—শিক্ষা সংস্কার বিশেষ প্রতিবেদন
শিক্ষক যখন ছাত্রের ভয়ে কথা বলেন, তখন শিক্ষাব্যবস্থা কোথায় দাঁড়ায়? বেত নিষিদ্ধের যুগ, জিপিএ-৫ সংস্কৃতি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বাস্তবতা নিয়ে এক ব্যঙ্গাত্মক বিশ্লেষণ একটি প্রশ্ন করছে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই জ্ঞান তৈরির জায়গা, নাকি নম্বর উৎপাদনের কারখানা? বেত তুলে দেওয়া হয়েছে—ভালো কথা। কিন্তু তার বদলে কি আমরা শৃঙ্খলা, শ্রদ্ধা আর নৈতিকতার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেছি? আজকের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক অনেক সময় শিক্ষক নন, বরং এক প্রকার ‘বেতনভুক্ত বন্দী’। আর ছাত্র?—সে কখনো পরীক্ষার যন্ত্র, কখনো সোশ্যাল মিডিয়ার তারকা, আবার কখনো কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। এই রম্য অথচ তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—আমরা কি জিপিএ-৫ বানাচ্ছি, নাকি মানুষ তৈরি করছি?
সকালবেলা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজে চোখ বুলাতেই পিলে চমকে উঠল। শিরোনাম বলছে—‘২০২৪-পরবর্তী প্রজন্মের নৈতিকতার পারদ এখন হিমাঙ্কের নিচে’। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, একদল কিশোর পিঠে বিশালাকার এক একটা ব্যাগ (যেগুলো দেখলে মনে হয় হিমালয় জয়ের প্রস্তুতি চলছে) নিয়ে স্কুলের দিকে যাচ্ছে। তাদের হাঁটার ভঙ্গি আর চোখের চাউনিতে এমন এক ভাব, যেন তারা ক্লাসরুমে জ্ঞান আহরণ করতে নয়, বরং কোনো এক ‘কিশোর গ্যাং’-এর গোপন মিটিংয়ে যোগ দিতে যাচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম, আমরা আসলে কোন গোলকধাঁধায় আটকে আছি? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অসংগতি নিয়ে কথা বলতে গেলে রূপকথার সেই রাক্ষস-খোক্কসের গল্পের কথা মনে পড়ে। আমরা ডাল কাটতে গিয়ে গাছটাই উপড়ে ফেলেছি। আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগে, যখন আমরা বীরদর্পে ক্লাসরুম থেকে ‘বেত’ নামক সেই চিকন কঞ্চিটাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলাম, তখন ভেবেছিলাম আমরা বুঝি ফিনল্যান্ড বা নরওয়ে হয়ে গেছি। কিন্তু হায়! আমরা ভুলে গিয়েছিলাম, আমাদের দেশের মানুষের ডিএনএ-তে ‘শক্তের ভক্ত আর নরমের যম’ তত্ত্বটা কত গভীরভাবে গেঁথে আছে।
বেতের বিসর্জন ও বারো বছরের অভিশাপ
২০১১ সালে যখন মহামান্য হাইকোর্ট আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় মিলে ‘শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিতকরণ নীতিমালা’ জারি করল, তখন আমরা সবাই বুদ্ধিজীবীর মতো মাথা নেড়েছিলাম। ভাবখানা এমন—আহা, এবার আমাদের বাচ্চারা মন্টিসরি স্কুলের মতো হেসে-খেলে আইনস্টাইন হয়ে বের হবে। কিন্তু কৃষিবিজ্ঞানের একটা সাধারণ নিয়ম আছে—বিষ বপন করলে তার ফল পেতে সময় লাগে। শিক্ষা এমন এক মহীরুহ যার ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব বুঝতে কমপক্ষে ১২ বছর সময় লাগে।
ঠিক ১২ বছর পর ২০২৪-এ এসে আমরা সেই ‘বিষবৃক্ষ’-এর ফল আস্বাদন করছি। আজ যারা রাজপথে বড়দের সাথে অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলছে, শিক্ষকের কলার চেপে ধরছে, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় নোংরামির জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে—তারা তো সেই প্রজন্মের ফসল যারা গত এক যুগে কোনো শাসন দেখেনি। আমাদের নীতিনির্ধারকরা ভেবেছিলেন বেত তুলে নিলে ছাত্ররা ফেরেশতা হয়ে যাবে। কিন্তু তারা বিকল্প কোনো ‘নৈতিক শাসন’-এর ব্যবস্থা করেননি। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে; আমাদের জেনারেশন এখন ‘স্মার্ট’ হতে গিয়ে ‘বেয়াদব’ হওয়ার সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
নীতিনির্ধারকদের ‘হাঁক’ বনাম আমজনতার ‘হাহাকার’
এখানেই গল্পের সবচেয়ে বড় রম্যটা লুকিয়ে আছে। আমাদের দেশের যারা নীতি বানান, তাদের সন্তানরা কিন্তু এই ধূলিধূসরিত সাধারণ সরকারি বা মফস্বলের স্কুলে পড়ে না। তারা পড়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাল্টি-ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে, যেখানে ক্লাসে ছাত্র থাকে মাত্র ১০ জন। আর আমাদের সাধারণ স্কুলে এক ক্লাসে ১০০ জন ছাত্রের সাথে একজন অসহায় শিক্ষক লড়াই করেন।
নীতিনির্ধারকরা যখন ‘বেত নিষিদ্ধ’ করার হাঁক ছাড়লেন, তখন তারা আসলে শিক্ষকদের হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। আমি সম্প্রতি কয়েকজন পুরনো শিক্ষকের সাথে কথা বললাম। তাদের হাহাকার শুনে মনে হলো, তারা এখন ক্লাসরুমে শিক্ষক নন, বরং ‘বেতনভুক্ত বন্দী’। একজন শিক্ষক আক্ষেপ করে বললেন, "বাবা, আগে বেত হাতে নিলে ছাত্ররা অন্তত সোজা হয়ে বসত। এখন কিছু বললে তারা বলে—স্যার, সাবধানে কথা বইলেন, ভিডিও করে অনলাইনে ছেড়ে দেব কিন্তু!" শিক্ষক যখন ছাত্রের ভয়ে তটস্থ থাকে, তখন সেই শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে আপনি কি জিপিএ-৫ ছাড়া আর কিছু আশা করতে পারেন?
জিপিএ-৫ এর কারখানা ও কিশোর গ্যাংয়ের মহোৎসব
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি কালজয়ী অসংগতি হলো—আমরা মানুষ নয়, ‘পরীক্ষার্থী’ বানাতে ওস্তাদ। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চার ঘাড়ে ২০ কেজি ওজনের বই চাপিয়ে দিয়ে বলি, "বাবা, গোল্ডেন না পেলে তোমার জীবন কয়লা।" ফলে সেই বাচ্চা বইয়ের ভেতরের জ্ঞান নেওয়ার চেয়ে কীভাবে ‘শর্টকাট’ মেরে নম্বর পাওয়া যায়, সেই ফন্দি আঁটে।
আর এই চাপের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নেয় ‘কিশোর গ্যাং’। সারাদিন স্কুলে নীতিহীন পড়াশোনা আর কোচিংয়ের যাতালে পিষ্ট হয়ে ছাত্ররা যখন হাঁপিয়ে ওঠে, তখন তারা ‘ডন’ সাজার নেশায় পাড়ায় পাড়ায় গ্যাং বানায়। যে হাত দিয়ে তাদের বই ধরার কথা ছিল, সেই হাতে তারা দেশীয় অস্ত্র তুলে নেয়। অথচ আমরা বুক ফুলিয়ে বলি, আমাদের শিক্ষার হার ১০০ শতাংশ! এই হার দিয়ে আমরা কী করব যদি আমাদের ছাত্ররা বড়দের শ্রদ্ধা করতে না শেখে?
২০২৬-এর চশমায় ফেলে আসা দিনগুলো
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে যদি পেছনে ফিরে তাকাই, তবে দেখব আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় বন্দি ছিল। আমরা ডিজিটাল ল্যাব বানিয়েছি, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর কিনেছি, কিন্তু শিক্ষকের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভুলে গেছি। আমরা বেতের অপব্যবহার বন্ধ করতে গিয়ে পুরো ‘শাসন’ ব্যবস্থাটাকেই উপড়ে ফেলেছি।
পশ্চিমা বিশ্বের উদাহরণ দেওয়া ভালো, কিন্তু আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে তো অস্বীকার করা যায় না। যেখানে বাড়িতে বাবা-মা সময় দিতে পারেন না, সেখানে শিক্ষকই ছিলেন শেষ ভরসা। কিন্তু এখন শিক্ষক কেবল একজন সেবাদানকারী কর্মচারীতে পরিণত হয়েছেন।
উত্তরণের পথ: যেখানে আমরা ভুল করছি
শিক্ষা সংস্কার মানে কেবল সিলেবাস বদলানো নয়, শিক্ষা সংস্কার মানে আত্মার সংস্কার। আমাদের দরকার এমন এক ব্যবস্থা যেখানে:
- জিপিএ নয়, আদব-কায়দাই হবে মাপকাঠি: যে ছাত্র শিক্ষকের সম্মান করতে জানে না, তাকে গোল্ডেন ৫ দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
- শিক্ষকের ক্ষমতা ও মর্যাদা: শিক্ষককে কেবল ‘বেতনভুক্ত কর্মী’ হিসেবে নয়, বরং সমাজের আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শাসনের অধিকারটুকু (নির্যাতন নয়) তার হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে।
- নীতিনির্ধারকদের গ্রাউন্ড রিয়ালিটি: এসি রুমে বসে নীতিমালা না বানিয়ে, শিক্ষকদের সাথে বসে বাস্তব সমস্যাগুলো বুঝতে হবে।
শেষ কথা: একটি ‘আত্মকেন্দ্রিক হাইব্রিড’ প্রজন্ম নাকি সোনার মানুষ?
গল্পের শেষে এসে তিতকুটে এক সত্য হজম করতেই হবে। আমরা যদি এখনই শিক্ষাব্যবস্থার এই নৈতিক পচন না থামাই, তবে আগামী এক যুগে আমাদের দেশ পরিচালিত হবে এমন কিছু মানুষের দ্বারা, যাদের মস্তিষ্কে অনেক তথ্য আছে কিন্তু হৃদয়ে কোনো বোধ নেই।
বেত নেই—খুব ভালো কথা। কিন্তু তার বদলে কি আমরা ছাত্রদের বিবেক জাগ্রত করতে পেরেছি? উত্তরটা যদি ‘না’ হয়, তবে আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থা কেবল সুন্দর মোড়কে মোড়ানো এক পচা আপেল ছাড়া আর কিছুই নয়। আসুন, জিপিএ-৫ এর নেশা ছেড়ে একটু ‘মানুষ’ তৈরির নেশায় বুঁদ হই।
পরিশেষে, আমাদের বর্তমান সামাজিক ও শিক্ষাগত সংকটের এই গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি কালজয়ী উক্তি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হওয়া উচিত। তিনি বলেছিলেন, “সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ তৈরি করতে হবে।” আর এই 'সোনার মানুষ তৈরির সূতিকাগার হলো আমাদের বিদ্যালয়গুলো। কেবল জিপিএ-৫ আর প্রযুক্তির ঝনঝনানি দিয়ে সোনার মানুষ গড়া সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন নীতি, নৈতিকতা আর শৃঙ্খলার সুদৃঢ় ভিত্তি। আর এই ভিত্তি রচনার মূল কারিগর হলেন আমাদের শিক্ষকরা। তাই জাতিকে যদি দীর্ঘমেয়াদী অবক্ষয় ও 'গ্যাং কালচার'-এর মতো অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হয়, তবে পর্দার পেছনের এই কারিগরদের তথা শিক্ষকদের যথাযথ ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। শিক্ষক যদি শ্রেণীকক্ষে নির্ভয়ে এবং সসম্মানে তাঁর শাসন ও সোহাগের অধিকার প্রয়োগ করতে না পারেন, তবে 'সোনার বাংলা' গড়ার স্বপ্নটি কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।
বিশেষ ঘোষণা (আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি):
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা অনুধাবন করতে হলে এই প্রতিবেদনটি অবশ্যই পড়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আগামীকাল প্রকাশিত হতে যাচ্ছে ২০১১ সালে প্রণীত “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিতকরণ নীতিমালা”–এর ওপর একটি বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ। এতে নীতিমালাটির যৌক্তিক ও শিক্ষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, গবেষণালব্ধ ধারণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এর সামগ্রিক মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হবে।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_সংস্কার #বাংলাদেশের_শিক্ষা #জিপিএ৫_সংস্কৃতি #কিশোর_গ্যাং #শিক্ষকের_মর্যাদা #নৈতিকতা_সংকট #EducationCrisis #BangladeshEducation #TeacherRespect #EducationReform

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: