—বিশেষ নির্বাচনী বিশ্লেষণ
বিগত নির্বাচনগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রথম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই ফিচার প্রতিবেদনে। এতে ভোটের পরিসংখ্যান, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ভোটারদের আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে পাঠকরা সহজেই দেশের নির্বাচনী প্রবণতা ও ট্রেন্ড বুঝতে পারেন।
১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। স্বাধীন বাংলাদেশের সদ্য রচিত সংবিধানের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটার ছিল সাড়ে ৩ কোটির কিছু বেশি। আর ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি। মাঝখানের এই ৫৩ বছরে যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। কখনো ব্যালট বিপ্লবে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, আবার কখনো ভোট বর্জন আর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সংস্কৃতি দেখেছে জাতি।
স্বাধীনতার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় তিনটি স্পষ্ট ধারার বা 'ট্রেন্ড'-এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়: একদলীয় বা আধিপত্যবাদী শাসন আমল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এবং সাম্প্রতিককালের একতরফা বা কৌশলগত নির্বাচন।
প্রথম পর্ব: স্বাধীনতা পরবর্তী ও সামরিক শাসনের ছায়া (১৯৭৩-১৯৯০)
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের প্রথম চারটি নির্বাচন (১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮) ছিল মূলত ক্ষমতাসীনদের শক্তি প্রদর্শনের মহড়া।
- একক আধিপত্য: ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের একচেটিয়া জনপ্রিয়তা ছিল। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয়ী হয় দলটি। তখন ভোটের হার ছিল প্রায় ৫৫%।
- সামরিক আমল ও নতুন দলের উত্থান: ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় নির্বাচনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসে। এরপর ১৯৮৬ (তৃতীয়) ও ১৯৮৮ (চতুর্থ) সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি যথাক্রমে ১৫৩ ও ২৫১টি আসন পায়।
- বর্জনের সংস্কৃতির শুরু: ১৯৮৬ সালে বিএনপি এবং ১৯৮৮ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই নির্বাচন বর্জন করে। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ছিল।
দ্বিতীয় পর্ব: গণতন্ত্রের নবযাত্রা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার (১৯৯১-২০০৮)
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নির্বাচনী ব্যবস্থায় এক নতুন ধারায় প্রবেশ করে। এই সময়কালটিকে (১৯৯১ থেকে ২০০৮) বাংলাদেশের ভোটের ইতিহাসের 'স্বর্ণযুগ' বলা যেতে পারে ভোটার উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের দিক থেকে।
- ক্ষমতার পালাবদল: এই সময়ে চারটি (১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮) অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদল ঘটে।
- ভোটার উপস্থিতি: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে ভোটারদের আস্থা ছিল আকাশচুম্বী।
-
- ১৯৯৬ (সপ্তম): ৭৫%
- ২০০১ (অষ্টম): ৭৫.৫৯%
- ২০০৮ (নবম): ৮৭.১৩% (সর্বোচ্চ রেকর্ড)
- ১৫ ফেব্রুয়ারির কলঙ্ক: এর মাঝেই ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি (ষষ্ঠ) বিএনপি একতরফা নির্বাচন করে, যেখানে ভোট পড়েছিল মাত্র ২১%। তবে সেই সংসদেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস হয় এবং মাত্র ১২ দিন স্থায়ী হয়।
তৃতীয় পর্ব: দলীয় সরকার ও আস্থার সংকট (২০১৪-২০২৪)
২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচনী রাজনীতি ফের সংঘাতময় হয়ে ওঠে। দশম (২০১৪), একাদশ (২০১৮) এবং দ্বাদশ (২০২৪) নির্বাচন—এই তিনটি নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ টানা জয়লাভ করে, তবে নির্বাচনের ধরণ ছিল ভিন্ন।
- বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেকর্ড (২০১৪): বিএনপি ও সমমনাদের বর্জনের মুখে ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন। ভোট হয় মাত্র ১৪৭ আসনে। ভোটের হার ছিল ৪০%।
- নিশিভোটের অভিযোগ (২০১৮): একাদশ নির্বাচনে সব দল অংশ নিলেও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে টিআইবিসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রশ্ন ছিল। সরকারি হিসেবে ৮০% ভোট পড়লেও 'রাতের ভোট' বা অনিয়মের অভিযোগ ছিল প্রবল।
- ডামি প্রার্থীর কৌশল (২০২৪): বিএনপিসহ ১৫টি দল বর্জন করায় নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখাতে আওয়ামী লীগ 'স্বতন্ত্র' বা 'ডামি' প্রার্থী দাঁড় করায়। এতে আওয়ামী লীগ ২২২টি এবং তাদেরই বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্ররা ৬২টি আসন পায়। ভোটের হার ছিল ৪১.৮% (ইসিতে প্রথমে ২৭% ঘোষণা ও পরে সংশোধন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়)।
পরিসংখ্যানের আয়নায় ভোটের হার ও রাজনৈতিক দল
নির্বাচনী ফলাফলের গ্রাফ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যখনই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে, তখনই ভোটের হার ৬০-৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। আর বর্জনের নির্বাচনে তা কমেছে বা কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছে। সবগুলো নির্বাচনের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে আসন বণ্টনের মাধ্যমে দলীয় আধিপত্যের একটি স্পষ্ট বিবর্তনধারা চোখে পড়ে। স্বাধীনতার পর থেকে নির্বাচনগুলো কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের দলিল নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো, বিরোধী শক্তির সক্ষমতা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলন হিসেবেও কাজ করেছে।
- ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল কার্যত একচেটিয়া। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়ে প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে বিরোধী শক্তি ছিল প্রান্তিক। এটি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী আবেগ, সাংগঠনিক শক্তি এবং রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের একটি স্পষ্ট নিদর্শন। গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার চেয়ে ঐকমত্যনির্ভর রাজনীতিই তখন প্রধান ছিল।
- ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। সামরিক শাসনের পটভূমিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০৭টি আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসে। এখানে নির্বাচন ছিল রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের একটি উপায়, যেখানে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে ছিল। এটি দলীয় রাজনীতিতে নতুন শক্তি সঞ্চালনের সূচনা করে।
- ১৯৯১ সালের পঞ্চম নির্বাচন বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ছিল একটি ঝুলন্ত সংসদ। বিএনপি ১৪০ আসন পেলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি উল্লেখযোগ্য আসন পায়, এবং সরকার গঠনে ছোট দলের সমর্থন নির্ণায়ক ভূমিকা রাখে। এটি বহুদলীয় প্রতিযোগিতার তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ পর্যায় নির্দেশ করে।
- ১৯৯৬ সালের সপ্তম নির্বাচন ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রতীক। আওয়ামী লীগ ১৪৬ এবং বিএনপি ১১৬ আসন পায়—যা দেখায় যে তখনো ভোটারদের মধ্যে দ্বিমুখী প্রতিযোগিতা কার্যকর ছিল। বিরোধী দল সংসদে শক্ত অবস্থান নিয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সক্ষমতা রাখত।
- ২০০১ সালের অষ্টম নির্বাচনে আবারও ভারসাম্য ভেঙে যায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ১৯৩ আসন পেয়ে বড় জয় লাভ করে, যেখানে আওয়ামী লীগ মাত্র ৬২ আসনে সীমাবদ্ধ থাকে। এটি জোট রাজনীতির শক্তি এবং নির্বাচনী মেরুকরণের চরম রূপ প্রকাশ করে।
- ২০০৮ সালের নবম নির্বাচন এই ধারাকে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬৩ আসন পেয়ে কার্যত ভূমিধস বিজয় অর্জন করে, আর বিএনপি জোট মাত্র ৩৩ আসনে নেমে আসে। শক্তিশালী সরকার বনাম দুর্বল বিরোধী—এই কাঠামো এখান থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে।
- ২০১৪ সালের দশম নির্বাচন ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বিচ্যুতি। ১৫৩টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় ভোটার অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আওয়ামী লীগ ২৩৪ আসন পায়, কিন্তু সংসদ কার্যত কার্যকর বিরোধী শক্তিহীন হয়ে পড়ে।
- ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচন একটি নতুন মডেলের ইঙ্গিত দেয়—“ডামি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী” কাঠামো। আওয়ামী লীগ আবারও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী সংসদে প্রবেশ করে। যদিও এটি সংখ্যাগত বৈচিত্র্য তৈরি করেছে, তবে প্রকৃত বিরোধী রাজনীতির প্রশ্ন এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।
সার্বিকভাবে, টেবিলটি দেখায় যে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় কাঠামো থেকে একদলীয় বা প্রাধান্যশীল দলব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়েছে। আসন বণ্টনের এই প্রবণতা কেবল নির্বাচন নয়, বরং গণতন্ত্রের গভীরতা, বিরোধী দলের ভূমিকা এবং সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তোলে।
আসন বন্টনে দলীয় আধিপত্যের চিত্র
নিচের সারণীটি লক্ষ্য করুন। এতে একটি প্রবণতা ষ্পষ্ট যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শুরুতে একদলীয় প্রাধান্য ছিল; এরপরে দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। সময়ের সঙ্গে জোট রাজনীতির বিস্তার ঘটে। এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে বিতর্ক দেখা যাযয়। এই ধারাবাহিক পরিবর্তনগুলো বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির গতিপথ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ বুঝতে সহায়ক।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে রাজনীতির ধারা
উপরের টেবিলের উপাত্ত ষ্পষ্টতই তুলে ধরে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস। আর এই ইতহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোটের ধরণ, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
- ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একচেটিয়া বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। এরপর ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে সামরিক শাসনের পটভূমিতে বিএনপির উত্থান ঘটে, যা দেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তির আবির্ভাব নির্দেশ করে।
- ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ঝুলন্ত সংসদ গঠিত হয় এবং জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে। এর মধ্য দিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে জোট ও সমঝোতার রাজনীতি গুরুত্ব পায়।
- ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচন ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেশের দ্বিদলীয় রাজনীতিকে আরও দৃঢ় করে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় ধরনের জয় পায়, যা তখনকার রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত দেয়।
- ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। বিপরীতে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ সংকট প্রকট হয়, যেখানে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন—যা নির্বাচনী ইতিহাসে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
- সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী সংসদে আসেন। ‘ডামি’ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মডেল এই নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
ভোটার আচরণের পরিবর্তন ও বিশ্লেষণ
- তরুণ ভোটার ও নারী ভোটার: ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নারী ভোটাররা পুরুষদের চেয়ে বেশি ছিল। ২০২৪ সালে নারী প্রার্থীর সংখ্যা রেকর্ড ৯৭ জনে পৌঁছায়। তবে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনাগ্রহ সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে (বিশেষ করে ২০২৪) স্পষ্ট হয়েছে।
- 'উইনার টেকস অল' মানসিকতা: ২০০১ সালের পর থেকে দেখা যাচ্ছে, যে জোট জিতছে তারা বিশাল ব্যবধানে জিতছে। বিরোধী দলের অস্তিত্ব সংসদে নগণ্য হয়ে পড়ছে। ৯ম সংসদে বিএনপি মাত্র ৩০টি এবং ১০ম, ১১তম ও ১২তম সংসদে প্রকৃত বিরোধী দলের অনুপস্থিতি সংসদীয় গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে।
- বর্জনের সাইকেল: ১৯৮৬ সালে বিএনপি বর্জন করেছিল, ১৯৮৮-তে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই। ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি) তে আওয়ামী লীগ বর্জন করে, আর ২০১৪ ও ২০২৪-এ বিএনপি। অর্থাৎ, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে আস্থার সংকট একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক রোগ।
পরিশেষ
১৯৭৩ থেকে ২০২৪—এই দীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা বারবার হোঁচট খেয়েছে। ৫ম থেকে ৯ম সংসদ পর্যন্ত (মাঝখানের ৬ষ্ঠ বাদে) যে নির্বাচনী সংস্কৃতির উন্নতি ঘটেছিল, তা গত তিনটি নির্বাচনে ম্লান হয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের নির্বাচনে 'কিংস পার্টি' বা 'ডামি প্রার্থী'র মতো নতুন পরিভাষা যুক্ত হয়েছে। ভোটের হার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তথ্যের অসামঞ্জস্যতা (২৭% থেকে ১ ঘণ্টায় ৪১%) আস্থার সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। আগামী দিনে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
— অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#বাংলাদেশ #রাজনীতি #জাতীয়নির্বাচন২০২৬

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: