odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Friday, 2nd October 2026, ২nd October ২০২৬
কংগ্রেসের নির্বাচনে পরাজয় থেকে জর্জিয়ার প্রথম মুসলিম নারী স্টেট সিনেটর—বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের সন্তান নাবিলা আয়শা পার্কেসের রাজনৈতিক উত্থানের বিস্তারিত গল্প

নোয়াখালীর শেকড় থেকে জর্জিয়ার সিনেটে: নাবিলা আয়শা পার্কেসের সংগ্রাম ও ইতিহাস

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৩০ September ২০২৬ ১৯:০৭

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৩০ September ২০২৬ ১৯:০৭

 অধিকার পত্র ডটকমে

নোয়াখালীর এক অভিবাসী পরিবারের শেকড় থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের রাজনীতিতে ইতিহাস তৈরি করেছেন নাবিলা আয়শা পার্কেস (Nabilah Aishah Parkes)। একসময় কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। তার আগে রাজনৈতিক প্রচারণায় কাজ করেছেন, নিজস্ব পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কিন্তু একটি নির্বাচনী পরাজয় তাকে থামাতে পারেনি।

২০২২ সালে জর্জিয়া স্টেট সিনেটের ৭ নম্বর ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন জর্জিয়া স্টেট সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী। তবে বর্তমানে তিনি আর সিনেটর নন; ২০২৬ সালের ১৩ মার্চ সিনেট থেকে পদত্যাগ করেন।

তার গল্পের শুরু যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায়। জন্মনাম Nabilah Aishah Islam। ১৯৮৯ সালের ২৭ নভেম্বর আটলান্টায় জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক বাংলাদেশি বাবা-মায়ের সন্তান। তার মা নোয়াখালী থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারকে এগিয়ে নেন। বাবা কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের Internal Revenue Service—IRS-এ ফাইল ক্লার্ক হিসেবে।

নোয়াখালীর মায়ের মেয়ে

নাবিলার মা বাংলাদেশে নোয়াখালীর একটি গ্রামে বড় হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য তাকে বিভিন্ন কম বেতনের কাজ করতে হয়েছে। জীবনীমূলক তথ্য অনুযায়ী, তিনি একসময় Hardee's-এ রান্নার কাজ করেছেন এবং ওয়্যারহাউসেও কাজ করেছেন।

অভিবাসী পরিবারের এই বাস্তবতা নাবিলার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে।

তার মায়ের ওয়্যারহাউসে কাজ করার সময় হার্নিয়েটেড ডিস্কের সমস্যা দেখা দেয়। এরপর স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। পরিবারের এই অভিজ্ঞতা নাবিলাকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করতে এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণের পক্ষে সক্রিয় হতে অনুপ্রাণিত করে।

নিজের পরিবারে অভিবাসন, শ্রম, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার যে বাস্তবতা তিনি দেখেছেন, পরবর্তী সময়ে সেগুলোই তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

শিক্ষা ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি

নাবিলা জর্জিয়ার Central Gwinnett High School থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর Georgia State University-তে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে Business Administration-এ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শিক্ষাগত বিশেষায়ন ছিল মার্কেটিং।

রাজনীতিতে নির্বাচিত পদ পাওয়ার অনেক আগেই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়।

২০১৪ সালে তিনি জর্জিয়ার গভর্নর পদে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী Jason Carter-এর নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করেন। পরে ২০১৬ সালে Hillary for America প্রচারণায় Southern States-এর Deputy Finance Director হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। Vote Smart-এর জীবনী অনুযায়ী, তিনি Florida Democratic Party-তেও Finance Director হিসেবে কাজ করেছেন।

এরপর ২০২০ সালে তিনি NAI Consulting প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০২২ সাল পর্যন্ত এর Founder/President হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার পেশাগত জীবনের এই অভিজ্ঞতা তাকে নির্বাচনী প্রচারণা, রাজনৈতিক সংগঠন ও নীতিনির্ধারণের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ দেয়।

২০২০ সালে কংগ্রেসের প্রার্থী

রাজনীতিতে নিজের নাম প্রতিষ্ঠার বড় সুযোগ আসে ২০২০ সালে।

মাত্র ৩০ বছর বয়সে নাবিলা জর্জিয়ার ৭ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে প্রার্থী হন।

সেই নির্বাচন ছিল তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশি-আমেরিকান হিসেবে তার প্রার্থিতা তখন বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছিল।

কিন্তু তিনি মনোনয়ন জিততে পারেননি।

জর্জিয়া স্টেটের সরকারি নির্বাচনী ফল অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে Carolyn Bourdeaux ৫২.৭৮ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম হন। নাবিলা আয়শা ইসলাম পান ১০,৪৪৭ ভোট বা ১২.৩৩ শতাংশ। তিনি ছয় প্রার্থীর মধ্যে তৃতীয় হন।

অর্থাৎ কংগ্রেসে যাওয়ার প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু সেটিই তার রাজনৈতিক যাত্রার শেষ ছিল না।

পরাজয়ের পর নতুন লড়াই

২০২০ সালের কংগ্রেস প্রাইমারিতে পরাজয়ের পরও নাবিলা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান।

এরপর তিনি লক্ষ্য ঠিক করেন জর্জিয়া স্টেট সিনেটকে।

২০২২ সালের নির্বাচনে তিনি District 7 থেকে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হন। নির্বাচনী লড়াইয়ের পর তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীকে পরাজিত করে জর্জিয়া স্টেট সিনেটে জায়গা করে নেন।

এই জয় শুধু একটি আসনের জয় ছিল না।

এর মধ্য দিয়ে তিনি জর্জিয়া স্টেট সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী হয়ে ইতিহাস তৈরি করেন।

তার নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জর্জিয়ার আইনসভায় মুসলিম নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

জর্জিয়া স্টেট সিনেটে তিন বছরের অধ্যায়

নাবিলা আয়শা পার্কেস ২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে স্টেট সিনেটের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তিনি District 7-এর প্রতিনিধিত্ব করেন। তার দায়িত্বের সময়কাল ছিল ৯ জানুয়ারি ২০২৩ থেকে ১৩ মার্চ ২০২৬। জর্জিয়া সিনেটের সরকারি নথিতেও ১৩ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত তার কমিটি সদস্যপদের তথ্য রয়েছে।

সিনেটে তিনি Banking and Financial Institutions, Children and Families, Science and Technology এবং Veterans, Military and Homeland Security-সহ বিভিন্ন কমিটিতে কাজ করেন। Vote Smart-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি Government Oversight এবং State Institutions and Property কমিটির সঙ্গেও কাজ করেছেন।

নামের পরিবর্তন

তার জন্মনাম ছিল Nabilah Aishah Islam।

বিয়ের পর তার নামের সঙ্গে Parkes যুক্ত হয় এবং তিনি Nabilah Aishah Parkes নামে পরিচিত হন। বিভিন্ন রাজনৈতিক নথিতে মধ্যবর্তী সময়ে Nabilah Islam Parkes নামটিও ব্যবহৃত হয়েছে। তবে বর্তমান জীবনীতে পূর্ণ নাম হিসেবে Nabilah Aishah Parkes উল্লেখ করা হয়।

তাই বাংলায় তার নাম লেখার ক্ষেত্রে নাবিলা আয়শা পার্কেস ব্যবহার করাই সবচেয়ে সঙ্গত।

২০২৪ সালে আবারও নির্বাচিত

স্টেট সিনেটে প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ২০২৪ সালে তিনি আবারও District 7 থেকে নির্বাচনে অংশ নেন।

তিনি পুনর্নির্বাচিত হন এবং দ্বিতীয় মেয়াদে সিনেটে থাকার সুযোগ পান।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—৫৫ শতাংশ ভোটের তথ্যটি তার প্রথম সিনেট নির্বাচনের নয়; এটি ২০২৪ সালের পুনর্নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২০২৬ সালে সিনেট ছাড়লেন

নাবিলা পার্কেসের স্টেট সিনেটের অধ্যায় শেষ হয় ২০২৬ সালে।

১৩ মার্চ ২০২৬ তিনি District 7-এর সিনেটর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। জর্জিয়া সিনেটের সরকারি তথ্যেও তার মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ ১৩ মার্চ ২০২৬ দেখানো হয়েছে।

এরপর তিনি জর্জিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হওয়ার জন্য নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

২০২৬ সালের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারির সরকারি ফল অনুযায়ী, Josh McLaurin পান ৪১.৪০ শতাংশ ভোট এবং Nabilah Parkes পান ৩৯.৫১ শতাংশ ভোট। তৃতীয় প্রার্থী Richard N. Wright পান ১৯.০৮ শতাংশ। ফলে McLaurin ও Parkes রানঅফে যান।

 

নাবিলার ক্যারিয়ারের সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন

২৭ নভেম্বর ১৯৮৯ — আটলান্টা, জর্জিয়ায় জন্ম।

২০০৮ — Central Gwinnett High School থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা শেষ।

২০১২ — Georgia State University থেকে Business Administration/Marketing বিষয়ে BBA।

২০১৪ — Jason Carter for Georgia Governor প্রচারণায় কাজ।

২০১৬ — Hillary for America-তে Deputy Southern States Finance Director।

২০২০ — Georgia's 7th Congressional District-এর ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে প্রার্থী; ১২.৩৩ শতাংশ ভোট।

২০২০–২০২২ — NAI Consulting-এর Founder/President।

২০২২ — Georgia State Senate District 7 থেকে নির্বাচিত।

৯ জানুয়ারি ২০২৩ — স্টেট সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।

২০২৪ — District 7 থেকে পুনর্নির্বাচিত।

১৩ মার্চ ২০২৬ — Georgia State Senate থেকে পদত্যাগ।

২০২৬ — লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে অংশগ্রহণ।

মায়ের সংগ্রাম থেকে মেয়ের রাজনৈতিক ইতিহাস

নাবিলা আয়শা পার্কেসের গল্পে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অভিবাসী পরিবারের দীর্ঘ পথচলার প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।

একদিকে নোয়াখালীর গ্রাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তার মায়ের শ্রমজীবী জীবন; অন্যদিকে IRS-এ বাবার চাকরি। সেই পরিবারেই জন্ম নেওয়া নাবিলা পরবর্তীতে Georgia State University থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শেষ করেন, রাজনৈতিক প্রচারণায় কাজ করেন, কংগ্রেসের প্রার্থী হন এবং পরাজিত হন।

কিন্তু পরাজয়ের পর তিনি রাজনীতি ছাড়েননি।

দুই বছর পর রাজ্য সিনেটের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি জর্জিয়ার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম নারী স্টেট সিনেটর হন।

তার রাজনৈতিক পথচলার এই ধারাবাহিকতা দেখায়—একটি নির্বাচনে পরাজয় কোনো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় হয়ে উঠতেই হবে এমন নয়। নাবিলার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ব্যর্থ প্রাইমারি প্রচেষ্টার পরের অধ্যায়েই আসে জর্জিয়ার স্টেট সিনেটে ঐতিহাসিক প্রবেশ।

বাংলাদেশি-আমেরিকান একটি পরিবারের সন্তান হিসেবে নাবিলা আয়শা পার্কেসের উত্থান তাই শুধু একটি নির্বাচনী ফলের গল্প নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় রাজনীতিতে অভিবাসী পরিবারের নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণেরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।