নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকার পত্র
সরকার মুখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বললেও তাদের কর্মকাণ্ডে ‘সবার পরে বাংলাদেশ’ নীতি দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার তৎপরতা দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় সক্ষমতার জন্য বড় ধরনের হুমকি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক আমার দেশ-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সোহাগ কুমার বিশ্বাস। সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক বাতেন বিপ্লবের সঞ্চালনায় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকারের কাছ থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কথাটি শোনা গেলেও বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১৯৯৭ সাল থেকেই চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। সে সময় ২০০ বছরের জন্য একটি মার্কিন কোম্পানির কাছে বন্দর দেওয়ার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
সরকারের সমালোচনা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বন্দর নিয়ে যেসব প্রশ্ন ও যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে, তার কোনো পাল্টা যুক্তিসংগত উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। তার অভিযোগ, সরকার যুক্তির পরিবর্তে জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
এনসিটির মাশুল বাড়ানো নিয়েও প্রশ্ন
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে মাশুল বাড়ানোর উদ্যোগের সমালোচনা করেন আনু মুহাম্মদ।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিদ্যমান মাশুলেই যেখানে লাভ হচ্ছে, সেখানে কী যুক্তিতে মাশুল বাড়ানো হবে? তার মতে, মাশুল বাড়লে আমদানি ও রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই খরচ বাড়বে। এতে দেশের উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
তার অভিযোগ, মাশুল বাড়ানোর উদ্যোগের মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের লাভ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট আমদানি-রপ্তানির বড় একটি অংশ এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে এনসিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের অর্থনীতির ‘হৃৎপিণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাধারণ কোনো বিষয়ের তুলনা করা যায় না।
বিদেশি অপারেটর নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেন, অতীতে অন্যান্য বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে যে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের মিল পাওয়া যায়নি।
নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হলে যে সক্ষমতা তৈরির কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পারবে—সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন বড় প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও সংকটের সময়ে সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিদেশি অপারেটরের হাতে বন্দর দেওয়ার আগে বন্দরকে কার্যকর ও সক্রিয় করার বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিকল্পনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফী রতন অভিযোগ করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই দেশের স্বার্থবিরোধী। তার দাবি, বর্তমান নির্বাচিত সরকারও একই পথে হাঁটছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়; এর সঙ্গে দেশের সার্বভৌম সক্ষমতা ও বিদেশি স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত।
মাওলানা ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, সরকারের ছয় মাস পার হলেও চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে যথাযথ আলোচনা হয়নি।
তিনি প্রশ্ন করেন, এত বছর বন্দরের জন্য বিদেশি পরিচালক প্রয়োজন না হলেও এখন কেন এমন প্রয়োজন তৈরি হলো। তার অভিযোগ, এর পেছনে বন্দর বিদেশিদের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের সাংগঠনিক সম্পাদক সাকিব আনোয়ার, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি দিলীপ রায় এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি ছায়েদুল হক নিশান।
আলোচনায় বক্তারা চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা, এনসিটি পরিচালনা, মাশুল বৃদ্ধি এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: