নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) চলমান তীব্র সহিংসতা ও সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনামে ব্যবহৃত শব্দচয়ণ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রস্থিত ভারতীয় দূতাবাস। প্রতিবেদনটিতে অঞ্চলটিকে ‘পাকিস্তানি কাশ্মীর’ হিসেবে উল্লেখ করায় একে ‘বিভ্রান্তিকর ও ভুল’ আখ্যা দিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে ভারত। অন্যদিকে, গত কয়েক দিন ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর শিরোনাম ও ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিবাদ
গত ২৮ জুলাই মার্কিন দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের স্থানীয় নির্বাচন ও চলমান সহিংসতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যার শিরোনাম ছিল— স্থানীয় নির্বাচন শুরু হওয়ার সাথে সাথে পাকিস্তানি কাশ্মীরে সংঘর্ষ শুরু (Conflicts Erupt in Pakistani Kashmir as Local Elections Get Underway)। প্রতিবেদনে অঞ্চলটিকে ‘পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
এই শিরোনামের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস। দূতাবাসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়: পাকিস্তানি কাশ্মীর বলে কিছু নেই, এটি কেবলই ‘পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলো ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, আছে এবং সর্বদা থাকবে। পাকিস্তান অবৈধভাবে এই অঞ্চলগুলোর কিছু অংশ দখল করে রেখেছে এবং বর্তমানে সেখানকার সাধারণ মানুষের ওপর দমনপীড়ন চালাচ্ছে।
পিওকে-তে চলমান সহিংসতা ও মানবিক সংকট
পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে দীর্ঘ সময় ধরে চলা পদ্ধতিগত শোষণ এবং প্রশাসনিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে সাধারণ মানুষ। ৩৮ দফা দাবিতে গত ৫ জুন থেকে এই আন্দোলন শুরু হলেও ২৭ জুলাই সাধারণ নির্বাচন শুরুর পর থেকে সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করে।
প্রাণহানি: আন্দোলনকারীদের নেতৃত্বদানকারী অরাজনৈতিক সংগঠন ‘জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (JAAC)-এর তথ্যমতে, গত কয়েকদিনের ধারাবাহিক সংঘর্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। রাওয়ালকোট ও মিরপুরে তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এবং সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানবিক সংকট: বিক্ষোভ দমনে অঞ্চলটিতে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছে প্রশাসন। খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধসহ জীবনরক্ষাকারী পণ্যের প্রবেশ সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট সেবা বিচ্ছিন্ন করায় ব্যাংকিং ও এটিএম সেবা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি কারফিউ জারি ও গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় অঞ্চলটি কার্যত গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
আন্দোলনের মূল দাবি
জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’র নেতৃত্বে চলা এই গণআন্দোলনের মূল দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—
সংরক্ষিত আসন বাতিল: কাশ্মীরের বাইরে অবস্থানকারী কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই আসনগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সরকার নিজেদের ইচ্ছামতো অঞ্চলটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
সেনা প্রত্যাহার: পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রেঞ্জার্সদের প্রত্যাহার করা।
নির্বাচনী সংস্কার: স্থানীয় প্রশাসনের স্বাধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার আনা।
বিশ্লেষকদের মতে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরকে ভুলভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রতিবাদ করে ভারত আন্তর্জাতিক মহলে তাদের সুদৃঢ় অবস্থান আবারও স্পষ্ট করল। একই সঙ্গে পিওকে-র অভ্যন্তরীণ এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও মানবিক বিপর্যয় এখন আঞ্চলিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: