—সম্পাদকীয়
ঢাবির সরস্বতী পূজার ঐতিহ্য, জগন্নাথ হলের প্রায় ৭৫টি মণ্ডপ, শিল্পের মহোৎসব ও ক্যাম্পাস-সম্প্রীতির প্রত্যাশা—বিদ্যার আলোয় কাটুক অমানিশা।
জ্ঞানের আরাধনা ও তারুণ্যের উৎসব
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে সরস্বতী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির এক মিলনমেলা। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে এই উৎসব এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। সরস্বতীর আগমনে বাসন্তী রঙে সেজে ওঠা তরুণ প্রজন্মের এই আয়োজন মূলত জ্ঞানের অন্বেষণ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনারই এক বহিঃপ্রকাশ।
বিদ্যাবতী সরস্বতী জ্ঞানের দেবী। শিক্ষার্থীরা তাঁর চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে এই কামনায়—যেন অন্ধকার দূর হয়ে জ্ঞানের আলোয় জীবন উদ্ভাসিত হয়। ক্যাম্পাসের প্রতিটি বিভাগ, হল এবং প্রাঙ্গণে যখন প্রতিমা স্থাপন করা হয়, তখন সেখানে কেবল নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের মানুষ নয়, বরং দল-মত নির্বিশেষে সব ধর্মের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণা দেখা যায়। এটিই আমাদের কৃষ্টির সৌন্দর্য। ক্যাম্পাসের এই আয়োজন প্রমাণ করে যে, বিদ্যা ও সংস্কৃতির কোনো সীমানা নেই।
ক্যাম্পাসে সরস্বতী পূজা ও সম্প্রীতির প্রত্যাশা
শীতের একেকটা সকাল আসলে ঢাকাকে নতুন করে লিখে দেয়। এই ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ ভাগে শহরের বাতাসে যে হালকা শীত থাকে, তার সঙ্গে মিশে থাকে অদ্ভুত এক গন্ধ—ক্যাম্পাসের শিরীষপাতা, পলাশের কুঁড়ি, আর লাইব্রেরির পুরনো বইয়ের পাতার ঘ্রাণ। ঠিক সেই সকালে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পেরোতেই মনে হয়—আজকের দিনটা অন্য রকম। যেন হাঁটতে হাঁটতে একখণ্ড আলোয় ঢুকে পড়েছি; আলোটা শুধু সূর্যের নয়, বিদ্যারও।
ক্যাম্পাসে সরস্বতী পূজা মানে কেবল প্রতিমা, ধূপ, আর পুষ্পাঞ্জলি নয়। এটা একটা ভাষা—যেখানে প্রার্থনা উচ্চারিত হয় কেবল মন্ত্রে নয়, মানুষের মুখে মুখে, হাসিতে, বইয়ের ভাঁজে, আর সেই তাড়াহুড়োয়—যে তাড়াহুড়োটা একদিনের উৎসবকে ঘিরে হয়, কিন্তু যার ভিতর জমে থাকে বছরের পর বছর ধরে লালিত হওয়া এক সংস্কৃতির অভ্যাস। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ—এই কথাটা আমরা হেসে বলি, কিন্তু কখনও কখনও উৎসবগুলো আমাদেরকে সত্যিই বাঁচিয়ে রাখে। ক্লাসের চাপ, পরীক্ষা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, চাকরির দৌড়, নীরব হতাশা—এসবের মাঝখানে সরস্বতী পূজা যেন বলে, “থেমো না, আলো আছে।”
একটা দৃশ্য মনে করুন—ভোর থেকে ক্যাম্পাসে লোকজনের আসা-যাওয়া শুরু। কেউ রঙিন কাপড় হাতে, কেউ ফুলের ঝুড়ি, কেউ ঢাক-করতাল নয়—হাতে ক্যামেরা, মোবাইল, ট্রাইপড। একদিকে মণ্ডপের বাঁশ বাঁধা হচ্ছে, অন্যদিকে ফুল সাজানো। ছাত্রছাত্রীরা কেউ ‘প্রসাদ’ ভাগ করার কথা ভাবছে, কেউ মণ্ডপের পাশের আলপনায় শেষ টান দিচ্ছে। আবার কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে—হয়তো ভেতরে ভেতরে বলছে, “এই বছরটা যেন ভালো যায়।”
পূজার মণ্ডপগুলো ক্যাম্পাসে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন প্রতিটা বিভাগ, প্রতিটা করিডোর, প্রতিটা মাঠ—সবাই আলাদা আলাদা করে বিদ্যার কাছে সাক্ষ্য দিচ্ছে। এই সাক্ষ্য দেওয়ার মধ্যে একটা সমষ্টিগত সৌন্দর্য আছে। কারণ সরস্বতী তো শুধু এক ধর্মের নয়—তিনি আমাদের ভাষা, গান, সাহিত্য, গণিত, বিজ্ঞান, গবেষণা—সব কিছুর প্রতীক। তাই ক্যাম্পাসে সরস্বতী পূজা যতটা ধর্মীয়, ততটাই সাংস্কৃতিক, ততটাই শিক্ষার উৎসব।
আর সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপারটা হলো—এখানে মানুষ আসে দল-মত নির্বিশেষে। কেউ আসে কৌতূহল নিয়ে, কেউ আসে শ্রদ্ধা নিয়ে, কেউ আসে শুধুই বন্ধুদের সঙ্গে একটা দিন কাটানোর জন্য। তবু সবাই এসে দাঁড়ায় একই জায়গায়—জ্ঞান ও সৌন্দর্যের কাছে। এই দাঁড়ানোটা আমাদের সমাজের জন্য খুব বড় বার্তা। কারণ যে দেশে পরিচয়ের দেয়াল দ্রুত উঁচু হয়, সেখানে উৎসবের মাঠে মানুষ যদি একটু কাছাকাছি আসে, সেটাও কম নয়।
সরস্বতী বিদ্যার দেবী—এই কথাটা আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে বড় হয়েছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে এই কথার মানে যেন বদলে যায়। এখানে “বিদ্যা” আর শুধু পাঠ্যবই নয়; বিদ্যা মানে প্রশ্ন করা, সন্দেহ করা, অনুসন্ধান করা, যুক্তি খোঁজা, আর মানুষকে বোঝা। বিদ্যা মানে অন্যের কথা শুনতে শেখা, নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখা।
ক্যাম্পাসে পুষ্পাঞ্জলির সময় যখন শঙ্খধ্বনি ওঠে, তখন অনেকের চোখে এক ধরনের স্থিরতা দেখা যায়। কিছুক্ষণ আগেও যে কেউ হাসছিল, গল্প করছিল—হঠাৎই তার মুখটা গম্ভীর। যেন সে নিজের ভেতরকার অন্ধকারগুলোকে একটু থামিয়ে দিচ্ছে। অন্ধকারগুলো কী? পরীক্ষার ভয়, পরিবারে টানাপড়েন, সম্পর্কের ভাঙন, জীবনের লক্ষ্য হারিয়ে ফেলা, সমাজের অস্থিরতা। এই অন্ধকারের তালিকা ব্যক্তিভেদে বদলায়, কিন্তু অন্ধকার থাকে। আর পুষ্পাঞ্জলি হয়তো সেই মুহূর্ত, যখন মানুষ মনে মনে বলে, “আমাকে শক্তি দাও—আমি যাতে ঠিক থাকতে পারি।”
এই জায়গায় সরস্বতী পূজার সবচেয়ে বড় প্রতীকী অর্থটা আসে: “বিদ্যার আলোয় কাটুক অমানিশা।” অমানিশা মানে শুধু রাত নয়; অমানিশা মানে মূল্যবোধের অন্ধকার, অসহিষ্ণুতার অন্ধকার, বিভেদের অন্ধকার। বিদ্যার আলো মানে সেই আলো, যা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়। যে আলো বলে—কারও বিশ্বাস আলাদা হলেও তার মর্যাদা একই। যে আলো বলে—বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু অপমান নয়; ভিন্নতা হতে পারে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়।
তবু আমরা জানি, বাস্তবতা সবসময় এই আলোকে সহজে জ্বালতে দেয় না। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা মুক্তচিন্তা ও সহনশীলতার চারণভূমি—কিন্তু কখনও কখনও ক্যাম্পাসের আনন্দঘন পরিবেশে সংকীর্ণতা বা অসহিষ্ণুতার কালো মেঘ উঁকি দেয়। কেমন মেঘ? কারও উৎসবকে নিয়ে কটূক্তি, কারও পোশাক নিয়ে বিদ্রূপ, কারও বিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ, কিংবা উৎসবকে কেন্দ্র করে অযথা উত্তেজনা।
এই জায়গায় সম্পাদকীয় হিসেবে আমাদের সবচেয়ে জরুরি কথা একটাই: ক্যাম্পাস মানে মিলনের জায়গা। এখানে উৎসবের অর্থ হবে সেতুবন্ধন, দেয়াল নয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি দেয় না; বিশ্ববিদ্যালয় একটি সমাজ গড়ে তোলে। সেই সমাজ যদি সহনশীলতা শেখাতে না পারে, তাহলে শিক্ষার অর্জন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
সরস্বতী পূজা ক্যাম্পাসে তাই এক ধরনের পরীক্ষা। কীসের পরীক্ষা? আমাদের পরিণতিবোধের। আমরা কতটা সুন্দরভাবে অন্যের উৎসবকে সম্মান করতে পারি, কতটা শান্তভাবে আনন্দ করতে পারি, কতটা দায়িত্ব নিয়ে আয়োজন করতে পারি। এই পরীক্ষায় পাশ করার মানে কেবল পূজা নির্বিঘ্নে হওয়া নয়; পাশ করার মানে—একটা ক্যাম্পাস সংস্কৃতি তৈরি হওয়া, যেখানে “ভিন্ন” শব্দটা ভয় নয়, স্বাভাবিকতা।
ঢাবিতে বিশ্বের বৃহত্তম সরস্বতী পূজা: ইতিহাসের আঙিনায় শিল্পের মহোৎসব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জগন্নাথ হলে সরস্বতী পূজা উদযাপন হয়ে আসছে। শুরুতে শুধু ওই হলের শিক্ষার্থীরাই এই পূজা করতেন। সময়ের সঙ্গে সেই ছোট্ট আয়োজন বড় হতে থাকে—বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগ, হল, এমনকি নানা সংগঠনও ধীরে ধীরে অংশ নিতে থাকে। এই অংশগ্রহণ কেবল জনসংখ্যা বাড়ার গল্প নয়; এটা এক ধরনের সাংস্কৃতিক সম্প্রসারণ—যেখানে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিচয়ের সঙ্গে সরস্বতী পূজার ঐতিহ্য মিশে যায়।
আরো পড়ুন: বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিরতায় শ্রীকৃষ্ণ ও তার শিক্ষা: অন্যায়ের অন্ধকারে ন্যায়ের বাঁশি
আজ জগন্নাথ হলকে ঘিরে যে বিপুল মণ্ডপ, আলপনা, প্রদীপের সারি, আর শৈল্পিক আয়োজন দেখা যায়—তা যেন ইতিহাসের উঠোনে দাঁড়িয়ে এক বিশাল শিল্পমঞ্চ। এখানে দেবীর প্রতিমা শুধু পূজার বস্তু নয়; প্রতিটি প্রতিমা, প্রতিটি মণ্ডপ, প্রতিটি আলপনার নকশা হয়ে ওঠে তরুণ প্রজন্মের নান্দনিক সাধনা। ক্যাম্পাসের মানুষ তখন কেবল পূজা দেখে না—তারা দেখে সৃজনশীলতার প্রদর্শনী।
এই কারণেই ঢাবির সরস্বতী পূজাকে অনেকে “বিশ্বের বৃহত্তম সরস্বতী পূজা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়—কারণ এখানে পরিমাণের পাশাপাশি আছে ঐতিহ্য, আছে শিল্প, আছে অংশগ্রহণের বিস্তার। আর এই বিস্তার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উৎসব যত বড় হয়, দায়িত্বও তত বড় হয়। বড় আয়োজন মানে বড় সহনশীলতা, বড় শৃঙ্খলা, বড় মানবিকতা।
এই ঐতিহ্যের আরেকটা মূল্যবান দিক হলো—ঢাবির সরস্বতী পূজা ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসের সমষ্টিগত উৎসবে পরিণত হয়েছে। ফলে এটি কেবল একটি হলের অনুষ্ঠান নয়; এটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। এখানেই এই উৎসবের গভীর শিক্ষা—সংস্কৃতি যখন ভাগাভাগি হয়, তখনই তা সম্প্রীতির শক্তি হয়ে ওঠে।
উৎসবের দিনগুলোতে ক্যাম্পাস যেন অন্য রকম হয়। ক্লাসরুমগুলো একটু ফাঁকা, কিন্তু করিডোরগুলো ভরে ওঠে। কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে—কেউ আবৃত্তি করছে, কেউ গান গাইছে, কেউ আলপনা আঁকছে। কোথাও ছোট্ট আলোচনা সভা—“সরস্বতী: বিদ্যা ও মানবতার প্রতীক” কিংবা “অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।”
এই সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো আসলে কেবল বিনোদন নয়; এগুলো স্মৃতি তৈরি করে। যে স্মৃতি ভবিষ্যতে মানুষকে মানবিক করে রাখে। আজ যে শিক্ষার্থী মণ্ডপ সাজাতে সাহায্য করছে, কাল সে কর্মজীবনে গিয়ে হয়তো অন্য সংস্কৃতির সহকর্মীর উৎসবে অংশ নেবে। আজ যে শিক্ষার্থী অন্য ধর্মের বন্ধুকে নিয়ে মণ্ডপে যাচ্ছে, কাল সে সমাজে বিভেদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস পাবে। এইভাবে একেকটা ছোট অংশগ্রহণ বড় মূল্যবোধে রূপ নেয়।
তাই “সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন” কথাটা খুব জরুরি। পূজাকে কেন্দ্র করে আয়োজনগুলো যেন বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের কথা বলে। শুধু গান-নাচ নয়—আলোচনায়, লেখায়, প্রদর্শনীতে যেন উঠে আসে আমাদের মিলিত ইতিহাস: ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্যের মানবতাবাদী ধারা, লোকসংস্কৃতির উদার চেতনা। কারণ সংস্কৃতি মানুষকে এক করে, আর একতা-ই অন্ধকার কাটানোর প্রথম শর্ত।
কিন্তু উৎসব মানেই যে উচ্ছৃঙ্খলতা হবে—এ ধারণা ভুল। উৎসব যদি অন্যের কষ্টের কারণ হয়, তবে সেটি উৎসবের চেতনার বিরোধী। ক্যাম্পাসে সরস্বতী পূজাকে ঘিরে উচ্চ শব্দদূষণ, রাতভর অযথা মাইকিং, পথ আটকে রাখা, কিংবা এমন আচরণ—যা সাধারণ শিক্ষার্থী বা আশেপাশের মানুষদের সমস্যার কারণ—এসব পরিহার করা জরুরি।
বিশেষ করে যেখানে নিকটস্থ মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতাল আছে, সেখানে শব্দদূষণ শুধু বিরক্তি নয়—মানবিকতার প্রশ্ন। বিদ্যার দেবীর পূজায় যদি কারও চিকিৎসা ব্যাহত হয়, তাহলে আমরা কাদের পূজা করছি? দেবী সরস্বতীর আরাধনা তো সংযমও শেখায়—মৃদুতা, শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য। উৎসবের সৌন্দর্য আসলে চিৎকারে নয়; সৌন্দর্য আসে পরিমিতিতে।
এই জায়গায় প্রশাসনের দায়িত্ব যেমন আছে, তেমনি শিক্ষার্থীদেরও আত্মনিয়ন্ত্রণ জরুরি। কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নিয়মের চেয়েও বড় হলো ছাত্রসমাজের নৈতিক চুক্তি—আমরা আনন্দ করব, কিন্তু কারও ক্ষতি করে নয়।
প্রকৃত তাৎপর্য
এখানে আরেকটা বড় প্রশ্ন আছে—পূজা কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে? নাকি আমরা সত্যিই জ্ঞানের দিকে এগোব? সরস্বতী পূজা যদি বছরের একদিন ফুল দেওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এই উৎসবের গভীর অর্থ অপূর্ণ থাকে। কারণ বিদ্যার দেবীর আরাধনার মূলমন্ত্র হলো—জ্ঞানের প্রসার।
এখানে “জ্ঞানের প্রসার” বলতে কেবল ভালো রেজাল্ট বোঝানো হচ্ছে না। বোঝানো হচ্ছে গবেষণামুখী মানসিকতা, প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তির চর্চা, মানবিক হওয়ার চেষ্টা। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করে, তখন তার প্রার্থনার ভেতর যেন থাকে সমাজের জন্য কিছু করার ইচ্ছা। পড়াশোনা যেন কেবল নিজের ক্যারিয়ার গড়ার রাস্তায় সীমাবদ্ধ না থাকে; পড়াশোনা যেন মানুষকে মানুষ করে, অন্যায়কে প্রশ্ন করতে শেখায়।
ক্যাম্পাসের সরস্বতী পূজা তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিদ্যা এক ধরনের দায়িত্ব। বিদ্যা মানে ক্ষমতা, আর ক্ষমতা মানে নৈতিকতা। যদি আমরা বিদ্যাকে কেবল প্রতিযোগিতার অস্ত্র বানাই, তাহলে বিদ্যার আলোও অন্ধকার তৈরি করতে পারে। কিন্তু যদি বিদ্যাকে মানবতার সঙ্গে যুক্ত করি, তাহলে সে আলো সত্যিই অমানিশা কাটাতে পারে।
এই প্রসঙ্গে দেবী সরস্বতীর হংসবাহনের প্রতীকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, হংস নাকি দুধ আর পানি আলাদা করতে পারে—অসারকে ত্যাগ করে সার গ্রহণ করতে পারে। এই প্রতীক আমাদের শেখায়—জীবনে সবকিছুই গ্রহণযোগ্য নয়; কিছু জিনিস বর্জন করতে হয়। কী বর্জন? কুসংস্কার, বিদ্বেষ, গুজব, সহিংসতা, অন্যকে হেয় করার অভ্যাস। আর কী গ্রহণ? সত্য, যুক্তি, সৌন্দর্য, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ।
ক্যাম্পাসে সরস্বতী পূজা যদি সত্যিই এই শিক্ষা দেয়—তাহলেই আমরা বলতে পারি, “বিদ্যার আলোয় কাটুক অমানিশা” শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব কর্মসূচি।
এবার বিশেষ সংযুক্তির কথাও ভুললে চলবে না। ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ হলে প্রায় ৭৫টি মণ্ডপে সরস্বতী পূজা—এই তথ্যটা শুধু সংখ্যার খবর নয়; এটা সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতারও ঘোষণা। এতগুলো মণ্ডপ মানে বহু মানুষের শ্রম, বহু দিনের প্রস্তুতি, আর একটি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যকে ক্যাম্পাসের প্রাঙ্গণে দৃশ্যমান করে তোলা।
জগন্নাথ হলের এই আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই ক্যাম্পাস বহু সংস্কৃতির সহাবস্থানের জায়গা। এখানে ইতিহাস আছে, স্মৃতি আছে, আনন্দ আছে, আর বেদনাও আছে। তাই এই আয়োজনের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, এবং সম্প্রীতির পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু একটি দিনের দায়িত্ব নয়—এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সংস্কৃতির প্রশ্ন।
যদি এই বড় আয়োজন নির্বিঘ্নে হয়, যদি সব ধর্মের শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়, যদি কোথাও অসহিষ্ণুতার ছায়া না পড়ে—তাহলে সেটি হবে আমাদের সময়ের জন্য এক শক্তিশালী বার্তা: আমরা এখনো একসঙ্গে থাকতে পারি। আমরা এখনো বিদ্যার আলোকে সম্মান করতে পারি।
শেষ পর্যন্ত কথা একটাই—ক্যাম্পাসে সরস্বতী পূজা হোক সেই উৎসব, যা আমাদের ভেতরের মানুষটাকে বড় করে। এই পূজা যেন আমাদের শেখায়, আনন্দ মানে কেবল হৈচৈ নয়; আনন্দ মানে একসঙ্গে থাকা, একে অন্যকে সম্মান করা, এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর পক্ষ নেওয়া।
আজকের দুনিয়ায় অন্ধকারের রূপ বদলেছে। একসময় অন্ধকার মানে অশিক্ষা ছিল; এখন অন্ধকার মানে ভুল তথ্য, ঘৃণা, দ্রুত রাগ, এবং ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা। এই অন্ধকার কাটাতে দরকার বিদ্যার আলো—যা যুক্তি শেখায়, সহনশীলতা শেখায়, আর মানবিকতা শেখায়।
- অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হোক—সব শিক্ষার্থী নির্বিঘ্নে আনন্দ করতে পারুক।
- সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন গড়ে উঠুক—আলোচনা, অনুষ্ঠান, প্রদর্শনীতে অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য ফুটে উঠুক।
- উচ্ছৃঙ্খলতা পরিহার করা হোক—উৎসব কারও কষ্টের কারণ না হয়।
- জ্ঞানের প্রসার ঘটুক—এই দিনটি যেন শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী ও মানবিক হতে অনুপ্রাণিত করে।
আর সবচেয়ে বড় কথা—এই পূজা যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা সবাই একই ক্যাম্পাসের মানুষ, একই শহরের মানুষ, একই দেশের মানুষ। আমাদের ভেতর মতভেদ থাকবে, বিশ্বাসের বৈচিত্র্য থাকবে—কিন্তু সেই বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা করতে পারাই হলো বিদ্যার সত্যিকারের পরিচয়। সরস্বতী পূজার দিনে তাই ক্যাম্পাসে যখন বাসন্তী রঙের ঢেউ ওঠে, যখন ফুলের গন্ধে বাতাস নরম হয়ে আসে, তখন আমরা চাই—বিদ্যার আলোয় ধুয়ে যাক সকল অন্ধকার। অমানিশা কেটে যাক। আর জ্ঞান, শিল্প, সংস্কৃতি, ও সম্প্রীতির এই মিলনমেলা হয়ে উঠুক আমাদের ভবিষ্যতের আশ্বাস।
পরিশেষে, ক্যাম্পাসের সরস্বতী পূজা হোক অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ বুদ্ধির উদয় ঘটানোর প্রেরণা। দেবী সরস্বতীর হংসবাহন যেমন অসারকে ত্যাগ করে সার গ্রহণ করার শিক্ষা দেয়, আমাদের শিক্ষার্থীরাও যেন সমাজ থেকে কুসংস্কার ও বিদ্বেষ ত্যাগ করে সত্য ও সুন্দরের পথে চলতে পারে। বিদ্যার আলোয় ধুয়ে যাক সকল অন্ধকার—এই আমাদের চিরন্তন প্রত্যাশা।
— অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#ঢাবি #সরস্বতীপূজা #জগন্নাথহল #ক্যাম্পাসসংস্কৃতি #বিদ্যারআলোয়কাটুকঅমানিশা #বসন্তউৎসব #সম্প্রীতি #অসাম্প্রদায়িকতা #বাংলাসংস্কৃতি #ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় #বাংলাদেশ #শিক্ষা #সংস্কৃতি #শিল্পেরমহোৎসব #বিশ্বেরবৃহত্তমসরস্বতীপূজা

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: