নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকারপত্র ডটকম
ইউক্রেনকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে ইউরোপকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাশিয়ার গণতন্ত্রপন্থী কর্মী ও সাবেক বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ। তাঁর মতে, ২০২৭ সালের মধ্যে ইউরোপ ইউক্রেনের পক্ষে শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে দেশটি রাশিয়ার কাছে পরাজিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এতে ইউরোপের নিরাপত্তা এবং বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম *দ্য টেলিগ্রাফে* প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে এসব কথা বলেন কাসপারভ। নিবন্ধে তিনি ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বেলজিয়ামে সংরক্ষিত রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ ব্যবহার করে কিয়েভকে সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
কাসপারভের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বছরে দেশটির সামনে কঠিন শীতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউরোপ থেকে পর্যাপ্ত অর্থ ও অস্ত্র না পেলে ইউক্রেনের পক্ষে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি।
ইউরোপের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন
ওয়ারশ সিকিউরিটি ফোরামে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কাসপারভ বলেন, ইউরোপের সামরিক নেতৃত্বের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতিকদের পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবধান রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ইউরোপের অনেক নেতা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করলেও বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির জরুরি চাহিদা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
তিনি মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধকে শুধু দুই দেশের সংঘাত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর বিশ্লেষণে, রাশিয়ার সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি সাইবার হামলা, বিভিন্ন দেশে উগ্রপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে অর্থায়ন এবং অন্যান্য পরোক্ষ তৎপরতাও ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
নিবন্ধে কাসপারভ দাবি করেন, ইউক্রেনের বিদ্যুৎব্যবস্থা, হাসপাতাল ও কৃষি অবকাঠামোতে হামলার মাধ্যমে রাশিয়া দেশটির বেসামরিক মানুষের জীবনযাপনকে দুর্বিষহ করে তোলার কৌশল নিয়েছে। তবে এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নিবন্ধের লেখকের বিশ্লেষণ হিসেবে বিবেচ্য।
আলোচনার মাধ্যমে সমাধান নিয়ে সংশয়
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন কাসপারভ। তাঁর মতে, মস্কোর সঙ্গে আলোচনার ওপর নির্ভর করে ইউক্রেন যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
সম্প্রতি ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব ও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরের সঙ্গে পুতিনের সরাসরি ফোনালাপের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। কাসপারভের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগের পাশাপাশি ইউরোপকে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আরও দৃঢ় হতে হবে।
অন্যদিকে, ২২ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য আলোচনায় রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং বৃহত্তর ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। ফলে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও সামরিক সহায়তার ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
রুশ সম্পদ ব্যবহারের প্রস্তাব
কাসপারভের নিবন্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, বেলজিয়ামে সংরক্ষিত রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ ইউক্রেনকে অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা দিতে কাজে লাগানো। তাঁর মতে, ইউক্রেনকে পরাজয় এড়ানোর সুযোগ দিতে ইউরোপের সামনে এটিই এখন সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি।
তবে রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ ব্যবহার করার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আইনি, আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সিদ্ধান্ত ও বাস্তব পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে প্রস্তাবটি কতটা কার্যকর হতে পারে।
কাসপারভ সতর্ক করে বলেন, ইউরোপ যদি এখনো দ্বিধা ও বিলম্বের নীতি অনুসরণ করে, তাহলে যুদ্ধের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাঁর আশঙ্কা, ইউক্রেন পরাজিত হলে ইউরোপের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।
দ্য টেলিগ্রাফ, ২৭ অক্টোবর ২০২৬; রয়টার্স, ২২ অক্টোবর ২০২৬।
