আন্তর্জাতিক ডেস্ক, অধিকারপত্র ডটকম
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আবারও সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে বেসামরিক নাগরিকদের সংগঠিত করা, অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিরাপত্তা কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগ জোরদার করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ‘জানফাদা’ (Janfada) বা ‘আত্মত্যাগে প্রস্তুত’ নামে পরিচিত এই কর্মসূচি এখন ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে বিস্তৃত হচ্ছে। এতে নারী-পুরুষ উভয়কেই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) প্রকাশিত আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাসিজ বাহিনী কর্মসূচিটির আওতায় স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ ও সংগঠিত করার কাজ করছে। অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা এবং সরকারের ঘোষিত বিপ্লবী মূল্যবোধ রক্ষার বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
৩১ প্রদেশে প্রশিক্ষণকেন্দ্র সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, তেহরান, ইসফাহান, জাঞ্জান, শিরাজ, কেরমান, মাশহাদ, বোজনুর্দ ও আহভাজসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে এ কর্মসূচির আওতায় সমাবেশ, সামরিক কায়দার মহড়া এবং প্রশিক্ষণসংক্রান্ত কার্যক্রম হয়েছে।
বাসিজের প্রশিক্ষণবিষয়ক উপপ্রধান আলী কাউসারি চলতি মাসে জানান, তেহরানের অন্তত ১৪টি প্রধান চত্বরে স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রতিটি প্রাদেশিক রাজধানীতে এক থেকে তিনটি প্রধান চত্বরকে এ কাজে ব্যবহারের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তবে বর্তমানে ঠিক কতটি শহরে এসব কেন্দ্র চালু রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি। ফলে দেশজুড়ে কর্মসূচিটির প্রকৃত বিস্তার কতটা, তা নির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না।
মার্চে শুরু, সেপ্টেম্বরে বড় সমাবেশ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে গত মার্চের শেষ দিকে জানফাদা কর্মসূচি চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য হিসেবে নাগরিকদের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করা এবং সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর তেহরানে কর্মসূচির আওতায় বড় একটি সরকার-আয়োজিত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নারী, পুরুষ ও তরুণদের অংশ নিতে দেখা যায়। অনেককে সামরিক পোশাকে এবং কারও হাতে অস্ত্র নিয়ে মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায়। সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে।
তবে ওই সমাবেশে কতজন অংশ নিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব প্রকাশিত হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষের দেওয়া অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
৩ কোটি ৩০ লাখ নিবন্ধনের দাবি নিয়ে প্রশ্ন
ইরান সরকার দাবি করেছে, জানফাদা কর্মসূচিতে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে কর্তৃপক্ষ এমন কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করেনি, যা দিয়ে সংখ্যাটি নিশ্চিত করা যায়।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশভিত্তিক কিছু ইরানি কর্মী ও অনুসন্ধানকারীরা এর আগে কর্মসূচির ওয়েবসাইটের কারিগরি তথ্য পরীক্ষা করে নিবন্ধনের সংখ্যা সরকারি দাবির তুলনায় অনেক কম বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাদের বিশ্লেষণে চার লাখ নয়, বরং ৪০ লাখেরও কম নিবন্ধনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়—তবে এই হিসাবও পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা দিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও এর আগে জানিয়েছে, ইরানের কয়েক কোটি মানুষের নিবন্ধনের দাবিটি তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ফলে ৩ কোটি ৩০ লাখ নিবন্ধনের সংখ্যাকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না
শুধু প্রশিক্ষণ নয়, অন্যান্য কাজেও যুক্ত করার কথা
কর্মসূচির আয়োজকেরা জানিয়েছেন, নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবীদের সবাইকে সরাসরি সামরিক কাজে নিয়োজিত করার কথা নয়। উদ্ধারকাজ, সামাজিক সেবা, গণমাধ্যম-সংক্রান্ত সহায়তা এবং আর্থিক সহায়তার মতো ক্ষেত্রেও তাদের যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে নাগরিকদের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার কমানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।
তবে কর্মসূচির আওতায় স্বেচ্ছাসেবীদের ভবিষ্যতে ঠিক কী দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং কতজনকে বাস্তবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ নিয়েও উদ্বেগ
কর্মসূচিতে তরুণদের অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইরানের শিক্ষামন্ত্রী আলিরেজা কাজেমির বক্তব্য উদ্ধৃত করে আলজাজিরা জানিয়েছে, বাসিজ বাহিনী শিক্ষার্থীদের ‘জানফাদা’ কর্মসূচিতে নিবন্ধনের কাজ করছে এবং শিশুদের নিয়ে আরও কার্যক্রম ও অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগের কারণ হয়েছে। তবে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে ঠিক কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, কারা অস্ত্র প্রশিক্ষণ পাচ্ছে এবং তাদের দায়িত্ব কী হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা যায়নি
কর্মসূচির রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় কাতার ক্যাম্পাসের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা আলজাজিরাকে বলেছেন, জানফাদা কর্মসূচি ইরানের নেতৃত্বের বিপ্লবপন্থী অংশের জন্য রাজনৈতিক ও আদর্শিক আনুগত্য প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি করছে। তাঁর বিশ্লেষণে, এই উদ্যোগ সরকারের বিদ্যমান সমর্থকদের মধ্যে আনুগত্য আরও দৃঢ় করতে পারে।
অন্যদিকে, কিছু ইরানি মানবাধিকার সংগঠন এ ধরনের সশস্ত্র জনসমাবেশ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠিত করার উদ্যোগকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। তাদের উদ্বেগের পেছনে রয়েছে জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণহানি ও গ্রেপ্তারের ঘটনা।
ইরানি কর্তৃপক্ষ ওই বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সমর্থিত অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে বিক্ষোভ দমন নিয়ে সরকারের বক্তব্য ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য রয়েছে।
নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি, নাকি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার?
জানফাদা কর্মসূচির বিস্তার এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত আবারও শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কর্তৃপক্ষ একে জাতীয় প্রতিরক্ষা, জনসম্পৃক্ততা ও স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণে, এ উদ্যোগের আরেকটি সম্ভাব্য দিক হলো দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং সরকারের সমর্থকদের সংগঠিত রাখা। কর্মসূচিটি ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ইরানের কর্তৃপক্ষ জানফাদা কর্মসূচি বিস্তৃত করছে এবং বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণের জন্য আরও কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু নিবন্ধনের সরকারি সংখ্যা, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা এবং তাদের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
সূত্র: আলজাজিরা,
