্রহণযোগ্য গবেষণা ও নীতিবিশ্লেষণের মৌলিক নৈতিক ও বৈজ্ঞানিক শর্ত পূরণ করে।
নীতিগত উপযোগিতা ও বাংলাদেশের ফ্ল্যাগশিপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ (Policy Implications and the Future of Bangladesh's Flagship University)
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে যে কোনো নীতিগত আলোচনা শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক সত্যের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়—কোনো জাতির সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্রের জ্ঞান-সার্বভৌমত্ব, গবেষণা-সক্ষমতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে জনপরিসরে যে বিতর্ক, সমালোচনা কিংবা প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়, তার নীতিগত তাৎপর্য কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। উচ্চশিক্ষা তত্ত্বে Flagship University ধারণা নির্দেশ করে, একটি দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় তার সমগ্র উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানদণ্ড, গবেষণার দিকনির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিচয়ের প্রধান বাহক। অতএব, এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নীতি হওয়া উচিত ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তা বা প্রতিক্রিয়াশীল বিতর্কনির্ভর নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রদর্শন, প্রমাণনির্ভর নীতিনির্ধারণ এবং একাডেমিক স্বাধীনতার ভিত্তিতে নির্মিত। রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষা যদি জ্ঞানকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে এবং সামাজিক মনোবিজ্ঞানের আলোকে নেতিবাচকতা, গুজব ও প্রতীকী সংঘাতের পরিবর্তে আস্থা, অংশীদারিত্ব ও সমালোচনামূলক সংলাপকে উৎসাহিত করে, তবে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং উদ্ভাবন, নীতি-উদ্ভব, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং গণতান্ত্রিক নাগরিকতা নির্মাণের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি উচ্চশিক্ষা নীতি, যেখানে গবেষণায় বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর একাডেমিক স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক সুশাসন একই নীতিমালার পরস্পর-সম্পূরক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ একটি জাতির ফ্ল্যাগশিপ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষা করা মানে কেবল অতীতের ঐতিহ্য সংরক্ষণ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ভিত্তি সুদৃঢ় করা। বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আমাদের প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্ত তাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ কি জ্ঞাননির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, নাকি সাময়িক বিতর্কের আবর্তে নিজের দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনাকেই সীমাবদ্ধ করে ফেলবে।
সামনের পথ (Way forward): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে বিতর্ক নয়, জ্ঞানভিত্তিক জাতীয় ঐকমত্যের সময়
কোনো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ কেবল তার উপাচার্য, শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করে না; বরং রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক, শিল্পখাত, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। আজকের বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় আর শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, নীতি প্রণয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে আমাদের আলোচনাও অতীতের আবেগ বা বর্তমানের বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণের দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন করে ভাবতে হবে।
- প্রথমত, গবেষণায় বিনিয়োগকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্বের প্রথম সারির কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কেবল দক্ষ শিক্ষক বা মেধাবী শিক্ষার্থীর কারণে বিশ্বমানের হয়নি; বরং ধারাবাহিক গবেষণা অর্থায়ন, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণার স্বাধীনতার কারণে তারা এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশেও যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও শক্তিশালী করা হয়, তাহলে সেটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন হবে না; বরং সমগ্র দেশের গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। একটি উন্নয়নশীল দেশ জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
- দ্বিতীয়ত, একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন আরও শক্তিশালী করা জরুরি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি হলো স্বাধীন চিন্তা, মুক্ত বিতর্ক এবং গবেষণার স্বাধীনতা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যদি ভয়, অনিশ্চয়তা বা অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করেন, তাহলে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান উৎপাদনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেগুলোতে প্রশাসনিক জবাবদিহির পাশাপাশি একাডেমিক স্বাধীনতাও সমানভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে মতের বহুমাত্রিকতা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্ককে উৎসাহিত করা জাতীয় স্বার্থের অংশ হওয়া উচিত।
- তৃতীয়ত, সমালোচনার সংস্কৃতিকেও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সমালোচনা হবে, প্রশ্ন উঠবে, তদন্ত হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সমালোচনা যেন তথ্য, গবেষণা এবং নীতিগত বিশ্লেষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা যেমন অনুচিত, তেমনি বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার করাও সমানভাবে ক্ষতিকর। সাংবাদিক, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং জনবুদ্ধিজীবীদের উচিত এমন একটি জনপরিসর তৈরি করা, যেখানে মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু তথ্য বিকৃত হবে না; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়; বিতর্ক থাকবে, কিন্তু সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতাও অটুট থাকবে।
- চতুর্থত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের (Alumni) সম্পৃক্ততা নতুনভাবে ভাবতে হবে। বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে তাদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাই গবেষণা তহবিল, বৃত্তি, উদ্ভাবন কেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও দেশ-বিদেশে বিস্তৃত একটি শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক রয়েছে। এই নেটওয়ার্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গবেষণা, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে যুক্ত করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
- সবশেষে, একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধুই অতীতের গৌরবের প্রতীক হিসেবে দেখব, নাকি ভবিষ্যতের জ্ঞানসমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলব? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের নীতিতে নয়; আমাদের সামাজিক আচরণ, জনআলোচনার ভাষা এবং জাতীয় অগ্রাধিকারের মধ্যেও নিহিত। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের করতে হলে কেবল তার কাছে বিশ্বমানের ফলাফল দাবি করলেই হবে না; তাকে বিশ্বমানের পরিবেশ, সম্পদ, স্বাধীনতা এবং সামাজিক আস্থাও দিতে হবে। কারণ যে জাতি তার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করে, সে জাতি আসলে নিজের ভবিষ্যতেই বিনিয়োগ করে।
শেষকথা: আত্মসমালোচনা হোক, আত্মঅস্বীকার নয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ত্রুটিহীন পরম সত্তা নয়; এর প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, গবেষণায় অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আবাসন সংকট কিংবা আন্তর্জাতিকীকরণের অভাব—উচ্চশিক্ষার নিরিখে অত্যন্ত রূঢ় এক বাস্তবতা। কিন্তু সীমিত সম্পদ ও বহুমাত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও শতবর্ষ ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব তৈরি করে জাতীয় মননশীলতার দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো হিসেবে অক্ষুণ্ণ রয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের আলোকে এখানে মূল সংকটটি আর বিদ্যায়তনকে নিয়ে থাকে না, তা রূপ নেয় এক গভীর জাতীয় মানসিকতার প্রশ্নে—একটি পরিণত সমাজ কি তার শীর্ষ জ্ঞানপীঠকে অন্ধভাবে মহিমান্বিত করবে, নাকি সাময়িক জনপ্রিয়তার সস্তা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে উদ্দেশ্যহীন অবমূল্যায়নের লক্ষ্যবস্তু বানাবে?
একটি প্রাজ্ঞ ও দায়বদ্ধ সমাজ কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেবতা বানায় না, আবার তাকে ধ্বংসের প্রতিযোগিতাতেও নামে না; বরং সে অন্ধ প্রশংসা ও আত্মঅস্বীকারের দুই চরম পন্থা বর্জন করে তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং যুক্তিনিষ্ঠ সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে তোলে। কারণ, কোনো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠকে দুর্বল করা জাতীয় শক্তি বৃদ্ধির পরিপন্থী, যা প্রকারান্তরে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই সংকুচিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল বর্তমানের প্রশাসনিক অবয়ব নয়, এটি এই জাতির সম্মিলিত বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তার ভিত্তিভূমি। তাই সময়ের অমোঘ দাবি—ত্রুটিসমূহ আড়াল না করে আত্মসমালোচনা হোক, কিন্তু আত্মঅস্বীকার নয়; প্রামাণ্য সংস্কার হোক, কিন্তু উদ্দেশ্যহীন অবমূল্যায়ন নয়; যেন এই মহৎ বিদ্যায়তনকে জাতীয় অগ্রযাত্রার এক অনন্য কৌশলগত সম্পদ হিসেবে আগলে রাখা যায়।
দেশবাসীর প্রতি খোলা চিঠি
জ্ঞান, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন এক উদাত্ত আহ্বান
“আসুন, আমরা আমাদের জ্ঞানমন্দিরকে ধারণ করি”
প্রিয় দেশবাসী,
একটি জাতির পরিচয় কেবল তার ভূখণ্ডে নয়; তার পরিচয় গড়ে ওঠে তার ভাষায়, তার সংস্কৃতিতে, তার ইতিহাসে এবং তার জ্ঞানপ্রতিষ্ঠানে। যে জাতি তার বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্মান করতে শেখে, সে জাতি নিজেকেও সম্মান করতে শেখে। আর যে জাতি নিজের জ্ঞানপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সে ধীরে ধীরে নিজের ভবিষ্যৎকেই দুর্বল করে ফেলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়। এটি আমাদের জাতীয় স্মৃতির অংশ, আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের অংশ। বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার মানুষের উচ্চশিক্ষার অধিকার, বিশেষ করে এই অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর আধুনিক শিক্ষার প্রসার, একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের বিকাশ এবং পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত। ইতিহাস হয়তো কখনো একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান দিয়ে লেখা যায় না, কিন্তু এটাও সত্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস, বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণ এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস কল্পনা করা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আজ বিশ্বের যেখানেই বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা সম্মানের সঙ্গে উড়ে, সেখানে অসংখ্য ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অবদান জড়িয়ে আছে। বিজ্ঞান গবেষণা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, সাহিত্য, কূটনীতি, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থায়—বাংলাদেশের অসংখ্য কৃতী সন্তানের পদচিহ্নের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জড়িয়ে আছে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা নয়; এটি বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একটি বাস্তবতাও আমাদের বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করতে হবে। প্রতিবছর বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, যত বড়ই হোক, সবার জন্য আসন তৈরি করতে পারে না। আসন সীমিত, কিন্তু স্বপ্ন সীমাহীন। ফলে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী সুযোগ না পেলেও তারা ব্যর্থ নয়; বরং তারা দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করছে। বাংলাদেশের শক্তি একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়; বাংলাদেশের শক্তি তার সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই বৃক্ষ, যার ছায়ায় দাঁড়িয়ে বহু প্রতিষ্ঠান নিজেদের বিকাশের প্রেরণা পেয়েছে।
তাই আসুন, আমরা মতভেদ রাখি, সমালোচনা করি, প্রশ্ন করি—কিন্তু আমাদের সমালোচনা হোক তথ্যভিত্তিক, ন্যায্য এবং উন্নয়নমুখী। আমরা যেন এমন কোনো ভাষা ব্যবহার না করি, যা সাময়িক আবেগে আমাদের নিজেদের জাতীয় জ্ঞানপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান নষ্ট হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোনো ব্যক্তি নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মবিশ্বাস।
আসুন, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেবত্ব দিই না, আবার তাকে অবজ্ঞাও না করি। আমরা তাকে আরও শক্তিশালী করার দাবি জানাই। আমরা গবেষণায় বিনিয়োগ চাই, বিশ্বমানের গবেষণাগার চাই, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাই, একাডেমিক স্বাধীনতা চাই, সুশাসন চাই, জবাবদিহি চাই। কারণ একটি শক্তিশালী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ।
আজ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে দেশবাসীর কাছে বিনীত আহ্বান জানাই—আসুন, আমরা আমাদের জাতীয় জ্ঞানপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক বিভাজনের নয়, জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো একটি প্রজন্মের সম্পদ নয়; এটি অতীতের উত্তরাধিকার, বর্তমানের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আমানত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সবার। এটি শুধু শাহবাগের একটি ক্যাম্পাস নয়; এটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার সাহসের আরেকটি নাম। এই প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করা মানে কোনো ব্যক্তি বা প্রশাসনকে সম্মান করা নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, আমাদের ভাষা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের জ্ঞানচর্চা এবং আমাদের ভবিষ্যৎকে সম্মান করা।
একটি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। তাই আসুন, আমরা বিভাজনের ভাষা নয়—জ্ঞান, মর্যাদা, কৃতজ্ঞতা এবং দায়িত্বের ভাষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে কথা বলি।
–লেখক ও গবেষক: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (odhikarpatranews@gmail.com)
#ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় #DhakaUniversity #উচ্চশিক্ষা #HigherEducation #বাংলাদেশ #EducationPolicy #AcademicFreedom #UniversityGovernance #KnowledgeSociety #BangladeshEducation

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: