অধিকার পত্র ডটকম
ইরান, গাজা ও লেবাননে সংঘাতের সময়ে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সক্ষম ব্যক্তিদের একে একে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। আল জাজিরায় প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে এমন দাবি করেছেন ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক মাহজুব জুয়েরি।
১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিবন্ধে জুয়েরি বলেন, যুদ্ধ শেষ করতে কেবল সামরিক চাপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাদের আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এমন ব্যক্তিদের সরিয়ে দিলে যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনাও সংকুচিত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
নিবন্ধে ইরানের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা আলী লারিজানির হত্যার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। লেখক উল্লেখ করেন, ব্রিটেনের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান স্যার জন সওয়ার্স সেপ্টেম্বরের শুরুতে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেছিলেন, লারিজানিকে ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেছে এবং তিনি এমন কয়েকজন ইরানি ব্যক্তির একজন ছিলেন, যাদের মাধ্যমে উভয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারত।
তবে আল জাজিরার ওই নিবন্ধেও স্পষ্ট করা হয়েছে, ইসরায়েলের কোনো হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য কূটনৈতিক আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া ছিল—এমন অভিপ্রায় অনুমান করা হলেও তা প্রমাণিত নয়। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযানকে সামরিক ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পুরোনো উদাহরণও টেনেছেন লেখক
জুয়েরি ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক মধ্যস্থতাকারী কাউন্ট ফোল্কে বার্নাডোট হত্যার উদাহরণ টেনেছেন। তাঁর মতে, যুদ্ধবিরতি ও বিভাজনসংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে মধ্যস্থতা করার সময় বার্নাডোটকে জেরুজালেমে হত্যা করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২০ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মোহসেন ফাখরিজাদেহ হত্যার ঘটনাও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের মতে, সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেন নির্বাচিত হওয়ার পর ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার আলোচনা সামনে আসছিল। ওই প্রেক্ষাপটে ফাখরিজাদেহ হত্যাকে কেউ কেউ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পথে বাধা হিসেবে দেখেছিলেন।
গাজা ও লেবাননের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতার কথা বলেছেন জুয়েরি। ১৯৯২ সালে হিজবুল্লাহর তৎকালীন মহাসচিব আব্বাস আল-মুসাভি হত্যার পর হাসান নাসরাল্লাহ নেতৃত্বে আসেন বলে উল্লেখ করে লেখক দাবি করেন, পরবর্তী সময়ে সংগঠনটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালে হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়েহ হত্যার ঘটনাকেও আলোচনার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে। আল জাজিরার ওই মতামত অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলার সময় হানিয়েহকে হত্যা করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে আলোচনার প্রক্রিয়া আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
ইসরায়েলের কৌশল নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে
জুয়েরি লিখেছেন, ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব অভিযানকে কেবল প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাদের ঘোষিত নিরাপত্তা ও সামরিক লক্ষ্য বিবেচনা করাও প্রয়োজন। তাঁর মতে, ইসরায়েল ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নিজেদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে এবং সামরিক চাপের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থাকে দুর্বল করার লক্ষ্য অনুসরণ করছে—এমন বিশ্লেষণ রয়েছে।
একই সঙ্গে লেখক স্বীকার করেছেন, কোনো নেতাকে সরিয়ে দিলে যে পরবর্তী নেতৃত্ব অবশ্যই আরও কঠোর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অতীতের ঘটনাগুলোতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্টো আরও শক্ত অবস্থানের নেতৃত্ব সামনে এসেছে—এমন উদাহরণও তিনি দিয়েছেন।
নিবন্ধের শেষাংশে জুয়েরি প্রশ্ন তুলেছেন, যদি সংঘাতের সময় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে সক্ষম ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে যুদ্ধ শেষ করার জন্য শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে কে থাকবে।
আল জাজিরা জানিয়েছে, নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং তা আল জাজিরার সম্পাদকীয় অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে না।
