নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌদি আরব এখন মুসলিম বিশ্বের দুই সামরিক পরাশক্তি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি ন্যাটো-স্টাইলের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পবিত্র মক্কায় শুক্রবার তিন দেশের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির মূল বিষয়বস্তু ও আঞ্চলিক প্রভাব নিচে তুলে ধরা হলো:
চুক্তির মূল বিষয়সমূহ
যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি: চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে (যা ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫ এর অনুরূপ)।
নেতৃবৃন্দ: সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা: চুক্তির উদ্দেশ্য হলো যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সামরিক গোয়েন্দা তথ্য শেয়ারিং, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং যৌথ সামরিক মহড়া জোরদার করা।
অন্যান্য দেশের অন্তর্ভুক্তি: ন্যাটোর আদলে তৈরি এই জোটে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ইচ্ছুক দেশগুলোও যোগ দিতে পারবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তিন শক্তির সমন্বিত শক্তি
এই চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী তিনটি সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি একত্রিত হয়েছে:
সৌদি আরব: অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং জ্বালানি সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র।
তুরস্ক: ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির অধিকারী এবং উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে (বিশেষ করে ড্রোন নির্মাণে) অগ্রগামী।
পাকিস্তান: মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং অত্যন্ত অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী সমৃদ্ধ রাষ্ট্র।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ইরানের প্রতিক্রিয়া
মার্কিন আস্থার সংকট: ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর আস্থা কমে যাওয়ার কারণেই রিয়াদ এমন বিকল্প ও স্বাধীন নিরাপত্তার পথ বেছে নিয়েছে।
ইরান ও আঞ্চলিক উত্তেজনা: চলমান ইরান সংকটের জেরে সৌদির তেল শোধনাগার ও অবকাঠামোতে বারবার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। এই চুক্তি মূলত তেহরানের জন্য একটি শক্ত বার্তা, যেন নতুন কোনো বড় আক্রমণ পাকিস্তান ও তুরস্ককে এই সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে না পারে।
তেহরানের অসন্তোষ: চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজাঈ কড়া ভাষায় মন্তব্য করেছেন যে, আমেরিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি একতরফা নির্ভরতা যেমন সৌদিকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি, তেমনি তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই "কাগজে-কলমের চুক্তিও" কোনো নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না।
সৌদি আরব এবং তুরস্ক অবশ্য স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এই চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন নয় বা কোনো সাম্প্রদায়িক বা সামরিক অক্ষ তৈরির প্রচেষ্টা নয়; বরং এটি সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক একটি উদ্যোগ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামোকে চিরতরে বদলে দিতে পারে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: