নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
মপ্রাচ্যের যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তনশীল সমীকরণের মধ্যে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা সামনে এসেছে। সম্মেলনেধ্য বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের নেতারা একই টেবিলে বসলেও বৈশ্বিক নতুন ব্যবস্থা নিয়ে তাদের মধ্যে মতৈক্যের পাশাপাশি মতপার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনে ব্রিকস সদস্যদের কেবল বৈশ্বিক নিয়ম অনুসরণকারী নয়, বরং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক নিয়ম নির্ধারণে ভূমিকা রাখা ‘রুল-শেপার’ হওয়ার আহ্বান জানান।
সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মতো নেতারা অংশ নেন। তবে একই টেবিলে বসা দেশগুলোর অনেকের মধ্যেই রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামরিক ও সীমান্তগত বিরোধ। ফলে ব্রিকসকে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক জোট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চ্যালেঞ্জও সম্মেলনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প হতে চায় ব্রিকস
চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলোর কাছে ব্রিকস পশ্চিমা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রভাব কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। তারা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে পশ্চিমা-নির্ভর ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প কাঠামো তৈরির পক্ষে। তবে ভারত ব্রিকসকে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখতে চায় না।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদিও স্পষ্ট করে বলেন, ব্রিকস ‘কারও বিরুদ্ধে নয়’। ভারতের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে তার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন। দিল্লি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়াতের মতে, ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোটে পরিণত করার পরিবর্তে ভারত যুদ্ধের সময়ে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
যৌথ ঘোষণায় ঐকমত্য, তবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বিতর্কিত বিষয়
ব্রিকস সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করা। এর আগে চলতি বছর ব্রিকসের মন্ত্রী পর্যায়ের দুটি বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর মতপার্থক্যের কারণে যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। দিল্লিতে গৃহীত ‘নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন’-এ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান জানানো হয়েছে। বেসামরিক অবকাঠামো এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা করা হলেও কোনো দেশকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি।
ফিলিস্তিন ইস্যুতেও দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং দখলদারিত্ব দীর্ঘায়িত বা বৈধতা দেওয়ার মতো পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়েছে। তবে ঘোষণাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর একটি হলো—এতে রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো উল্লেখ নেই। ব্রিকসের আগের কয়েকটি ঘোষণার তুলনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
বাণিজ্য ইস্যুতেও সতর্ক অবস্থান
বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রেও সদস্য দেশগুলো সতর্ক ভাষা ব্যবহার করেছে। ঘোষণায় বৈষম্যমূলকভাবে বাড়তে থাকা শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য এবং সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রতিফলন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে ব্রিকসের বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ফলে অনেক সদস্যই সরাসরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চাইছে না।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ ধোন্ডির মতে, কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি ভারতের কূটনৈতিক পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইরান-সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৈঠকে নতুন বার্তা
সম্মেলনের বাইরে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি ছিল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের বৈঠক। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও শীর্ষ পর্যায়ের এই মুখোমুখি বৈঠক কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ব্রিকস সম্মেলন ইরানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার সুযোগও দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে তেহরান ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর জোর দিচ্ছে।
মালয়েশিয়া, ভারত ও ইথিওপিয়াসহ ব্রিকসের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারত-চীন সম্পর্কেও বরফ গলার ইঙ্গিত
দিল্লি সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভারত ও চীনের সম্পর্ক। ২০২০ সালে সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাত বছর পর দিল্লি সফর করেন। সম্মেলনে মোদি ও শির মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ করমর্দন দেখা যায়। যদিও এটি মোদির বহুল পরিচিত আলিঙ্গনের মতো ঘনিষ্ঠ ছিল না, তবু দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার একটি প্রতীকী বার্তা হিসেবে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
শি জিনপিং ২৪ ঘণ্টারও কম সময় দিল্লিতে অবস্থান করেন এবং মোদির আয়োজিত নৈশভোজেও অংশ নেননি। তারপরও দুই দেশের নেতারা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও পরিবহন যোগাযোগ জোরদার এবং বাণিজ্যিক বাধা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ভারত ও চীনের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি এবং সীমান্ত ইস্যু এখনও বড় সমস্যা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে কিছুটা উষ্ণ হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়াতের ভাষায়, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ইচ্ছা রয়েছে, তবে সেই অগ্রগতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ব্রিকসের সামনে বড় প্রশ্ন—এরপর কী?
দিল্লি সম্মেলন দেখিয়েছে, ব্রিকস এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে যেখানে পরস্পরের সঙ্গে বিরোধ থাকা দেশগুলোও পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে বসে নিজেদের স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু আলোচনার জায়গা তৈরি করা আর একটি অভিন্ন বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা এক বিষয় নয়। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক অবস্থান এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। ভারত পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, চীন ও রাশিয়া বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে আগ্রহী এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ মোকাবিলায় নতুন অংশীদার খুঁজছে।
ফলে ব্রিকসের সামনে এখন মূল প্রশ্ন—সদস্য দেশগুলো কি শুধু নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াবে, নাকি সত্যিই একটি বিকল্প বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে? দিল্লি সম্মেলন অন্তত এটুকু স্পষ্ট করেছে যে, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় ব্রিকসের গুরুত্ব বাড়ছে। তবে সেই জোট কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগোতে পারবে, তা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক আস্থা এবং মতপার্থক্য সামলানোর সক্ষমতার ওপর।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: