odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Sunday, 25th October 2026, ২৫th October ২০২৬
ইরানের সরকার উৎখাতকে ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য বললেন নেতানিয়াহু; তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিমান হামলায় সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা সম্ভব হলেও স্থলবাহিনী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সরকার পরিবর্তন অত্যন্ত কঠিন।

ইরানে সরকার পরিবর্তনের হুমকি নেতানিয়াহুর, তেহরানের ক্ষমতাসীনদের উৎখাত কি সম্ভব?

odhikarpatra | প্রকাশিত: ২৫ October ২০২৬ ১৬:৫৬

odhikarpatra
প্রকাশিত: ২৫ October ২০২৬ ১৬:৫৬

অধিকারপত্র ডটকম | আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি

ইরানের ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করাকে ইসরায়েলের ‘প্রধান লক্ষ্য’ বলে ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে সামরিক শক্তিতে ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর সক্ষমতা থাকলেও শুধু বিমান হামলা চালিয়ে তেহরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা-এর ২২ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও সরকার উৎখাতের জন্য ইসরায়েলের সুস্পষ্ট কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন—কোনোটিই নিশ্চিত নয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহের জাতীয় নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে সমর্থন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটেও নেতানিয়াহু ইরান সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

 ইরানের বিরুদ্ধে হামলার সামরিক সক্ষমতা আছে ইসরায়েলের?

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের উন্নত যুদ্ধবিমান, দূরপাল্লার হামলার অস্ত্র এবং আকাশে জ্বালানি নেওয়ার সক্ষমতা দেশটিকে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার সুযোগ দেয়। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) গবেষক আরবান কনিংহাম আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েল আবারও আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে।

কিন্তু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা আর একটি দেশের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা, গোপন সামরিক স্থাপনা এবং পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন। ফলে ব্যাপক বিমান হামলা হলেও ইরানের সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

 সরকার উৎখাতে স্থল অভিযান কি অপরিহার্য?

তুরস্কের কায়সেরিতে অবস্থিত আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক চাগলার কুরচের মতে, বিমান হামলা ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে পারে, কিন্তু দেশটির পাল্টা আঘাত হানার সব উপায় নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। বিশেষ করে, ভূগর্ভে বা দুর্গম স্থানে লুকিয়ে রাখা সামরিক ব্যবস্থা টিকে যেতে পারে।

তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের সরকারকে উৎখাত করতে হলে শুধু আকাশপথে হামলা যথেষ্ট হবে না; স্থলবাহিনী মোতায়েন এবং দীর্ঘ সময় দেশটির ভূখণ্ডে অবস্থান করার মতো সামরিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি প্রয়োজন হতে পারে।

এ ধরনের অভিযান ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। ইরানের বিশাল ভূখণ্ড, সামরিক অবকাঠামো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার মুখে দীর্ঘমেয়াদি স্থলযুদ্ধ চালানো সহজ হবে না।

 গোপন অভিযান ও সাইবার হামলা কতটা কার্যকর হবে?

ইরানের অভ্যন্তরে গোয়েন্দা তৎপরতা, সাইবার হামলা এবং সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহায়তা নেওয়ার মতো বিকল্পও ইসরায়েলের সামনে রয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

কনিংহামের মতে, গোপন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে সেগুলো শনাক্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ইরানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এসব নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। ফলে কোনো অভিযান তাৎক্ষণিক সামরিক সাফল্য দিলেও ভবিষ্যতের গোয়েন্দা কার্যক্রমের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইরানের কুর্দি বা বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সরকারবিরোধী স্থলশক্তি হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কনিংহামের মতে, কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সামরিক চ্যালেঞ্জ গড়ে তোলার মতো সক্ষমতা নেই।

ইরানের পাল্টা হামলার সক্ষমতা এখনো বড় উদ্বেগ

ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হলেও দেশটির কাছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আরইউএসআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল বলেন, ইরানের লক্ষ্য নির্ধারণ ও হামলা পরিচালনার কিছু ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলেও দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এখনো উল্লেখযোগ্য হতে পারে।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি ভূখণ্ডও কিছু সামরিক সরঞ্জামকে বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বজায় রাখা ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। তুলনামূলক সস্তা ড্রোন প্রতিহত করতে অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা অস্ত্র ব্যবহার করতে হলে ইসরায়েলের প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে।

ইরান সরাসরি ইসরায়েল ছাড়াও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনার বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে। ওই অঞ্চলের দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি থাকায় নতুন সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 ট্রাম্প কি আবার ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াবেন?

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া পেন্টাগনপ্রধান পিট হেগসেথের ইসরায়েল সফরও হয়েছে। তবে এসব যোগাযোগের অর্থ এই নয় যে, ওয়াশিংটন ইরানের সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে নতুন অভিযানে অংশ নিতে সম্মত হয়েছে।

আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযানে জড়াতে কতটা আগ্রহী, তা অনিশ্চিত।

যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ছাড়া ইরানের গভীরে অবস্থিত সুরক্ষিত স্থাপনায় হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েল কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বিশেষ করে, গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাংকার-বিধ্বংসী বোমা ও সেগুলো বহনকারী বি-২ বোমারু বিমানের সক্ষমতা ইসরায়েলের নিজস্ব সামরিক শক্তির সমতুল্য নয়।

 বিশ্লেষণ: সামরিক বিজয়ই কি রাজনৈতিক পরিবর্তন আনবে?

নেতানিয়াহুর ঘোষিত লক্ষ্য এবং বাস্তব সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। ইসরায়েল ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও অস্ত্রব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষতি করতে পারলেও সেখান থেকে সরাসরি সরকার পরিবর্তনের ফল পাওয়া নিশ্চিত নয়।

একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে শুধু সামরিক শক্তি নয়, দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, জনসমর্থন এবং বিকল্প নেতৃত্বের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। বহিরাগত হামলার মুখে কোনো দেশের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে নিজেদের সমর্থনও জোরদার করতে পারে।

ইসরায়েলের সামনে তাই দুটি আলাদা প্রশ্ন রয়েছে: তারা কতটা সামরিক ক্ষতি করতে পারবে এবং সেই ক্ষতিকে কীভাবে স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপান্তর করবে। প্রথমটির ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সক্ষমতা থাকলেও দ্বিতীয়টির জন্য এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য কৌশল দেখা যাচ্ছে না বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

উপসংহার: ইরানের সরকার উৎখাতের ঘোষণা দিয়ে নেতানিয়াহু সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছেন। কিন্তু স্থল অভিযান, দীর্ঘমেয়াদি দখল বা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি, ইরানের পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত সমর্থন—সব মিলিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত কঠিন। সামরিক হামলায় সাফল্য পেলেই তেহরানের ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।